Header Ads Widget

ঘুমপাড়ানি

ঘুমপাড়ানি Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)




ঘুমপাড়ানি



ছোটবেলার এক একটা দৃশ্য কী স্পষ্ট হয়ে মনে থেকে যায় !
   ...তখন আমার বয়স কতো আর - আট ন’ বছর হবে । সারারাত কেটেছে জ্বরের ঘোরে । সকালের দিকে জ্বর ছেড়ে যেতে দিদিমা আমায় হাতমুখ ধুইয়ে বালিশ ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন । অবসন্ন ভাবে জানলার বাইরে চেয়ে আছি । বাতাবিলেবু গাছের পাতায় রোদ ঝিকমিক করছে । তার নিচে মেয়েটা বসে আছে । যেমন প্রায়ই থাকে । দিদিমা একগ্লাস গরম দুধ নিয়ে এসে বললেন, “শিলু, তখন থেকে ওদিকে চেয়ে কী দেখছিস রে ?” বললাম, “কিছু না ।” আমি জানি মেয়েটাকে কেউ দেখে না আমি ছাড়া । কাল ও সারারাত আমার মাথার শিয়রে, আমার খাটের চারদিকে ঘুরে ঘুরে ছড়াগান গেয়েছে, ফিসফিস করে ঘুমপাড়ানি সুরে । 
“দিগনগরের মেয়েগুলি নাইতে নেমেছে, চিকন চিকন চুলগুলি গো ঝাড়তে লেগেছে...।” 
   আমি ভাবছিলাম, যখন আমি আরো ছোট্ট ছিলাম, তখন এই গানগুলো দিদিমা গুনগুন করে আমায় ঘুম পাড়াতেন । খুব ভালো লাগতো আমার শুনতে । আর একটু বড়ো হলাম যখন, একলা ঘরে শোওয়ার নিয়ম হলো । কিন্তু আমার প্রায়ই অসুখ করে, জ্বর আসে, মাথা ধরে, পেটব্যথা করে । শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে । ইস্কুলে যেতে পারি না । অসুখ করলে অবশ্য দিদিমা আমার কাছে ঘুমোন । দিদিমাকে বলতে শুনেছি পাশের বাড়ির ফুলঠানদিকে, “...কি আর বলবো দিদি, সবই আমার কপাল । তিনবছরের মেয়েকে রেখে ওর মা অমন করে তো চলে গেলো । জামাইয়ের বদলির চাকরি, হেথা-হোথা হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়াচ্চে । ওর বাপ মা তো বিয়ের পরপরই সগগে গেলো । আর কেউ নেই তেমন । কে-ই বা দুধের মেয়েটাকে দেখেশুনে রাখবে বলো আমি ছাড়া । আর এখন এই নাতনিকে নিয়ে আমি ভুগচি, নিত্যি রোগ, কী যে করি...যাক গে । এই যে পান নাও দিদি ।” 
“তা জামাই তো আসে মাজে-মদ্যে দেকি ।” ফুলঠানদি বললেন, “এট্টু জর্দা দাও তো বৌ । খাসা ওই দিলমোহিনী জর্দা তোমার ।”
“এই যে শিশি ।...হ্যাঁ তা আসে বই কি । খুব টান । কত কি নিয়ে আসে মেয়ের জন্যে । মোটা টাকা পাঠায়, আমরা বলি দরকার নেই কো, তাও ।” এর পরে খাটো গলায় কীসব কথা হলো আমি আড়াল থেকে শুনতে পেলাম না । সরে গেলাম । লুকিয়ে কথা শোনার অভ্যাসের জন্য বকুনি খেতাম প্রায়ই ।
   আমাদের রান্না করে সিন্ধুমাসি, বেড়ার গায়ে গামছা শুকোতে দিতে গিয়ে সেদিন ওপাশের বাড়ির মালীবৌকে বলছিলো, “...মাওড়া কচি মেয়ে গো, এইরকম রোগাভোগা মুখচোরা...মা’র তো অপঘাতে মিত্যু হয়েচেলো...কোন দিন কী হয় কে জানে বাপু, কথায় বলে মায়ের টান ।” নিচু গলায় বলছিলো কিন্তু আমি কুলগাছের ওপাশ থেকে শুনে ফেলেছিলাম । যদিও ঠিক বুঝি নি কিন্তু কেমন কেমন লাগছিলো যেন । 
  আমি তখন একলা ঘুমোই কিন্তু মাঝে মাঝে ভয় পেতাম আমি, রাত্তিরে ঘুম ভেঙে, কিংবা ঝিমঝিমে মাঝদুপুরে বারান্দায় একলা বসে, কিংবা ভর-সন্ধ্যেবেলায় পড়তে বসে জানলা দিয়ে কুয়োতলার দিকে তাকিয়ে । কেন তা দিদিমাকে ঠিক বোঝাতে পারতাম না । জানলার পাশে কারা যেন এসে দাঁড়াতো । ঘরের দেওয়ালগুলো সরে গিয়ে সেখানে কী সব দেখতাম সেগুলোর কোনো মানে হয় না । একদিন দুপুরে দেখেছিলাম আমাদের উঠোনের ওপাশে আরেকটা উঠোন, সেখানে অনেকগুলো বাচ্চা খেলছে তাদের মুখগুলো বড়ো বড়ো, হাঁ-টা চওড়া, চোখগুলো গোল গোল সবুজমতো আর হাত পা গুলো কেমন সরু সরু । তারও ওপাশে পরের পর কতো উঠোন, সেখানে কী সব । কিন্তু আমি জানি আমাদের উঠোনের পাশে ফুলঠানদিদের বাড়ির পাঁচিল আর গোয়াল আর আতাঝোপ ছাড়া আর কিছু নেই । আরেকদিন রাত্তিরে ঘুম ভেঙে দেখি ওমা, আমার খাটের ডানদিকের দেওয়ালটা নেই, শুধু একটা আবছা নীলচে আলো, আর কালো কালো কারা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদিকে, এতো লম্বা যে তাদের পা-গুলো খালি দেখা যাচ্ছে, চেটোর আঙুলে বাঁকা বাঁকা লম্বা নখ । অথচ পাশেই দিদিমার ঘর, মধ্যিখানে দরজাটা খোলা, ওঁর নাকডাকার আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম । দিদিমা আর মামা বলেন সব স্বপ্ন আর বেশি বই পড়ার ফল । কিন্তু তা কী করে হবে ।
   সাঁঝবাতি জ্বলার পর সেদিনও দেখেছি কুয়োর মধ্যে কারা নামছে আর উঠছে, তাদের ভিজে গায়ে তারার আলো পড়েছে । কিন্তু রান্নাঘরে সিন্ধুমাসি আর নিতাইদার বাজারের সবজি না কি নিয়ে যেন ঝগড়াও শুনতে পাচ্ছিলাম । মোটেই স্বপ্ন ছিলো না । অথচ কেউ বিশ্বাস করতো না । মামা হাইস্কুলে বিজ্ঞান পড়ান আর জমিটমির দেখাশুনো করেন । আমাকে বুঝিয়েছেন ওসব কিচ্ছু সত্যি নয়, মানুষ অমন ভুল দেখে, মনে মনে ভেবে নেয় । বুকে সাহস আনতে হয় ।
   দিদিমা বলতেন, “এতো কিসের ভয় রে তোর শিলু ? দোতলায় আমি তুই মামা শুই, নিচে সিন্ধু, কালী, বাইরের বারান্দায় নিতাইবুড়ো । এবাড়িতে কেউ ভূতটুত দেখিনি কখনো বাছা । তোর ঠাকুরদা মা থাকতে তারাও নয় । তোর মা মামা ওরা ছোট্ট থেকে একা একা শুয়েচে কোনো ভয় টয় পায় নি । ”
   কিন্তু আমি ভয় পেতাম ।
  রাত্রে ঘুম ভেঙে কাঠ হয়ে শুয়ে শুয়ে শুনতাম কতোরকম অদ্ভুত শব্দ আর পায়ের দিকের একটা জানলা দিয়ে কারা যেন মুখ বাড়িয়ে আমায় দেখছে, অথচ দিনের বেলা ওখানে কোনো জানলাটানলা নেই, শুধু একটা বিলিতি ক্যালেণ্ডার টাঙানো আছে । বাবা গতবার এসে দিয়ে গেছেন । একটা নীল লেকের ধারে ফুলের বাগানের ছবি তাতে । 
   দিদিমা বোধহয় খুব দুশ্চিন্তা করতেন আমার এই ব্যাপারে । একবার ওঁর কে বড়ো দিদি এলেন বেড়াতে, দুতিনদিন থাকবেন নাকি । ইস্কুলে যাবার আগে ঠাকুমা আমায় বললেন, “পেন্নাম কর শিলু, এই হচ্চেন তোর রাঙাদিদা ।” আমি দেখলাম ওঁর সাদা থানকাপড় পরা, আর মাথায় ছোট ছোট চুল, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা । বিকেলে ফিরে দেখি দিদিমা ওঁর সঙ্গে দোতলার বড়ঘরে বসে বসে গল্প করছেন । আমি আমার অভ্যেসমতো সিন্ধুমাসির কাছে জলখাবার খেয়ে বই হাতে বারান্দায় বসে সব শুনতে পাচ্ছিলাম ।
দিদিমা বললেন, ”লীলা তো কচি মেয়েটাকে রেখে চলে গেলো । ওকে নিয়ে বুড়োবয়সে পড়েচি মুশকিলে রাঙাদি । “
“কেন রে বেণু ?”
“এমনিতে তো ঠিকই আছে, চুপচাপ শান্ত, কথাই বলে না, বড্ড মুখচোরা । বন্ধুটন্ধুও নেই তেমন । পড়াশোনায় তো খুবই ভালো, ফাস্টসেকেন্ হয় ক্লাসে । তবে বড্ড ভোগে জানো, দেখলে তো কী রোগা চেহারা । আর কি সব দেখে ভয় পায়, সে থেকেই জ্বর বাধায় কিনা কে জানে ।”
“ইস্কুল থেকে এসেছে ? ডাক দিকি ।”
  দিদিমা আমায় গলা তুলে ডাকতেই আমি টুক করে বারান্দা পেরিয়ে কোণের ঘর দিয়ে ঘুরে বড়ঘরে ঢুকলাম । এঘরে সোফা বইয়ের আলমারি টেবিল চেয়ার টেয়ার আছে । সবাই বসে গল্প টল্প করে । সাদা-কালো ছককাটা পাথরের ঠাণ্ডা মেঝে । দেওয়ালে আমার মায়ের বড় ছবি - একজন খুব সুন্দরী, নীল ঝলমলে শাড়ি, অনেক গয়না-পরা মহিলা হাসি-হাসি মুখে চেয়ে আছেন । মায়ের চেহারার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি নেই আমার, তাই কষ্টদুঃখ কিচ্ছু হয় না সেদিকে তাকালে । 
রাঙাদিদা আমায় ভালো করে দেখে বললেন, “লীলার মতো চোখদুটি আর চিবুক... বাপের ফরসা রঙ পেয়েছে মনে হয়, না রে বেণু ? পুরো নামটা কি যেন ?”
আমি বললাম, “শিলাবতী ।”
“বাঃ বেশ । মা’কে মনে পড়ে শিলাবতী ? একটুও ?”
“না ।” একটু ভাবলাম । “শুধু...নাঃ।”
দিদিমা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন । আপনমনেই বললেন, “আমার তো দুই ছেলেমেয়ে শুধু, উনিও চলে গেছেন কবে, মেয়েটাও চলে গেলো ওইভাবে...জামাই যে কবে থিতু হবে...।”
  রাঙাদিদা বললেন, “তুই বরং নিচে যা বেণু, কাজ আছে বলছিলি তো । তোর সিন্ধুকে বল দিকি বিউলির ডাল আর সরষেবাটা বড়ি দিয়ে একটা নিরমিষ্যি চচ্চড়ি করে যেন, আর গুড় দিয়ে কুলের অম্বল ।” দিদিমা আঁচলে-বাঁধা চাবির গোছা পিঠে ফেলে উঠে চলে গেলেন ।
   দেখলাম রাঙাদিদা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন । মুখে অনেক আঁকিবুঁকি, কিন্তু চোখদুটো মোটেই বুড়োমানুষদের মতো নয়, খুব ঝকঝকে । আমায় খুব নরম গলায় বললেন, “তুই না কি কীসব দেখে ভয় পাস ? আমায় বল তো ।” 
   আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে চুপ করে ছিলাম । কিন্তু উনি এটাওটা কথা জিজ্ঞেস করে করে সব জেনে নিলেন । আমিও সবকিছু বলে ফেললাম । এমনিতে তো কাউকে বলি না কিছু, ওই দিদিমা আর মামাকে একটু একটু, জানি তো কেউ বিশ্বাসই করবে না । উনি সবটা মন দিয়ে শুনলেন । তারপর একটু ভেবে বললেন,
“তুই চিন্তা করিস না শিলাবতী, আমি তোর চারপাশে এমন একটা গণ্ডি কেটে দেবো, ওসব ভয়-টয়ের ব্যাপার যা দেখিস, তোর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না । তোকে ছুঁতেই পারবে না । ওসব থাকুক ওদের মতো । তোরা টিভি দেখিস তো, সেই রকম বুঝলি ?”
  আমি ওঁর দিকে চাইলাম । উনি কাঁচাপাকা ছোট-ছোট-চুল মাথাটা দুলিয়ে বললেন, “টিভিতে বাঘসিংগি দেখিস তো, তারা কি তোর কিছু করতে পারে ? তুই এবার থেকে মনে মনে ওগুলোকে চলে যেতে বলবি, টিভি বন্ধ করে দেওয়ার মতো ।”
“মামা বলে যে ওসব আমি মনে মনে বানিয়ে দেখি ।” আমার বেশ লাগছিলো ওঁকে ।
“আহা, বানানো হবে কেন । টিভির বাঘসিংগি তো বানানো নয় । কিন্তু তারা কি টিভি থেকে বেরিয়ে তোকে কামড়াতে পারে ! ভয় পাবি না মোটে । মনে জোর আনবি ।” 
  শেষ কথাটা তো দিদিমা আর মামাও বলেন, কিন্তু...রাঙাদিদা বললেন, “কাল সকালে ইস্কুল যাবার আগে আমার কাছে আসিস তো একবার । আর হ্যাঁ, এসব কথা কাউকে বলার দরকার নেই বুঝলি ।”
  সিঁড়িতে দিদিমার পায়ের শব্দ শোনা গেল । দিদিমা ঘরে ঢুকে বললেন, “এখন একটু চা খাবে তো রাঙাদি ? শিলু যা এবার বাগান থেকে একটু ঘুরে এসে তারপর পড়তে বসবি । কি কুণো স্বভাব হয়েছে গা মেয়ের ।”
  কোণের ঘরে রাঙাদিদার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিলো । পরের দিন সক্কালবেলা গিয়ে দেখি, উনি মেঝেয় একটা আসনে বসে আছেন । আমায় বললেন, “আয় আমার সামনে বোস ।” তারপর একটা ছোট্ট ঘটি থেকে জল নিয়ে আমার গায়ে চারদিকে ছিটিয়ে দিয়ে কিসব বিড়বিড় করে বললেন । বললেন, “ব্যস, গণ্ডি কেটে দিলাম । আর ভয় নেই ।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সেই লক্ষ্মণের গণ্ডির মতো ?” রামায়ণের গল্প আমার জানা ছিলো ।
“হুমম, অনেকটা ।”
“আমি...যেখানেই যাবো গণ্ডিটা থাকবে তো ?” আমি একটু ভেবে বললাম । খোলা জানলা দিয়ে সকালের রোদ্দুরের সঙ্গে ঝিরিঝিরি হাওয়া ঢুকছিলো, নিচের উঠোনে দুধওলা ভজনদার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম । রাঙাদিদা ওঁর গায়ের বাদামী চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললেন,
“থাকবে, যতক্ষণ না তুই কাউকে ইচ্ছে করে ভিতরে আসতে দিস ।”
এটা যুক্তিযুক্ত মনে হলো আমার । বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলাম । রাঙাদিদা দুদিন পরে চলে গেলেন । আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম উনি আবার কবে আসবেন । উত্তর দেন নি, শুধু মাথায় হাত রেখেছিলেন । 
  সেদিন থেকে আমি আর অতোটা ভয় পেতাম না । ভয়ের কিছু দেখলে আমি মনে মনে একটা টিভির পর্দা কল্পনা করে নিতাম, ঠিক আমাদের বড়ঘরের টিভির মতো, তবে মস্ত বড়ো । তলায় গোল গোল কালো সুইচ । তারপর আমি সুইচ ঘুরিয়ে টিভি বন্ধ করে দিতাম । 
...অনেক পরে বড়ো হয়ে ভেবেছিলাম, রাঙাদিদা সত্যিই মন্ত্রটন্ত্র জানতেন কিনা, কিংবা শিশুমনস্তত্ত্ব ভালো করে বুঝতেন বলে একটা বুদ্ধির প্রয়োগ করেছিলেন হয়তো ...যাক, সে সব অনেক পরের কথা ।
....কিছুদিন বেশ কাটলো । সেইসব অদ্ভুত ব্যাপারগুলো আর তেমন দেখতাম না । এমনকি ইস্কুলে আমার দুচারজন বন্ধুও হলো । ছবি আঁকার আগ্রহ বাড়লো । বাবা এর মধ্যে এসে ঘুরে গেলেন, আমার জন্য খেলনা জামা বই এইসব নিয়ে, যেমন নিয়ে আসেন প্রত্যেকবার । গণ্ডির গল্পটা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো, কিন্তু তা তো হলো না ।
   এক সন্ধ্যেবেলায় মাথা টিপ টিপ করে আবার জ্বর আসছে আমার, বেশ বুঝতে পারলাম সেটা । কাউকে কিছু না বলে কোনোরকমে একটু খেয়ে আমি ঘুম পেয়েছে বলে শুতে গেলাম । দিদিমা পরের দিনের কী একটা পূজোর জোগাড়ে ব্যস্ত, আর নিচে বসার ঘরে উকিলজ্যেঠু মামার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন । সারাদিন মেঘ করে ছিলো, এখন বৃষ্টি নেমেছে ঝিরঝির করে, আমগাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছে কয়লার ঘরের টিনের চালের ওপর । মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া দিচ্ছে । কখন ঘুমিয়ে পড়েছি । 
   আধো অন্ধকারে ঘুমটা ভেঙে গেলো । বাড়িটা চুপচাপ । সবাই ঘুমোচ্ছে, দিদিমার আর আমার ঘরের মাঝের দরজাটার পাশের গোল টেবিলে খুব হাল্কা নীল আলোটা জ্বলছে । আবছা ভাবে মনে হলো কে ঘুমপাড়ানি গান গাইছে,
“....দিগনগরের মেয়েগুলি নাইতে নেমেছে, গায়ে তাদের ডুরে শাড়ি ঘুরে পড়েছে, গলায় তাদের তক্তিমালা রক্ত ফুটেছে...।” দিদিমা ? আমার কী খুব জ্বর ? এই গানটা দিদিমা গাইতেন মনে পড়ে, আমি তখন খুব ছোটো । না কি তারও আগে আরও কেউ গাইতো ? আমি চোখটা আরেকটু মেলে তাকালাম ।
“...হাতে তাদের দেবশাঁখা মেঘ লেগেছে, দিগনগরের মেয়েগুলি নাইতে নেমেছে...”
না, দিদিমা নয় তো ! একটা মেয়ে, পাড়ার কলেজে-পড়া অঞ্জুদিদির মতো বড়ো, শাড়ি পরা, চুলগুলো খোলা, মুখটা কেমন চেনা-চেনা, আমার খাটের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমি ফিসফিস করে বলি, “কে, কে তুমি !!” সে নিচু গলায় হেসে বলে, “আমি, আমি, আমি...।” আমি বলি “চলে যাও ।” চোখ বুঁজে ফেলে টিভির পর্দাটা ভাবার চেষ্টা করি, কিন্তু শুনতে পাই সে ঘুমঘুম গলায় গাইছে, 
“আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে সূয্যি গেল পাটে, 
শিলা গেছে জল আনতে পদ্মদীঘির ঘাটে...”
এটা কী স্বপ্ন ? অস্বস্তিতে আমি বিছানায় পাশ ফিরি ।
“...পদ্মদীঘির কালো জলে হরেক রকম ফুল,
হাঁটুর নিচে দুলছে শিলার গোছা ভরা চুল...।”
   আচ্ছন্ন হয়ে শুনতে শুনতে আমি কোথায় তলিয়ে যাই । সকালে ঘুম ভেঙে দেখি ঘরে আলো, বৃষ্টি নেই, আর দিদিমা আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে আমার কপালে হাত রেখে বলছেন, “গা-টা তো গরম হয়েছে দেখছি । বেরোস নি আজ । কাল ঠাণ্ডা লাগিয়েছিলি তো ।” দিদিমা নিচে গেলে আমি জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি, আমলকীতলায় এলোচুলে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার পরনের জারুলফুল রঙের শাড়ি উড়ছে আর...তারপরেই সে কোথায় যেন চলে যায় । 
   কাউকে কিছু বলি না । তারপর থেকে অসুখ হলেই আমি দেখি মেয়েটাকে । আমার শিয়রে বসে ঘুমপাড়ানি গান গায়, ফিসফিস করে বলে, “দিগনগরে যাবে শিলু ? পদ্মদীঘিতে নাইবে না ? তিনপূর্ণির ঘাটে জোড়া রুই ভেসে উঠেছে দেখবে না !” ওর চুলে চাঁপাফুলের মালা জড়ানো । চাঁপা খুব প্রিয় আমার ।
“না, না, তুমি কোথা থেকে এলে ? তুমি সত্যি নও ।”
“আমি, আমি, আমি ।” মেয়েটা খিলখিল করে হাসে ।
দিদিমা আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলেন, “কি বলছিস বিড়বিড় করে ? এ মেয়ে নিয়ে আমি কী করি মা ! অ কালী, বাটিতে করে জল নিয়ে তো বাছা, জলপটি দেবো । ওষুধও খাওয়াতে হবে ।”
মেয়েটা বলে, “আমলকীতলায় তোমার কানের ওপেল পাথর বসানো সোনার দুলের একপাটি হারিয়ে গিয়েছিলো না ? এই দ্যাখো আমি পরে আছি । তুমি নেবে ?”
“না না, তুমি যাও...।” কালী ঝি ঘরে ঢোকে । মেয়েটা চলে যেতে যেতে গায়, “সুখ নেইকো মনে, নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে...।” কালী ঝি বলে, “দিদিমণির ওপর কিসের যেন দিষ্টি নেগেচে গো আমি বলচি, চাউনিটা দ্যাখো ।” দিদিমা ধমক দিয়ে বলেন, “থাম দিকিনি বাপু, আমি মরচি নিজের জ্বালায় ।”
  সেবারে সেরে উঠে আমি দিদিমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “রাঙাদিদা আবার কবে আসবেন গো ।” দিদিমা নারকেল নাড়ুর পাক দিচ্ছিলেন, একটু চুপ করে থেকে বললেন, “রাঙাদি ? জানি না আর আসবেন কি না । হরিদ্বারের কোন আশ্রমে আছেন, শরীরও ভালো না । তুই যা এখান থেকে, উনুনধারে রোগা শরীরে থাকতে হবে না । নাড়ু হলে ডাকবো’খন ।” আমি ভাবছিলাম, সেই যে রাঙাদিদা বলেছিলেন, গণ্ডির ভেতর কেউ ঢুকতে পারবে না ? তবে ওই মেয়েটা আসে কীভাবে ? আমি তো ওকে আসতে দিই নি ।
  ইস্কুলের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, ছবি এঁকে প্রাইজ পাই । বাবা এলে কতো গল্প করেন আমার সঙ্গে । বাবা বলেছেন, আর কিছুদিন পরেই আমায় নিয়ে যাবেন নিজের কাছে । আচ্ছা, কেমন লাগবে আমার অন্য জায়গায় গিয়ে থাকতে ? আর এতো দিন পরে কী রকম আশ্চর্য ভাবে আমার মনে-না-থাকা মায়ের জন্য আমার কষ্ট হয় । মা বেঁচে থাকলে কেমন হতো আমার জীবন ? একটা চাপা অভিমান আমার বুকের মধ্যে জমে ওঠে । মায়ের কথা কেউ বলে না আমায় । বাবা শুধু একবার বলেছিলেন নাকি পথ-দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যু হয়েছিলো ।
  কিন্তু সেই মেয়েটা আমায় ছেড়ে যায় না । দুপুরবেলা নিচের দালানে বসে বই থেকে মুখ তুলে দেখি ও এলোচুলে বেরিয়ে যাচ্ছে খিড়কি-দোর দিয়ে জারুলরঙের আঁচল দুলিয়ে । সন্ধ্যেবেলায় কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে, গুনগুন করে গায়, “চাঁদ উঠলো ফুল ফুটলো ঝলক-মলক দিয়ে, জ্যোছনাতে ফটিক ফোটে কদমতলায় বিয়ে...শিলাবতী, এসো এসো এসো...।”
আমি দুহাতে মুখ ঢেকে বলি, “তুমি কে !”
ওর গলা আমার মাথার মধ্যে রিমঝিম করে, “নাম কি হবে ! আমি আমি আমি ।” 
  সিন্ধুমাসি রান্নাঘরের দরজা থেকে ডেকে বলে, “ভর সন্দেবেলা উটোনে এলোচুলে একলা দাঁইড়ে কি করচো দিদি । অমন কত্তে নেই, ভেতরে এসো ।” আমি ছুটে বাড়ির মধ্যে চলে যাই । মাথাটা ভার ভার লাগে । ভয় করে । জ্বরটর হলেই মেয়েটা এসে আমায় কেমন ঘিরে থাকে । আমার ইস্কুলের বন্ধু মিঠুকে একবার আচার খেতে খেতে চুপিচুপি বলেছিলাম, “কাউক্কে বলিস না, জানিস আমি অসুখ করলেই একটা মেয়েকে দেখি ।”
মিঠু চোখ বড়ো বড়ো করে সবটা শুনে বললো, “কি বলে রে সে তোকে ?”
“ঘুমপাড়ানি গান গায়, সঙ্গে যেতে বলে...।”
“মাগো ! খবরদার যাবো বলবি না শিলু, জানিস আমার পিসির শ্বশুরবাড়ির কার যেন এমন হতো, তার কি এক শক্ত অসুখ করেছিলো, একটা এই লম্বা ঘোমটা-দেওয়া বৌকে দেখতো...তাপ্পর সে মরে গেলো ।” আমরা দুজনেই শিউরে উঠলাম । ক্লাসের ঘন্টা পড়ে গেলো । যেতে যেতে মনে হলো মাঠের সুপুরিগাছের সারির ওদিকে কে যেন দাঁড়িয়ে ছিলো এতক্ষণ । একঝলক চাঁপার গন্ধ ভেসে এলো । মিঠু একটু অবাক হয়ে বললো, “এখানে আবার চাঁপাগাছ কোথায় রে শিলু ?”
  তখন আমার বয়স এই বারো তেরো । সেবার আমার একটু বেশি অসুখ করলো শীতের ছুটির সময় । জ্বর পেটব্যথা । কিছু খেতে পারি না, সব বমি হয়ে যায় । ডাক্তারকাকু বললেন ভাইরাস । সবাই উদ্বিগ্ন, দিদিমা দিশেহারা । বাবা এলেন । শুনলাম কলকাতায় এবার স্থায়ীভাবে বদলি হয়েছেন, এবার আমায় নিয়ে যাবেন । দিদিমা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “তাই যাও বাবা, ওখানে নিয়ে গিয়ে ভালো করে চিকিচ্ছে করাও, ভুগে ভুগে ওর শরীরে আর কিছু নেই ।” বাবা বললেন, “কাঁদবেন না মা, শিলু তো আসলে আপনারই মেয়ে, আপনার কোলে বড়ো হয়েছে, সব সময় যাওয়া-আসা করবেন আপনারা । গাড়িতে মোটে তো তিনঘন্টা । আপনি সঙ্গে চলুন, প্রথম প্রথম ক’দিন থেকে সব ব্যবস্থা করে দিয়ে আসবেন....।” 
  আমি জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে ছিলাম । সবাই নিচু গলায় কথা বলছিলো একটু দূরে বসে । আর মেয়েটা আমার শিয়রে বসে ছিলো আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম । দিদিমা বলছিলেন, “অমন ফুটফুটে সুন্দর নাতনিটা আমার, অসুখ হয়ে পড়ে থাকলে আমার বুক ফেটে যায় বাবা, ওর মা থাকলে কি আর...।” বাবা ওঁকে বুঝিয়ে কি বলতে লাগলেন । মেয়েটা গাইছিলো, 
“ফুলের মালা, রূপের ডালা, কোন সোহাগীর মৌ, হীরেদাদার মড়মড়ে থান, ঠাকুরদাদার বৌ...শিলাবতী, কোথায় যাবে গো ? আমি যাবো তোমার সঙ্গে । আয় রঙ্গ হাটে যাই, পানসুপুরি কিনে খাই...হি হি হি...।” ওর চুলে চাঁপাফুলের গন্ধ । আমি ঘুমে ডুবে যাই । স্বপ্নে ওর গানের সুর আমায় ঘিরে ছলছল করে বাজে ।
   কলকাতায় কিন্তু ভালোই লাগলো আমার । বাবা চমৎকার একটা বাড়ি কিনেছিলেন । বাবার এক পিসতুতো বয়স্কা দিদি, জব্বলপুরে নার্স ছিলেন, রিটায়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকতে এলেন বাবারই ব্যবস্থায় । উনি হলেন আমার পিসিমা, আমায় দেখেশুনে রাখবেন, সংসারের ভার নেবেন ঠিক হলো । ভারি হাসিখুশি চটপটে মানুষ, কমবয়সে বিধবা হয়েছিলেন । দিদিমাকে “বড়োমা” সম্বোধন করে, ভালো ভালো রান্না করে খাইয়ে, আর ওঁর বাতের ব্যথার গল্প মন দিয়ে শুনেটুনে বশ করে ফেললেন । নতুন ইস্কুলে ভর্তি হলাম । নতুন ডাক্তারবাবুরা আমার চিকিৎসা করলেন, একটু একটু করে ভালো হয়ে উঠলাম, অতো অসুখবিসুখ আর করতো না । 
   সবই ঠিক, কিন্তু...সেই মেয়েটা, ও আমায় ছাড়লো না । ও রয়ে গেলো স্বপ্নে, তন্দ্রায়, ঘুমের মধ্যে...কখনো অসুখ করলেই ও আসতো । আবছায়ার মত । কিন্তু আশ্চর্য, আমার আর অতো ভয় করতো না ওকে । গুনগুন গান আর হালকা বেগনি শাড়ির ঝলক, চাঁপাফুলের গন্ধ...আমি ঘোরের মধ্যেই বলতাম, “তোমায় এতো চেনা চেনা লাগে কেন আমার ?”
“আমি । আমি । আমায় চেনো না ?” চারধারে কেমন কুয়াশা । কী জায়গা একটা । ছায়া ছায়া কী সব দূরে দূরে ।
“ওই গানগুলো কেন করো তুমি ?”
“ওই গানগুলো তো তোমারই গান শিলাবতী । সব তোমার । ছোটবেলায় শুনতে না ঘুমের সময় ?”
“ঘুম...।”
“চাঁপাফুল কী সুন্দর তাই না শিলা ? দিগনগর আলো করে ফুটে থাকে জানো তো । যাবে সেখানে ? আমকাঁঠালের বাগান দেবো ছায়ায় ছায়ায় যেতে, উড়কি ধানের মুড়কি দেবো পথে জল খেতে, চার বেহারা পালকি দেবো দুলান দুলাতে, সরু ধানের চিঁড়ে দেবো নাগর খেলাতে...।” গানের সঙ্গে ওর কানে ওপেল পাথরের দুল ঝিকমিকিয়ে ওঠে । চাঁপাফুলের নিবিড় গন্ধে ডুবে গিয়ে কী যেন মনে পড়ে পড়ে, পড়ে না । 
  আমি বড়ো হলাম, খুব ভালো ফল করে পাশ করে কলেজে ভর্তি হলাম । সবাই খুব খুশি । দিদিমার কাছে প্রায়ই যাই, ওঁরাও আসেন । মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়বো ঠিক করেছি । মনের গভীরের রহস্য নিয়ে আমার খুব কৌতূহল । অনেক বন্ধুবান্ধব হয়েছে আমার । আঁকাও শিখি, সবাই প্রশংসা করে । আর সবচেয়ে যে মুগ্ধ হয় সে বাবার বন্ধুর ছেলে অর্পণ । ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এই সবে বেরিয়েছে, ভালো একটা চাকরি পেলেই আমাদের বিয়ে হবে, দুবাড়িতে ঠিক হয়ে আছে । সবাই জানে ব্যাপারটা । দিদিমার ভারি পছন্দ ওকে, খাসা নাতজামাই হবে, ওকে নিয়ে কী কী আহ্লাদ করবেন ঠিক করে রাখছেন । মামার বিয়ে হয়ে গেছে এর মধ্যে, চমৎকার মামীমা এসেছেন, খুব ভাব আমার সঙ্গে ।
  দিন কেটে যাচ্ছে । কিন্তু আজকাল আয়নার দিকে তাকিয়ে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাই । কী সব মনে হয় আবছাভাবে । আচ্ছা, ওই মেয়েটার কথা কী অর্পণকে আমার বলা উচিত । কী একটা যেন রহস্য যেন আমার নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে । 
 কলেজের ছুটি সেদিন । সকালবেলায় অর্পণ ফোন করলো । খুব উত্তেজিত আর খুশি ।
“শিলা !!! সেই চাকরিটা পেয়ে গেছি জানো । দারুণ প্যাকেজ ।”
খানিক কথাবার্তার পর বললো, “আজ সন্ধ্যেবেলা আমরা তোমাদের বাড়ি যাবো । মা বাবারা আর দেরি করতে চান না বুঝলে । তোমার বাবার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে ।”
“এক্ষুণি ? আমি পড়ছি তো...।”
“পড়ো না যতো খুশি, মা বাবা দুজনেই কলেজের প্রফেসার জানো তো, তুমি না চাইলেও জোর করে পড়াবেন তোমায় । আর আমরা কী চিরকাল পার্কে সিনেমায় রেষ্টুরেন্টে প্রেম করে যাবো নাকি ।”
আর দু’একটা কথার পর বলো, “ও হ্যাঁ ইয়ে, তোমার জন্যে একটা উপহার কিনে রেখেছিলাম, আমি ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি । আজ পরবে কিন্তু বলে রাখলাম ।”
অবাক হয়ে বললাম, “কি উপহার আবার ! কি পরবো ।”
“ইয়ে, একটা শাড়ি...।”
“উঃ - আবার শাড়ি কিনেছো !! তোমার যা বিদঘুটে সব রঙ পছন্দ...।”
“না না, এটা বেশ ভালো, তোমার পছন্দ হবেই দেখো । ভীষণ মানাবে তোমায় । এইরে, জ্যেঠিমারা এসে পড়েছেন । আমি যাই, আজ দেখা হবে । বাই ।”
  মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছিলো । মিঠুকে ফোন করে গল্প করলাম একটু । নিচে গিয়ে বাবা আর পিসির সঙ্গে কথা বললাম । দুপুরে খেয়ে এসে একটু পড়াশুনো করে ওয়ার্ডরোব খুলে আমার টুকটাক গয়নার বাক্সটা বের করলাম । ওতে আমার ছোটোখাটো দুল আংটি চেন এইসব থাকে । আমার সেই একপাটি ওপেলের দুলটাও রয়েছে একটা খোপে । কী করে যে হারিয়েছিলো, অনেক খুঁজেও পাওয়া যায় নি । ঠিক এইরকম আরেকটা গড়িয়ে নেবো ? রঙটা মিলবে না হয়তো । খুব পুরোনো জিনিষ ছিলো নাকি, আমার দিদিমার ।
   বিকেলবেলা কাজের মেয়ে গঙ্গাদি এসে আমায় একটা প্যাকেট দিলো, একটু মুচকি হেসে বললো, “ওবাড়ির ডেরাইভার এসে দিয়ে গেলো গো । তোমার জন্যে ।” কী যে করে না অর্পণটা । 
   প্যাকেটটা হাতে নিতে সেটা থেকে চাঁপাফুলের সুগন্ধ পেলাম । বাব্বা, অর্পণ আবার মনে করে আমার প্রিয় ফুলও পাঠিয়েছে । কি মিষ্টি ছেলেটা ! একটু প্রসাধন সেরে খাটে বসে প্যাকেটটার মোড়ক ছিঁড়ে বের করলাম, সবুজ পাতায় মোড়ায় সোনারঙ “সূর্যের সৌরভ” । চুলটা এলো রাখবো, অর্পণ পছন্দ করে খুব, আর তাতে চাঁপার মালা জড়িয়ে দেবো...চাঁপার মালা...চাঁপা...
   ...আর টিস্যুর র়্যাপিংটা খুলতেই জারুলরঙের সুন্দর শাড়িটা আমার কোলের ওপর বিছিয়ে গেলো, পেটা জরির পাড়, খুব চেনা শাড়িটা...
  ...কী রকম একটা অবাস্তব অনুভূতি আমায় ছেয়ে ফেলেছে যেন । যন্ত্রচালিতের মতো ঘন নীল একটা ব্লাউজের সঙ্গে শাড়িটা পরলাম, ফুলের মালাটা নিয়ে চুলে লাগাতে লাগাতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে গেলাম । ও তো আমি, কিন্তু সেই সঙ্গে আমি তো আরেকজন...তাই কি মেয়েটাকে অতো চেনা লাগতো...
আবছাভাবে শুনলাম নিচে অর্পণরা এসে গেছে, ওদের হাসি কথা...আমায় যেতে হবে, কিন্তু...
“...ও দুয়োরে যেয়ো না, বঁধু এসেছে,
বঁধুর পান খেয়ো না, ভাব লেগেছে,
ভাব ভাব কদম্বফুল ফুটে উঠেছে...।”
চমকে বলি, “তুমি ! তুমি কে তবে ?”
সে হেসে বলে, “আমি আমি আমি । আমি তো তুমিই ।”
“তাই কি তুমি গণ্ডির ভিতরে আসতে পারতে ?”
“হ্যাঁ, তুমি বোঝোওও নিইইই....।” সে কেমন সুর করে বলে ।
“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না । কেন তুমি ডাকতে আমায় ? আমি যে ভয় পেতাম ।” ক্রমশঃ কেমন যেন অলীক ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছি...কার সঙ্গে কথা বলছি আমি ?
“আমি যে আরেকটা তুমি, আরেকটা শিলাবতী । তোমার চেনা সব ঘুমপাড়ানি গানের দেশে, যেখানে সব রূপকথার থাকে, সব সম্ভাবনারা কুয়াশায় ঘুরে বেড়ায়...সেখানকার শিলাবতী । মায়ার জগত সেটা । সেখানে গেলে তোমার সব অসুখ সেরে যেতো । তুমি যে গেলে না ।”
“না না, কেন যাবো ।” ঘরের ভিতরটা কেমন যেন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে, দেওয়ালগুলো আর নেই, যেন একটা অন্য জায়গা, অচেনা । তার মধ্যে থেকে সে বলে,
“আমি যে তোমায় বাঁচাতে চেয়েছিলাম । সেই যে ছোটবেলায় তুমি খুব ভয় পেতে ? হয়তো তুমি..।”
“আমি...বেঁচে গেছি তো ।”
“এর পরে কী যে হবে তা তো জানো না শিলাবতী । আমিও এই জগতে তোমার ভবিষ্যত জানি না । তুমি যাবে আমার সঙ্গে সেই কুহকের দেশে, স্বপ্নেরা যেখানে গান গায়, আর গানগুলো সব রঙীন হয়ে বৃষ্টির মতো ঝরে ? সে এক অন্য মাত্রা । ওখানে ভয় নেই, চিন্তা নেই, অসুখ নেই, । বলো, যাবে ? এই শেষ বার বলছি...আমি আর আসবো না ।”
“আমি যাবো না । তুমি চলে যাও, আর এসো না । আমি এখানেই থাকবো ।”
“যাই তবে । তোমার দুলটা ফেরত দিয়ে গেলাম ।”
আমার ঘোরটা কেটে যায় । এতোক্ষণ কি স্বপ্ন দেখছিলাম ! সবকিছু আবার আগের মতোই...। কি ভেবে গয়নার বাক্সটা খুলে দেখি, সেই খোপটার মধ্যে দুটো দুলই রয়েছে । কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে সেদুটো কানে পরে নিয়ে, আয়নায় নিজের দিকে একবার তাকিয়ে নিচে চলে গেলাম । 
  সন্ধ্যেবেলায় একসময় অর্পণ বললো, “শিলা, কি সুন্দর মানিয়েছে তোমায় এ শাড়িটায় । বলি নি রঙটা পছন্দ হবেই তোমার । আর চাঁপার মালাটা চুলে লাগিয়ে দারুণ লাগছে । এদিকে ফুলের দোকান আছে বুঝি ?”
  অন্যমনস্ক হয়ে বললাম, “হ্যাঁ । চলো, তোমার মা ডাকছেন আমাদের ।”

সমাপ্ত














website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments