লকডাউন Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
|| প্রাপ্তমনস্কদের জন্য ||
পঁচিশে মার্চ খবরটা চাওড় হতেই চারপাশে হইচই পড়ে গেলো। সারা দেশে লকডাউন। লকডাউন আবার কী? প্রশ্নটা উঠলেই চোখ পাকিয়ে, হাত নাড়িয়ে রাস্তাঘাটে লোকজন ব্যাখা করছে-“লকডাউন মানে, সমস্ত বন্ধ। দোকান পাট, বাজার হাট…সব!”
করোনা প্রকট আকার ধারন করছে; গোষ্ঠী সংক্রমণের পর্যায়ের চলে গেছে। মহামারী রুখতে অতএব লকডাউন ছাড়া আর অন্য উপায় নেই। তবে লকডাউন যে একটা হবে, এটা নিয়ে কানাঘুঁষা একটা খবর লোকের মুখে মুখে বেশ কিছুদিন থেকেই ঘুরছিলো ঠিকই। আজকে নিউজ চ্যানেলগুলোতে খবরটা শোনানো মাত্র ধারনাটা পাকাপোক্ত হলো সবার। সমস্ত কারখানা, অফিস কাছারি, হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। কোনো ট্রেন বাস কিচ্ছু চলবে না। নিজের জায়গা ছেড়ে ভিন রাজ্যে কাজের জন্য যারা গেছিলো, ওদের হাতেও কাজ নেই, মাথা গোজার জায়গা নেই; হাতে পয়সা নেই।
যাদবগঞ্জ স্টেশনে শেষ ট্রেনটা এসে দাঁড়াতেই, হুড়মুড় করে সব প্যাসেঞ্জাররা নেমে এলো। স্টেশনের বাইরে এককোণে একটা চটের কাপড় বিছিয়ে বসেছে তাপস কিস্কু। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়েছে কঙ্কালসার শরীরটা। পড়নে একটা ঢিলা পায়জামা আর তিলা পরা একটা ঢোলা গেঞ্জি। সামনে রাখা তরলা বাঁশ, ভালকি বাঁশ, বড়িয়া বাঁশের তৈরি চাঙাড়ি, কুলো, ঝুড়ি, ফুলদানী, বাঁশের ব্যাগ। প্যাসেঞ্জারদের ভিড়ের মধ্যে থেকেই তাপস কিস্কু ফিসফিসানি যেটুকু খবর শুনতে পেলো, তা হলো, এই স্টেশনে এটাই শেষ ট্রেন। এরপর আর এই স্টেশনে কোনো ট্রেন আসবে না। শুধু এই স্টেশন কেন… সমস্ত দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কতোদিনের জন্য? সেই খবর কেউ জানে না। প্যাসেঞ্জাররা বেরিয়ে যেতেই স্টেশন মাস্টারে হুইসিলের আওয়াজ কানে আসলো তাপস কিস্কুর। তারপর ট্রেনের ইঞ্জিনের আওয়াজ। শব্দ পেলো ট্রেনটা চলে যাচ্ছে স্টেশন ছেড়ে। ট্রেনের আওয়াজ দূরে মিলিয়ে যেতেই উঁকি দিয়ে স্টেশনের ভেতরটা একবার দেখে নেয় ও। স্টেশন সমেত পুরো চত্বরটা যেন খা খা করছে। শেষ দুপুরের রোদ ধীরে ধীরে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। রোদের তাপ কমে ছায়া এসে পড়েছে তপ্ত উঠানে। আশেপাশে আর বিশেষ কোনো হকার নেই। লোকজনও নেই বললেই চলে। কিছুটা দূরে রাস্তার এক কোণে একটা গাছের সাথে ঠেস দিয়ে একটা ঠ্যালা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তারওপর একটা লোক গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে ঘুমাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাপস কিস্কু। ও জাতে বাঁশফোড় মাহালি। বংশ পরম্পরায় ওরা বাঁশ শিল্পী। তাপস কিস্কুর বউ মানসী কিস্কু বাঁশ দিয়ে নানারকম জিনিস বানায়। আর সেগুলো বিক্রির জন্য তাপস কিস্কু নিয়ে যায় যাদবগঞ্জ স্টেশন চত্ত্বরে। আগে ও এসব জিনিস নিয়ে যেতো গুসকরা বাজারের ওখানে। প্রতি মঙ্গল আর শনিবার হাটে বিক্রি-বাট্টা ভালোই হতো। তবে এখন আর কেউ অতো বাঁশের জিনিস কিনতে চায়না। বাঁশ শিল্পের মার্কেট দখল করেছে প্লাস্টিক শিল্পের রমরমা ব্যাবসা। তার ওপর ভালো বাঁশও আজকাল পাওয়া যায় না৷ এখন এসে ও বসে এই যাদবগঞ্জ স্টেশনের সামনে। স্টেশনটা আহামরি কিছু বড়ো না। তবু লোকজনের ভিড় আছে। এখানে সারাদিনে এক আঁধটা যা কিছু বিক্রি হয়। সেই সামান্য টাকাটাই লাভ। ওদের এক ছেলে, সেও বাইরের রাজ্যে কাজে গেছে। ওখানে মিস্ত্রির কাজ করে। বালি বজরি চালান করা, ঢালাইয়ের কাজ- এসবে ইনকাম ভালো। বছরে এক আধবার বাসায় দেখা করতে আসে৷ কিন্তু এই যে এরা সবাই বলছে সমস্ত বন্ধ হয়ে গেলো আজকের পর থেকে… এই বন্ধে যদি ছেলেটা খাবে কী? কাজই বা পাবে কীভাবে? ওখানে বারো পনেরোজন মিলে ঝুপড়ি এলাকায় ভাড়া করে থাকে শুনেছে; কাজ না থাকলে বাড়ির ভাড়া দেবে কীভাবে? তারচেয়ে বাসায় থাকলে চোখের সামনে থাকতো। কিন্তু এখন তো সব বন্ধ… অতো দূর থেকে এখানে আসবে কীভাবে ও? এসব ভাবতে ভাবতেই চিন্তার ভাজ ফুটে উঠেছে তাপস কিস্কুর কপালে।
আজকে একটা জিনিসও বিক্রি হলো না ওর। প্যাসেঞ্জাররা ট্রেন থেকে নেমেই হনহন করে বেরিয়ে চলে গেলো। রোগটা নাকি ছোঁয়াচে ভীষণ। তাই কেউ বাইরের থেকে কিছু কেনাকাটা বা খাওয়া দাওয়া বিশেষ করছে না। এরমধ্যে কে শৌখিনতা দেখিয়ে এসব জিনিস কিনবে? কাল থেকে সব বন্ধ। কোথায় জিনিস নিয়ে বসবে? কিস্তির টাকায় গতমাসে ঘরের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছিলো ওরা। সেই কিস্তির টাকা এখন শোধ করবে কীভাবে তাপস কিস্কু? এসব চিন্তা তাপস কিস্কুকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ভেতর ভেতর। পশ্চিম আকাশের সূর্যটা ইতিমধ্যে লাল আভা হয়ে মিলিয়ে গেছে। দুরের গাছগাছালিগুলো কালো কালো দেখতে লাগছে। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। জিনিসপত্র গুটিইয়ে উঠে দাঁড়ায় তাপস কিস্কু। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে ওকে।
(২)
মহামারির খবরটা তাপস কিস্কুদের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না গ্রামে। এই রোগটা নাকি মারনরোগ। ছোয়াছুয়ি হলেই শেষ। বাইরের দেশগুলোতে নাকি গিলে খেয়েছে কাতারে কাতারে মানুষজনকে। এই সময় বাইরের রাজ্য থেকে কাউকে এই গ্রামে লুকিয়ে ঢুকতে দেখলেই ঝামেলা করছে মুখিয়ারা। ওদের বাড়ি গিয়ে গিয়ে ভাঙচুর করছে, গ্রাম থেকে পিটিয়ে মেরে তাড়িয়েও দিচ্ছে অনেককে। কার গায়ে কী রোগ থাকে দেখে বোঝার উপায় নাই। বাইরের রাজ্য থেকে গায়ে রোগ নিয়ে এই গ্রামে ঢুকলে, তারপর সংক্রমণ ছড়িয়ে গ্রামের লোকগুলোই মরবে। তবু অনেকেই ভিন রাজ্য থেকে রাতের অন্ধকারে মালগাড়ি বা লরিতে চেপে লুকিয়ে লুকিয়ে গ্রামে এসে ঢুকছিলো। এদিকে ট্রেন বাস সব বন্ধ হওয়ায় অনেকে হেঁটেই রওনা দিচ্ছে বাইরের রাজ্য থেকে। এছাড়া উপায়ই বা কী? বাইরে কাজ নাই, সব বন্ধ, কাজ না করলে খাবে কি? খিদা তো মহামারি বোঝে না।
তখন বেশ রাত হয়েছে। মানসী ঘুমিয়ে পড়েছে। তাপস কিস্কুর চোখে ঘুম নাই। অনেকগুলো সম্ভাবনার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ওর। হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ। এতো রাতে কে এলো? গোপাল নাকি? তাহলে কি হাতে গোনা যারা লুকিয়ে লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসছিলো গ্রামে, তাদের মধ্যে গোপালও ছিলো? একটা ক্ষীণ আশার আলো ফুটে উঠলো তাপস কিস্কুর মনে। কিন্তু সেই সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিলো বাইরে থেকে আসা ফিসফাস কথাবার্তার আওয়াজ। কারা যেন কথা বলছে। গোপাল তো নয়… মনে হচ্ছে না! তাহলে কে এলো এতো রাতে। আবার দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ। এবারের আওয়াজোটা আগের চেয়ে আরো খানিকটা জোরে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো তাপস কিস্কু। পাশ ফিরে দেখে মানসীরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। লন্ঠনের নিভু আলোয় তাপস কিস্কু দেখে মানসী ভয় জড়ানো চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জিটা গলিয়ে, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে তাপস কিস্কু। পেছন পেছন আধখোলা দরজাটার এগিয়ে যায় মানসী। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের মাঁঝি হারাম কিরন বেসরা, পরামানিক উৎপল টুডু, গড়াৎ মাঁঝি কমল সারেন। এখানে গ্রামের মুখিয়াদের এসব নামেই ডাকা হয়।
কিরন বেসরা শাসানো গলায় তাপস কিস্কুকে বলে-"তোর বিটা গোপাল, বাইরের রাইজ্যে কাম কাজ করে। ওকে এখন গেরামে আসতে না করি দিবি। এখন খারাপ রোগ চলচে বাইরে। কী না কী রোগ গায়ে নিয়ে আসবে... যদি দেখি তোর বিটা এই গেরামে এসেচে বা তোরা লুকায় রাখচিস ওকে এখানে এনে… বউ বিটা সমেত তোকে বিলা করে দিবো।"
পাশ থেকে কমল সারেন টোন কেটে বলে-"দেখেন ইতিমধ্যে এনে লুকিয়ে টুকিয়ে রেখেচে কিনা ঘরের মধ্যে। আমরা তো আর ঘর দেখতে যায়নি ওর।"
কমল সারেনের কথাটা বুঝে ওঠার আগেই তাপস কিস্কুকে এক ধাক্কা মেরে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলো ওরা তিনজন। একচালা ঘরের দেওয়ালগুলো বাঁশের চ্যাগাড় দিয়ে ঘেরা। ওরই একপাশে মাটির উনান, এক আরেক পাশে ছোটো চৌকি একটা। সমস্ত ঘর জুড়ে কাটা বাঁশ আর কাপড়চোপড়। খোঁজার মতো আলাদা করে কিছু নেই। তাও ওরা তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো সমস্ত ঘরদোর। তাপস কিস্কু আর মানসী মিলে মুখিয়াদের আটকাতে যায়-"সত্যি বলচি। সিড়জম পুঁথির কসম। আমার বিটা এখানে নাই..."
-"রাখ তোর কসম..." শাসিয়ে ওঠে মুখিয়া উৎপল টুডু। খোঁজার থেকেও বেশী ওরা জিনিসপত্তর নষ্ট আর এলোমেলো করছে। লন্ডভন্ড করে খোঁজাখুঁজি চালানোর পরও যখন কিছুই খুঁজে পেলো না মুখিয়ারা, তখন আর কথা না বাড়িয়ে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো ওরা। দরজার এককোণে ঠেস দিয়ে নিষ্পলক দাঁড়িয়ে আছে তাপস কিস্কু আর মানসী। ওরা দেখছে, গ্রামের সিথির মতো আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা কেটে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে মাঁঝি হারাম কিরন বেসরা, পরামানিক উৎপল টুডু, আর গড়াৎ মাঁঝি কমল সারেন।
(৩)
"আবু যত মহালী জাতি, মাৎ কামিঃ বুন হসিব বিতি, বিটা পাড়হ মি বাংখন মাৎ কামিঃ দিশায় মি..."
-গোপাল কিস্কুর কানে ভেসে আসছে গানের মিষ্টি সুর। গানের গলাটা গোপালের চেনা। এটা ওর বাবা তাপস কিস্কুর গলার আওয়াজ। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বাবা মায়ের মুখটা। এটা কি স্বপ্ন? ও বুঝতে পারছে না। সেই কোন সকালে বাড়ির দিকেই তো হাঁটা দিয়েছিলো… তাহলে কি ইতিমধ্যে বাড়ি পৌঁছে গেছে গোপাল? ওই তো দাওয়ায় বসে মা বাঁশের চাঙারি বুনছে। আর তার পাশে বসে বাপ গুঙ্গুন করে গানটা গাইছে। ছোটো বেলায় ওর বাপ ওকে এই গানটা গেয়ে গেয়ে শোনাতো মাঝে মাঝে। আর মুখে বলতো-"বিটা, অনেক বড়ো হতি হবে। পড়ালিখা শিখতি হবে।" বাইরের রাজ্যে কাজ করতে এসে, যে বাড়িটায় ভাড়া থাকতো গোপাল, ওখান থেকে ওদের সবাইকে উঠিয়ে দিয়েছে মালিক। মহামারির প্রকোপ বাড়ছে। কাজ বন্ধ। বাড়ি ভাড়াও দেওয়া হয় নাই। তাই উঠে যেতে হয়েছে। সকালে যে দলটা পশ্চিমবঙ্গের দিকে যাচ্ছে বলে ও শুনেছিলো, তাদের সাথেই ভাব জমিয়ে, পুটলিতে দুটো রুটি আর এক টুকরো কুশুরে গুড় বেধে হাঁটা দিয়েছিলো গোপাল। এই দলটা ছোটো। বাক্স ব্যাগ সমেত, সঙ্গে খাবারের পোটোলা বেধে সবাই রওনা হয়েছে। দলে জোয়ান, বুড়ো, মাঝবয়সী, মেয়ে বউ, এমনকি কোলের বাচ্চা অবধি আছে। কেউ কেউ আবার পিঠের একদিকে খাবারের পোটলা, আরেক কোলে বাচ্চাকে নিয়ে টানা হেঁটে চলছে। রাস্তার মাঝে মাঝে পুলিশি টহল। ব্যারিকেড করা জায়গায় জায়গায়। পুলিশের মুখে পড়লে একশোটা প্রশ্ন- কী কেন… কোথায় যাওয়া হচ্ছে। থেকে থেকে গোপালের কানে ভেসে আসছে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। দুধের খিদা পেয়েছে। মাঝ রাস্তাতেই কিছুটা আড়াল করে বসিয়ে বাচ্চার মুখে স্তনের বোটা গুঁজে দেয় মা। মাঝে মাঝে দলের কেউ কেউ বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করছে নিজেদের ভাগ্যকে। সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। তবু এদের সাথেই মানিয়ে গুছিয়ে চলতে হবে। বাস ট্রেন সব বন্ধ। মাইলের পর মাইল হেঁটে হেঁটেই পেরোতে হবে লম্বা রাস্তা। টানা অনেকটা হাঁটার পর খুব খিদা পেয়ে গেছিলো গোপাল কিস্কুর। তার সাথে চোখ বুজে আসছিলো ঘুমে। তখনো অনেকটা রাস্তা হাঁটা বাকি। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে, তারপর উঠে খাওয়া যাবে নাহয়। দলের বাদবাকি লোকগুলোও ক্লান্ত হয়ে গেছে এতোটা রাস্তা হেঁটে। ওরাও একটু জিরিয়ে নিতে চায়। চারপাশটা খা খা করছে। চ্যাটচ্যাটে পিচ গরম রাস্তার ওপর দুপুরের রোদ এসে পড়েছে। পাশে রেললাইন। এখন ট্রেন চলছে না। দলটা ছাড়া রাস্তায় জনমানব কেউ নেই। দলের বাদবাকি সবার দেখাদেখি রুটির পুটলিটা একপাশে রেখে রেল লাইনের ওপরই শুয়ে পড়ে গোপাল। আর একটা দিন টানা হাঁটলেই বাড়িতে পৌঁছাতে পারবে ও। ভেবে ভেতর ভেতর একটু নিশ্চিন্ত হয় গোপাল। চোখটা লেগে এসেছিলো। আর তখনই চোখের সামনে স্বপ্নটা ভেসে ওঠে গোপালের। হঠাত একটা বিকট আওয়াজ ওর কানে আসে। কীসের আওয়াজ? হুইসিল? কিন্তু... ভাবতে ভাবতেই মনে হলো ওর, নীচের মাটিটা কেঁপে উঠলো। ভুল ভাবলো কী? নাকি এটাও স্বপ্ন? কিন্তু… নাহ স্বপ্ন না! আবার কেঁপে উঠলো মাটিটা। ভীষণ জোরে জোরে ঝাকুনি দিয়ে কাঁপছে আর তার সাথে সাথে ওই বিকটো আওয়াওটা। ধরফর করে উঠে বসে গোপাল কিস্কু। সামনে চোখ ধাধানো একটা তীব্র আলো ক্রমশ ওর সামনের দিকে এগিয়ে আসছে৷ সঙ্গে সঙ্গে তীব্র শব্দের হুইসিল। একটা মালগাড়ি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো গোপাল সমেত ওদের দলের বাদবাকি সবার শরীর। শেষবারের মতো, জ্ঞান হারানোর আগে গোপাল যেন শুনতে পেলো দলের সঙ্গে হেঁটে আসা বাচ্চাটার তারস্বরে কান্নার আওয়াজ। তারপর হঠাৎ করে সব চুপ।
আকাশে একটা সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চাঁদটাকেও কেন জানি না দেখতে তাওয়ায় স্যাকা রুটির মতো লাগছে। সেই চাঁদের আলোটা এসে পড়েছে রেল লাইনের ওপর। সেই আলো আধারিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, রেললাইনের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে গোপাল কিস্কু সমেত দলের বাদবাকি সবার ছিন্নভিন্ন লাশগুলো। থিকথিক করছে রক্ত মাংস পিন্ড, মাথার ঘিলু… আর গপাল কিস্কুর লাশটার ঠিক পাশে পড়ে আছে একটা থ্যাকথ্যাকে কাচা রক্ত মাখানো কাপড়ে আধা মোড়ানো আধপোড়া দুটো রুটি।
(৪)
তাপস কিস্কুর ঘরে চাল বাড়ন্ত। খাবার কেনার টাকাও নেই হাতে। লকডাউনে বিক্রিবাট্টা কিচ্ছু হয়নি। গ্রামের এদিকটায় কোনো দোকানপাট সেরকম নেই। মুদীর দোকানে যেতে হলেও অনেকটা রাস্তা হেঁটে যেতে হয়। এখন বেলা সাড়ে এগারোটা মতো। এখন গেলে দোকান খোলাও পাওয়া যাবে না। তবু যদি একটু হাতেপায়ে ধরে এক ঠোঙা মুড়ি পাওয়া যেতো… সেটার মধ্যেই আগের রাতের রান্না করা বাসি ঝোল ঢেলে ওটা দিয়েই না হয় একবেলা চালিয়ে নেওয়া যাবে। গতকাল থেকেই শরীরটা কেমন জানি ম্যাজম্যাজ করছে। গায়ে জোর পাচ্ছে না তাপস কিস্কু। সারাটা দিন বাড়িতে বসা। এদিকে পেটে খিদার টান লেগেছে। একরকম জেদ চেপেই উঠে দাঁড়ায় তাপস কিস্কু। গায়ে ঘামে ভেজা গামছাটা জড়িয়ে নিয়ে রওনা দেয় গ্রামের আরেক প্রান্তের মুদির দোকানের উদ্দেশ্যে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তেজ বাড়ছে। দোকানের সামনে পৌঁছে তাপস কিস্কু দেখে দোকানের হাট বন্ধ। এই ভয়টাই ও পাছিলো। এতোটা রাস্তা আসার পর শেষে… দোকানটার পেছনেই দোকান মালিকের একচালা বাড়ি। সেটা লক্ষ্য করেই হাক ডাক শুরু করে তাপস কিস্কু। আধপেটা থেকে থেকে গলার স্বর ঝিমিয়ে সরু হয়ে এসেছে ওর। চিৎকার দিয়ে ডাকার জোর নেই গলায়। তবুও যতোটা জোরে সম্ভব ডাকতে থাকে ও। তাপস কিস্কুর ডাকাডাকি শুনেই বেড়িয়ে আসে দোকানি। ওর হাতে পায়ের ধরার জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো কারনে, দোকানি ভেতর থেকে তাপস কিস্কুকে খবরের কাগজের ঠোঙায়, এক ঠোঙা মুড়ি এনে দিলো। দোকানির সামনে বারকতক প্রণাম ঠুকে বাড়ির রাস্তা ধরে তাপস কিস্কু।
মানসী মাটির উনানে গত রাতের বাসি ঝোল গরম করছিলো। স্টিলের সসপ্যানে ধোয়া উঠছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে টকটোক গন্ধ। গরমে নষ্ট হলো নাকি? সেটা হলেই উপায় নাই। ওই দিয়েই খিদা মেটাতে হবে এই বেলা। মুড়ির ঠোঙাটা মানসীকে এগিয়ে দিয়ে, মেঝের ওপর বসে, তাপস কিস্কু হাতপাখাটা হাওয়া খাওয়ার জন্য জোরে জোরে ঝাপটাতে লাগলো। ফরফর করে শব্দ করছে পাখাটা। মানসী ইতিমধ্যে টক ঝোলটা মুড়ির মধ্যে ঢেলে দিয়েছে। মুড়ির ঠোঙাটা দলা পাকিয়ে একপাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খাবারের বাটিটা হাতে নিয়েই মুড়ি ঝোল মেখে বড়ো বড়ো দলা করে গোগ্রাসে গেলা শুরু করলো তাপস কিস্কু। সবে কয়েক দলা খেয়েছে, হঠাৎ ওর নজরে পড়লো ঠোঙাটার দিকে। কীসের ছবি ঠোঙাটায়? খাবার শেষ করে ঠোঙাটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে বাইরে এসে বসে ও। ঠোঙার ভাজগুলো খুলে, ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো তাপস কিস্কু। দিন কয়েকের পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে বানানো ঠোঙা। কাগজের মধ্যে একটা ছবির দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো ও। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে, রেল লাইনের ওপর কয়েকটা স্যাকা রুটি পড়ে আছে। রুটিগুলোর গায়ে লেগে আছে শুকনো রক্তের দাগ। খবরের কাগজের ফটোগ্রাফার বেশ যত্ন নিয়ে মুনশিয়ানার সাথে ছবিটা তুলেছে। পাশেই বিস্তারিত খবরের কিছুটা অংশ লেখা। তাপস কিস্কু ঠোঙাটা টানটান করে মেলে ধরলো। তাতেই লেখাটার যেটুকু পড়া যাচ্ছে সেটাই বিড়বিড় করে পড়ার চেষ্টা করে ও। তাপস কিস্কুর হাতে ধরা বিবৃতিটার অংশটায় ছাপা হরফে লেখা-“মালগাড়ির নীচে চাপা পড়ে ১৬ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু। সূত্র মারফৎ খবর, ওরা প্রত্যেকেই বাইরের শহরে কাজ করতো। লকডাউনে ওরা বাড়ি ফেরার কোনো ব্যাবস্থা করতে না পেরে, হেঁটে হেঁটেই রওনা দিয়েছিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। অনেকটা হাঁটার পর রেললাইনের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। একটা মালবাহী মালগাড়ির নীচে চাপা পড়ে মারা যায় সবাই। স্থানীয় সূত্র মারফৎ খবর, পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে করে বয়ে আনা মালপত্র থেকে কয়েকজনের পরিচয় আমরা জানতে পেরেছি। যদিও এখনো সবার পরিচয় জানা যায়নি। এখনো পর্যন্ত জানতে পারা নাম অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে রয়েছে- সৈয়দ শেখ, দিলওয়ার আলী, রাজু বেসরা, ফরজানা বেগম আর গোপাল কিস্কু…”
বিবৃতির বাকি অংশটা আর পড়া যাচ্ছে না। মৃতদের তালিকার শেষ নামটা পড়ে থমকে গেলো তাপস কিস্কু। ভেতর ভেতর যেন সমস্ত শরীরটা ওর অসার হয়ে আসছে। হাত পায়ের পেশিতে যেন খিচুনি ধরছে। গলার স্বর জড়িয়ে আসছে ওর। মানসীকে ডেকে কিছু জানাতে পারলো না তাপস কিস্কু। ওর পেচুটি লাগা চোখ দুটো ক্রমশ জলের স্তর জমে ঘোলাটে হতে হতে চারপাশের সমস্তটা যেন আবছা হয়ে গেলো। ঠোঙার লেখাগুলো এখন আর ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। তাপস কিস্কু লেখাগুলো পড়ার চেষ্টাও করছে না। অথচ ঠায় তাকিয়ে আছে ঠোঙাটার দিকে। হঠাৎ দাওয়ার সামনে খালি পায়ে কারো একজনের দৌড়ে যাওয়ার আওয়াজ কানে আসতেই সম্বিত ফেরে তাপস কিস্কুর। চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে সামনের ঘোলাটে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করে ও। কে দৌড়ে গেলো। ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়েই ভালো করে দেখার চেষ্টা করে ও। তাপস কিস্কুর চোখের সামনে মুহূর্তে ভেসে উঠলো পর পর কয়েকটা দৃশ্যপট। ও দেখছে দাওয়ার সামনে ছুটে বেড়াচ্ছে ওদের ছেলে গোপাল কিস্কু। পরনে হাফ প্যান্ট, হাফ শার্ট, বছর দশেকের ছোট্টো গোপাল। আর গোপালের পেছন পেছন খাবারের থালা হাতে ছুটে বেড়াচ্ছে মানসী। গোপাল জেদ ধরেছে আর এক দলাও খাবে না। আশপাশের গাছগাছালিতে দুপুরের রোদ মিশে, মাটির ওপর পাতা ডালের ছায়াগুলো যেন নানাও কিসিমের নকশা এঁকে দিয়ে গেছে। তাপস কিস্কুর কানে ভেসে আসছে একটা গানের সুর। এই গানটাই তো ও গোপালকে ছোটোবেলায় গেয়ে শোনাতো। গানটা সহ্য করতে পারছে না তাপস কিস্কু। দুহাতের তালু দিয়ে কান চেপে ধরে ও। তবু গানের সুরটা তালু ভেদ করে ওর কানে আসছে। চেনা গলায় গানের কথাগুলো বার বার ফিরে ফিরে আওসছে তাপস কিস্কুর কানে-"আবু যত মহালী জাতি, মাৎ কামিঃ বুন হসিব বিতি, বিটা পাড়হ মি বাংখন মাৎ কামিঃ দিশায় মি..."
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments