Header Ads Widget

যে রাতে মোর দুয়ার খানি ভাঙল ঝড়ে

যে রাতে মোর দুয়ার খানি ভাঙল ঝড়ে Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)





#গল্প - যে রাতে মোর দুয়ার খানি ভাঙল ঝড়ে 


দুম...দুম...দুম...দুম......
আবার শুরু হয়েছে, একটা রাতের জন্যেও নিস্তার নেই আর। ঘরের মধ্যে কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় এক কোণে পরে রয়েছে অশীতিপর একটি দেহ, দূর থেকে দেখলে তাতে প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না, তবে কাছে পৌঁছালে ভয়ার্ত, এক জীর্ণ বৃদ্ধার অন্তিম শ্বাসের ক্ষীণ ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়।
শব্দটা শুনে প্রভাবতী আরও যেন গুটিয়ে গেল, শামুকের মত মানুষেরও কেন খোল থাকে না, বিপদে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য। হয়তো মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, একের বিপদে-আপদে আরেক জন এসে পাশে দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক, তাই খোল নেই, কিন্তু সবাই কি পাশে এসে দাঁড়ায় ? নিজের বলেও কি কেউ হয় এই কলিযুগে ? নিজের মনকেই একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন বাষট্টির এই বিধবা মহিলা, তবে উত্তরের প্রতীক্ষা তিনি করছেন না, বা হয়তো উত্তরগুলো তার জানা।
বিধবা হলেও প্রভাবতী সংসারে একা নন, তার এক সুপুরুষ ছেলে আছে, ভীষণ সুপুরুষ। ছেলে মাধবের বয়স বত্রিশ পেরল। তবে কাজকর্ম সে বিশেষ কিছু করে না, শুধু নিয়ম করে প্রতি সন্ধ্যায় জুয়া খেলে, রাতে দু’চার বোতল দেশী ঢালে পেটে আর শেষরাতে বাড়ি এসে............
দুম...দুম...দুম...দাম......
জোর ক্রমে বাড়ছে। দরজায় করাঘাত করছে কে ? নাকি এটা পদাঘাতের শব্দ ? রোজ শুনেও বুঝতে পারি না, নিজের মনে মনেই বৃদ্ধা কথা বলে চলেছেন। আজ আর কিছুতেই দরজা খুলবো না, কিছুতেই না।
মাধব তার প্রথম সন্তান নয়, এর আগে এক লক্ষ্মীমন্ত মেয়েকে জন্ম দিয়েছিল প্রভাবতী, আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিল মনিকঞ্চিকা। কিন্তু তার সেই চোখের মণি বেশিদিন থাকল না, মাত্র চার বছর বয়সে ডাইরিয়ার বিষ ছোবল পরল মেয়ের শরীরে। তিন রাত্রির অসম যুদ্ধে হার মানতে হল প্রভাবতীকে, তার চোখের মণি ততক্ষণে ঈশ্বরের মুকুটে স্থান পেয়ে গেছে। মাতৃক্রোড়ে একটুকরো অমাবস্যা উপহার দিয়ে, পৃথিবীর বুকে দীপ্তি ছড়াচ্ছে সেই মণি।
জয়ব্রতের তখন খুব দীন অবস্থা, নুন আনতে পান্তা ফোরায়। গ্রামের এক কোণে তার ক্ষুদ্র মুদিখানা, বিক্রিবাট্টা নেই বললেই চলে। যেটুকু উপার্জন তা দিয়ে অতি কষ্টে সংসার টানছিল, মেয়ের অকাল প্রয়াণে ভীষণভাবে ভেঙ্গে পরল। সারাটা দিন দোকানের খাতিরে তাকে বাইরে থাকতে হত, মেয়ের সাথে দেখা হত বড় জোর তিন প্রহর, তারমধ্যে আবার দু’প্রহর মণি ঘুমিয়ে কাটাত। তবে, তা বলে কি আর বাপের মনে কষ্ট কিছু কম হবে ? মেয়ে যদি মা’র কোল আলো করে থেকে থাকে, তবে বাপের মন আলো করেও তো সেই ছিল। মেয়ের মৃত্যুর পর গ্রামে আর মন বসল না স্বামী-স্ত্রীর, ভিটে মাটি বেঁচে দিয়ে কলকাতা সংলগ্ন সোনারপুরে এসে উঠল দুটো প্রাণ। নতুন জীবনের বীজ বপন করল খুব যত্ন নিয়ে। আর মুদির ব্যবসা নয়, জয়ব্রত এবার অটো-রিক্সা চালাতে শুরু করল। মালিককে তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার পর যেটুকু উপার্জন হত তাতে বেশ ভালো করেই সংসার চলে যাচ্ছিল দু’জনার। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভালো- এই উপলব্ধি বোধ তাদের মধ্যে ছিল। তাই নিজেদের সাধ্যের পাঁচিলের মধ্যেই তারা একটু একটু করে গড়ে তুলছিল তাদের স্বপ্নের ইমারত।
ঈশ্বরও যেন এই অভাগা কুঠিরে ধীরে ধীরে মুখ ফিরে তাকাচ্ছিলেন। প্রভাবতীর কোল আলো করে এবার এক পুত্র সন্তান জন্ম নিল। যে ঈশ্বরের মুকুটের মণি হয়েছিল তার একমাত্র কন্যা, সেই ইষ্টদেবের নামেই ছেলের নামকরণ করল প্রভাবতী। ছেলে মাধবকে কখনো চোখের আড়াল হতে দিত না, সবসময় আগলে আগলে রাখত, পাছে কোন রোগ বাঁধিয়ে বসে। নিজেরা যত সামান্য খাবারই খাক না কেন, মাধবের জন্য রোজ একটা করে ফল নিয়ে আসত জয়ব্রত। সংসারে যতই আর্থিক অনটন থাক না কেন তার আঁচ কোলের শিশুর উপর কখনই পরতে দেয়নি তারা। মদের নেশা কোনদিনই ছিল না জয়ব্রতের, ছেলে হওয়ার পর বিড়ির নেশাও ছেড়ে দিল। তাদের জীবনের তখন একটাই লক্ষ্য মাধবকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
-ঐ বুড়ি, দরজা খোল। ঘাটের মরা। শালা, আমার বাড়িতে আমাকেই ঢুকতে দিচ্ছে না। সব ভেঙ্গে দেব, খোল দরজা।
মাধবের প্রলয়ঙ্কার চিৎকারে প্রভাবতীর বুক কেঁপে উঠল। গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না, স্বরধ্বনি যেন স্বেচ্ছা নিদ্রায় গেছে। এই ছেলেকেই সে পেটে ধরেছিল। দশমাস ধরে শত ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করা কি এই দিন দেখার জন্যই ? মাধবের বাপ বেঁচে থাকলে এই দিন হয়তো দেখতে হত না।
মাধবের তখন দশ বছর বয়স। জয়ব্রত অন্যদিনের মত অটোরিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পরেছিল, মাঝরাস্তায় এক মদমত্ত লরি চালকের সামনে এসে পরে তার অটো। সেই মুহূর্তে ঐ লরিচালক শুধু এক চালক নয়, যেন স্বাক্ষাৎ যম। নিজেকে বাঁচানোর মরিয়ে চেষ্টা করে জয়ব্রত, কিন্তু নিয়তির কাছে সে পরাস্ত হয়। অটোরিক্সার হলুদ কালো রঙ তখন রক্তের লাল চাদরে ঢাকা পরে গেছে। কোন কিছু বুঝে উঠবার আগেই প্রভাবতীর সিঁথির সিঁদুর ধুয়ে গেল চোখের জলে। জীবনে তখন আরও একবার ঘোর অমাবস্যা।
সংসার চালাবে কি করে, এই প্রশ্ন তখন প্রভাবতীকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। উপায়ান্তর না পেয়ে ঝি বৃত্তি শুরু করল প্রভাবতী। ছেলের স্কুলের ফি র যোগান দিতে হবে, তার জন্য নিজের এই পরিশ্রম ও লঘু বলে মনে হত প্রভাবতীর।
ছেলে মাধবও তখন মা অন্ত প্রাণ। স্কুল শেষ হলে হন্যে দিয়ে পরে থাকত চাটুজ্যেদের বাড়ির গেটে, সে বাড়িতেই যে তার মা ঝি এর কাজ করত। কাজ শেষে মা ছেলে একসাথে বাসায় ফিরত। কাজের ভারে ধ্বস্ত হাতজোড়া, ছেলের কোমল শরীর ছোঁয়ার সাথেসাথেই নতুন করে প্রাণের হদিশ পেত। ছেলের মুখে তখন বাঁধনছাড়া ভাষার বুলি ছুটছে, সারাটা দিনের ইতি বৃত্তান্ত তার মাকে বলা খুব প্রয়োজন। প্রভাবতীও গভীর আগ্রহে ছেলের প্রতিটি কথা শুনত। পাশের বাড়ির মালা বৌদি মস্করা করে বলত- ঐ দেখ মাধব আসছে, মা যশোদাকে সঙ্গে নিয়ে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে প্রভাবতীর চোখে জল আসে, সবকিছু কেমন ঘোলাটে লাগে, এই মাধবই কি এখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ? এই মাধবই কি অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে নিজের মা কে ? রোজ শেষরাতে বাড়ি ফিরে............।আর কিছু ভাবতে পারে না প্রভাবতী, অব্যক্ত যন্ত্রণা চোখের জল হয়ে ঝরে পরে। বর্তমান বড় বেদনাময়, কণ্টকপূর্ণ এর চেয়ে অতীত ভালো। স্নেহ, ভালোবাসার সুখস্মৃতিতে সে স্নাত।
মাধবের বয়স তখন পনের। প্রভাবতী আচমকাই একদিন মূর্ছা গেল চাটুজ্যেদের বাড়িতে। মায়ের অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে উঠেছিল মাধব, বদ্যিকে ডেকে এনেছিল কিন্তু বদ্যির ওষুধে সাময়িক ভাবে সুস্থ হলেও প্রভাবতী শরীরের হারানো বল ফিরে পায়নি। কিছুদিন বাদে প্রভাবতী আবার জ্বরে পরল, ওষুধ খেয়ে দিনের বেলায় সুস্থ থাকে আবার রাতে জ্বর ফিরে আসে। এমতাবস্থায় ঝি-বৃত্তি শরীরকে আরও কঙ্কালসার করে তুলল। মায়ের যন্ত্রণা মাধব সহ্য করতে পারল না, স্কুলের শেষে দিনমজুরের কাজ করতে শুরু করল আর মা কে জোর করে বাড়িতে আটকে রাখল। ছেলের সেবা- শুশ্রূষায় দিন পনেরর মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠল প্রভাবতী। আবার আগের মত চাটুজ্যেদের বাড়ি কাজ শুরু করল আর ছেলের দিনমজুরীর কাজও বন্ধ করাল। এমন স্নেহ ভালোবাসার উপাখ্যান সচরাচর শোনা যায় না কিন্তু প্রভাবতী আর মাধবের সম্পর্ক ছিল দেবদত্ত, সারা পাড়ায় মা-ছেলের অটুট বন্ধনের কথা চাউর হতে লেগেছিল। কিন্তু কার নজর লাগল এই সম্পর্কে ? কবে থেকে জ্বলতে শুরু করল তার সুখের সংসার ? কার গরলে বিষাক্ত হয়ে উঠল প্রভাবতীর জীবন ? পুরনো স্মৃতির পাতা মনের অগোচরে হাতড়ে যাচ্ছে প্রভাবতী, শুধুই হাতড়ে যাচ্ছে।
দূরে কোথাও বাজ পরল। মাধবের পদাঘাতের শব্দ প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে ফিকে পরে গেছে। আকাশের রঙ কি এখন সিঁদুরে লাল ? বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে ? মাধব কি ভিজে গেল ? অজস্র প্রশ্ন মনের কোণে এসে জড়ো হচ্ছে, কিন্তু তার কোনটারই উত্তর প্রভাবতীর জানা নেই। চোখ মেলে বন্ধ জানলার ভিতর দিয়ে আকাশটাকে ছুঁতে চাইল প্রভাবতী, জীবনের সব জ্বালা, যন্ত্রণা মেলে ধরতে ইচ্ছে করছে পৃথিবীর বুকে যাতে স্নিগ্ধ, কোমল বারিধারা এসে তাদের ধুইয়ে দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পারবে কি তারা বেদনামুক্ত করতে ? নাকি যন্ত্রণার উত্তাপে ওরাও বাষ্পীভূত হয়ে যাবে।
-কি হল দরজা খুলবে কি না? এরফল ভালো হবে না কিন্তু এই বলে দিলাম। ঐ বুড়ি। শালা, একবার ভিতরে ঢুকি তারপর পুরো জন্মের মত তোর মুখ বন্ধ করে দেব। কাল রাতে এত ক্যালালাম তারপরও এত্তো সাহস, আবার আমায় বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। সব ভেঙে চুরমার করে দেব। আগুন লাগিয়ে দেব, জ্বলে পুড়ে মরবি। ঐ বুড়ি দরজা খোল।
দেশী মদের চুড় মাধব যে কি বলছে তা কি সে নিজেও জানে। কাকে সে পুরিয়ে মারবে ? ঘরে যে মহিলা পরে রয়েছে তারমধ্যে কি আর কোন জীবনীশক্তি অবশিষ্ট রয়েছে ? সে যে স্বয়ং একটা জলজ্যান্ত লাশ, অনেকদিন ধরে একটু একটু করে পুড়ছে। ছাইয়ের কি আর দহন হয় ? সে যে নিজের ইচ্ছায় শুধু ভেসে বেড়ায়, শূন্য থেকে মহাশূন্যে।
মাধবের স্বর প্রভাবতীর কান অবধি এসে পৌঁছাল না। প্রভাবতী এখন ভেসে যাচ্ছে অতীতের স্বপ্নরাজ্যে আরও একবার।
মাধবের বয়স তখন ঊনিশ। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করে মাধব। প্রভাবতীর সখ ছিল ছেলে আরো পড়াশোনা করবে কিন্তু ছেলের মন তাতে সায় দিল না। মায়ের কষ্ট তারপক্ষে দেখা আর সম্ভব ছিল না, তাই কলকাতায় এসে কাজের খোঁজ করতে থাকল মাধব। মাস খানেকের মধ্যে কাজ জোগাড় ও করে ফেলল, কলেজ পাড়ায় এক প্রিন্টিং হাউসে। অঙ্কে খুব মাথা ছিল মাধবের তাই হিসেব রক্ষকের চাকরি পেল সে। সাথে সাথে কাগজের গুণগত মান বিচার, নতুন অর্ডার নেওয়া, ডেলিভারি সংক্রান্ত সব তথ্য থাকত মাধবের জিম্মায়। মালিক বেশ ভালো অঙ্কের মাইনে দিত মাধবকে। মাধবের উপার্জনে বেশ সুখে চলতে থাকল দুজনের সংসার, প্রভাবতীও ঝি বৃত্তি বন্ধ করে দিল ছেলের আদেশে। মা ছেলের ছোট্ট সংসার জুড়ে তখন শুধুই সুখের দীপাবলি। মাধব তার উপার্জনের অর্থ পুরোটাই তুলে দিত প্রভাবতীর হাতে আর প্রভাবতী তা দিয়ে খুব যত্ন সহকারে সাজিয়ে তুলছিল তার স্বপ্নের বাসভূমি। বহুদিন পর এক চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করছিল। একে একে ঘরে ইলেকট্রিসিটি এল, গ্যাস ওভেন এল, পুরসভার থেকে জলের লাইন বসল। দূর হটল জয়ব্রতের কেনা এক জোড়া লণ্ঠন, গ্রাম থেকে সাথে করে নিয়ে আসা মাটির উনুন, প্রয়োজন হারাল নিমাইদের দেওয়ালে লেপা ঘুঁটের সারি আর রাস্তার মোড়ের মাথার টিউব ওয়েল।
ছেলের প্রগতিতে উচ্ছ্বসিত প্রভাবতী বোধহয় ভুলে গিয়েছিল, সময়ের স্রোতে যন্ত্রের পাশাপাশি মানুষ ও প্রয়োজন হারায়, তাকেও তখন বদল করতে চায় সকলে। এই উপলব্ধি বোধ এল আরো
প্রায় বছর আটেক পর।
মাধবের বয়স তখন ছাব্বিশ কি সাতাশ। পাশের পাড়ার এক মেয়ের প্রেমে পরল মাধব। মায়ের কাছে তাকে বিয়ের প্রস্তাব পারল। ছেলে অন্ত প্রাণ প্রভাবতী সাতপাঁচ না ভেবেই ছেলের মতে সায় দিয়ে দিল। সমস্ত নিয়ম মেনে শাস্ত্র মতে বিয়ে হল মাধবের। মা ছেলের ছোট্ট সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠল বৌমার আগমনে। মাধবের স্ত্রী ঊর্মিলা রূপে যে লক্ষ্মী এতে কোন সন্দেহ ছিল না কারো তবে তার বিশেষ কোন গুণ ছিল না। পাঁচ ক্লাসের বেশী পড়েনি ঊর্মিলা, রান্না-বান্নাও কিছু করতে জানে না। কাজ বলতে সারাদিন নরম বিছানায় আরাম করে নিদ্রা যাপন।
এহেন মেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই প্রভাবতীর চক্ষুশূল হয়ে উঠল। কথায় কথায় বৌমার সাথে অশান্তি হতে লাগল। তাকে কিছু বলতে গেলে মহারানি তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেও পিছপা হত না। এইসব নারীসুলভ সমস্যা থেকে মাধবকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল প্রভাবতী, কিন্তু কতদিন আর বৌমার ঝাঁটা লাথি মুখ বুজে সহ্য করা যায়,শেষে বাধ্য হয়ে একদিন ছেলের কাছে নালিশ ঠুকে বসল বৌমার নামে। বৌমা তখন তিনদিনের জন্য বাপের বাড়ি গিয়েছিল, ফেরামাত্র মাধবের সেকি হম্বি তম্বি। পারিবারিক অশান্তি কোনদিনই প্রভাবতীর ভালো লাগে না তবে সেদিন বেশ লেগেছিল, মনে হয়েছিল এতে হয়তো বউ এর স্বভাব কিছু বদলাবে। ফল হয়েওছিল বটে। বৌমা এই ঘটনার পর থেকে গায়ে গতরে খেটে ঘরের কাজ করতে শুরু করেছিল, তবে রান্নাঘরের ছায়া সে মারাত না কোনদিন। এতে অবশ্য প্রভাবতীর কোন অভিযোগ ছিল না বরং ভালোই লাগত, নিজের ছেলেকে নিজের হাতের খাবার খাওয়ানোতে যে আলাদাই মজা আছে, সে কথা কোন মা অস্বীকার করতে পারবে ?
দেখতে দেখতে বছর দুই পার হল। সংসার জুড়ে তখন চরম নিস্তব্ধতা, তিনটে মানুষ যে যার মতো করে আছে,সারাদিন বাড়িতে কোন অশান্তি নেই। শুধু রাতবিরেতে ছেলে-বৌমার ঘর থেকে অকথ্য গালির শব্দ শুনতে পেত প্রভাবতী, তবে বিষয়টাকে সে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সামান্য ঠোকাঠুকি কোন ঘরে থাকে না, তবে এ সমস্যা নিজে থেকেই সুরাহা হয়ে যায় বরং তৃতীয় কারোর অনুপ্রবেশেই সমস্যা আরও গুরু আকার ধারণ করে। তাই প্রভাবতী কখন এসব ঘটনায় নাক গলায়নি, কিন্তু সব সমস্যার সমাধান যে নীরবতার সাথে করা যায় না- একথা বুঝতে প্রভাবতীর খানিক দেরী হয়ে গিয়েছিল।
সেইদিনটা আজও প্রভাবতীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দোল পূর্ণিমা আসতে তখন আর দিন তিনেক বাকি, ঊর্মিলা দোর আগলে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। বৌমাকে একা পেয়ে রঙ্গ করে প্রভাবতী জিজ্ঞেস করেছিল - কবে সুখবর দিবি রে বউ ? নাতি-পুতিকে দেখার জন্য চোখ যে জুড়িয়ে যায়।
জ্বলন্ত লাভার মত উছলে উঠেছিল ঊর্মিলা, ধিক্কার জানিয়ে বলেছিল – সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য একটা মরদের দরকার হয় রে বুড়ি। তুই যাকে পেটে ধরেছিলি সে তো মরদ নয়, মরদের বেশে একটা মাগী। রাত-বিরেতে বৌ এর গায়ে হাত তুললে কেউ পুরুষ মানুষ হয়ে যায় না, এটা বুঝিয়ে দিস তোর নপুংশক ছেলেটাকে।
ঊর্মিলার কথা শুনে কান পুড়ে গেছিল প্রভাবতীর। তার সন্তান নপুংশক, একথা কিছুতেই মানতে চায়নি তার মন তবে একথা যাচাই করে দেখার মত সাহস প্রভাবতী কিছুতেই দেখিয়ে উঠতে পারেনি, কিন্তু সমস্যার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেই সমস্যা তো আর দূর হয়ে যায় না।
দোল পূর্ণিমার পরের দিন ঊর্মিলা বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা হয়ে গেল, মাধব তখন কাজে গেছে। বৌমাকে ছেলে ফেরা অবধি অপেক্ষা করতে বলেছিল প্রভাবতী কিন্তু ঊর্মিলা সে কথা শুনতে চায়নি, প্রভাবতীও এ নিয়ে বিশেষ বাধা দেয় নি বৌমাকে কিন্তু এর ফল হল মারাত্মক। মাধব বাড়ি ফিরে যখন জানতে পারে ঊর্মিলা বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে, তখন রাগে-ক্রোধে তার চেহারার গড়ন পাল্টে যায়। দেখতে দেখতে সাত দিন কেটে যায় কিন্তু বৌমা আর বাড়ি ফেরে না,বাধ্য হয়ে প্রভাবতী ছেলে মাধবকে শ্বশুরালয়ে পাঠায় আর এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে বসে। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে মাধব জানতে পারে যে ঊর্মিলা কখনো সেখানে আসেইনি।পাড়া,প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ করতে করতে অবশেষে ঊর্মিলার তথ্য তার সামনে আসে।স্বামীর অক্ষমতায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে তার বাল্যবন্ধু রঞ্জনের হাত ধরে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছে আর কখনো এ শহরে সে ফিরে আসবে না, এ নাকি ঊর্মিলার নিজের কথা। ঊর্মিলার বান্ধবী শীলা মাধবকে এ কথা জানায়।
নিজের অক্ষমতার কথা চার কান হওয়ার সাথে সাথেই মাধবের আচার-আচরণ বদলাতে থাকে। যে ছেলে কোনদিন বিড়ি ধরায়নি তার হাত জুড়ে এখন শোভা পায় দেশী মদের বোতল। কাজে যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দেয় মাধব, অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে মাতাল আখ্যা দিয়ে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
চোখের সামনে নিজের ছেলেকে একটু একটু করে মরতে দেখছিল প্রভাবতী। ঊর্মিলাকে ছাড়া ছেলে কেমন শুকিয়ে যাচ্ছিল, প্রভাবতীর মনে হল ছেলের আবার বিয়ে দেওয়া উচিৎ। একদিন সাহস করে মাধবের কাছে কথাটা পারল, আর তাতে আর একটা ঘোর বিপদ ঘটল।
মদমত্ত মাধব তখন স্বাক্ষাৎ যমের মূর্তি ধারণ করেছে, নিজের মা কে চিৎকার করে বলল- হারামজাদি, আমার পয়সায় খাস আবার আমার সাথেই রঙ্গ। বুড়ি তোর জন্য আমার বউটা পালিয়েছে, তোর আর মুক্তি নেই। কথা শেষ হতে না হতেই হাত চালাতে শুরু করেছে মাধব। কিল, চর, ঘুসি, লাথি - সব আছড়ে পরছে ষাটোর্ধ প্রভাবতীর শরীর জুড়ে। প্রভাবতীর চোখে তখন মুক্তের দল ভিড় করেছে, অস্ফুট স্বরে নিজের আত্মজকে বলার চেষ্টা করছে কিছু কথা কিন্তু স্বর তার জোর হারিয়েছে বা হয়তো ঘটনার বীভৎসতায় সে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেছে, কিন্তু স্বরের পাশাপাশি প্রভাবতী মরে না, রোজ রাতে নিয়ম করে ছেলের হাতে পাশবিক অত্যাচার সহ্য করে। ধীরে ধীরে হাত পায়ের বল হারায়, অর্ধমৃত প্রায় হয়ে পরে থাকে ঘরের কোণে তবু যম তাকে পাকাপাকি ভাবে নিয়ে যেতে আসে না। মায়া, বড় মায়া যে তার মাধবের প্রতি। হোক না সেই ছেলেই তার যন্ত্রণার কারণ তবু সে তার আত্মজ। পেটে ধরার ব্যথা সহ্য হয়েছিল আর এ যন্ত্রণা সহ্য হবে না। দশ মাসের ব্যথার শেষে মাধব এসেছিল জীবনে তবে এ ব্যথার পর কি আসবে তা প্রভাবতী জানত না।
তবে এখন সে জানে, মৃত্যু আসবে, আসবেই। সব যন্ত্রণা শুভ হয় না তাই জীবনে সব ব্যথাকে বরণ করার প্রয়োজনও নেই। ঊর্মিলা পেরেছে যন্ত্রণা কাটিয়ে জীবনের নবীন বসন্তে ফিরে যেতে, প্রভাবতীকেও পারতে হবে। তাই আজ আর সে দরজা খুলবে না, আসতে দেবে না যন্ত্রণাকে, শান্তিতে ঘুমাবে একটা রাত পরম নিশ্চিন্তে নীরবে।
ধীরেধীরে উঠে বসল অশীতিপর দেহখানা, মুখের লালিমা আজ আবার যেন ফিরে এসেছে। ছেলের কালিমা তাকে যে অন্ধকূপে ঠেলে দিয়েছিল তার থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা হয়তো সে দেখতে পেয়েছে। ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি। প্রভাবতী যেন এই রাতটার জন্যেই এত দিন ধরে অপেক্ষা করছিল। আজ যেন তার জয়ের রাত, মুক্তির রাত, যা কিছু শুভ তা উৎযাপনের রাত। জয়ব্রতের মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে প্রভাবতী, জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে দুষ্টু মিষ্টি হাসছে।
-জয়ব্রত তুমি কি আমার গান শুনতে এলে, এত দিন পর তোমার আমার গান শোনার ইচ্ছে হল। তবে তুমি চিন্তা কর না, আমি গাইব-নিজের সাথেই কথা বলে চলেছে বৃদ্ধা।
আর তারপর দরজার বাইরে সোর তোলা মাধবকে অগ্রাহ্য করে প্রভাবতী গাইতে শুরু করল, ঠাকুরের গান------
“ যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে
জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে......”
কার আবাহনে গান ধরল বৃদ্ধা ? জয়ব্রত নাকি ......।
ভোরের আলো এসে পরেছে প্রভাবতীর মুখে, আলোর তেজে আরও দীপ্তিময় লাগছে মুখখানা। শান্তিতে ঘুমাচ্ছে প্রভাবতী, সে এখন চিরনিদ্রায় শায়িত। রাতের অতিথি তার হাত ধরেছে; নিয়ে গেছে তাকে চির বসন্তের দেশে আর মাধব এখনো জীবনের দরজার বাইরে শুয়ে অপেক্ষা করছে চোখ ফোঁটার।

সমাপ্ত

একটা অন্যরকম প্রচেষ্টা। মতামত জানাবেন, কেমন লাগল।













website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments