Header Ads Widget

নাইন_লাইভস

নাইন_লাইভস Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)







#গল্প

#নাইন_লাইভস



"এ ক্যাট হ্যাজ নাইন লাইভস", কথাটা শুনেছ নিশ্চয়ই? একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেটটা দুআঙুলের ফাঁকে ধরে প্রশ্নটা করলেন দুর্জয় সান্যাল। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশ-বাহান্ন হবে। পেটানো চেহারা, স্বাস্থ্য এখনো বেশ ভালো। অল্পবয়সে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ছিলেন বোঝা যায়। ভদ্রলোকের সঙ্গে আমাদের আলাপ বছরখানেক আগে একটা পার্টিতে। আমরা চার বন্ধু, আমি, রমেশ, গৌরব ও শুভ, আমরা যাকে বলে অবিচ্ছেদ্য। চারজনেরই বয়স সাতাশ-আঠাশ, প্রত্যেকেই অবিবাহিত এবং একই কোম্পানিতে চাকরি করি। কোম্পানির কাজেই গিয়েছিলাম একটা সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে। সেখানেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। তারপর বেশ জমে গেল। ওঁর পেশাটা একটু অদ্ভুত। নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ডেমনোলজিস্ট বা অপদেবতা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। ভদ্রলোকের বাবা বেশ কিছু টাকাপয়সা তাঁর একমাত্র সন্তানের জন্য রেখে মারা যান। ফলে তাঁকে গ্রাসাচ্ছাদনের চিন্তা করতে হয়নি। বদলে বিভিন্ন দেশের ও উপকথার ভূত, প্রেত, পিশাচ, ঘুল, ভ্যাম্পায়ার, ওয়‍্যারউলফ, জ্বীন এইসব নানা সুপারন্যাচারাল এনটিটি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন সারাজীবন। ওনার লেখা বইও আছে এ বিষয়ে। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, হাতেকলমে নানা এক্সপিডিশনে গিয়ে বেশকিছু অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন দুর্জয়বাবু। আমাদের সান্ধ্য আড্ডায় তিনি মাঝে মাঝে আসেন। এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের শোনান ভদ্রলোক। বিশ্বাস করি বা না করি, ভদ্রলোকের বলার ভঙ্গিটি ভারী চমৎকার। গল্পগুলো শুনতে বেশ লাগে। সেরকমই একটা অভিজ্ঞতার কথা হচ্ছিল।

আমরা সমস্বরে বললাম যে বেড়ালের যে নাইন লাইভস সেকথা শুনেছি বটে, তবে এর তাৎপর্য কখনও বোধগম্য হয়নি। উত্তরে বেশ স্বতন্ত্র একটা একপেশে হাসি দিলেন ভদ্রলোক, তাঁকে চেনার সুবাদে জানি, এরপরই একটা জম্পেশ গল্প আসতে চলেছে। আমরা ফরাশের উপর জমিয়ে বসলাম। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে শুরু করলেন ভদ্রলোক। গল্পটা তাঁর জবানিতে তাঁর মত করেই বলার চেষ্টা করব।

বছর পনেরো আগে ব্যাঙ্গালোর শহরে হঠাৎ করে পরপর অদ্ভুত ধরণের মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হতে থাকে। রাস্তার ধারে, বাসস্টপে, পার্কে ডেডবডি পাওয়া যাচ্ছে; কোনো হিংস্র জানোয়ার যেন ধারালো নখে সর্বাঙ্গ ফালাফালা করে চিরেছে। দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে মাংস খুবলে খুবলে খেয়েছে কোনো জানোয়ার। পুলিশ কোনো কিনারা করতে পারছে না। বেশিরভাগ ভিকটিমই অল্পবয়সী ছেলে। যদিও প্রথম শিকার এক তরুণী। ঘটনাটা ঘটে ওখানকার এক ডিগ্রি কলেজে। একটি মেয়ে, তার নাম মীরা, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ক্যান্টিনে বসে থাকার সময় ছুরি দিয়ে অমলেট কাটতে গিয়ে তার হঠাৎ আঙ্গুল কেটে যায়। সামান্যই কাটা। মুখে আঙ্গুল দিয়ে রক্ত বন্ধ করার পর তার হঠাৎ শরীর খারাপ শুরু হয়। তখন সে টয়লেটে যেতে চায়। তার বান্ধবী রিয়া তার সাথে যায়, তাকে সাহায্য করতে। তার শরীর খারাপ বলেই গিয়েছিল, এমনটাই পুলিশের অনুমান। এই অবধি অনেকেই প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। তারপর টয়লেটে যে ঠিক কি হয়েছিল সেটা জানা যায় না। একটা আর্তনাদ শুনে লোকজন জড়ো হয়। তারপর দরজা ভেঙে দেখা যায় মীরা এককোণে জড়সড় হয়ে বসে ভয়ে কাঁপছে। তার দুচোখ বোজা। আর সামনে রিয়ার বিকৃত মৃতদেহ পড়ে। ঠিক একইরকম নখের ক্ষত, তার সাথে দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস খোবলানো। মীরা কিছু একটা দেখে খুব ভয় পেয়ে থাকায় তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের করা যাচ্ছিল না প্রথমে। পরে একটু ধাতস্থ হয়ে সে পুলিশকে যা বলেছিল তার মর্ম এইরকম, বাথরুমে ঢুকে তার প্রচন্ড বমি পায়। সে বেসিনে বমি করছিল। রিয়া পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ একটা চাপা গোঙানির শব্দে সে রিয়ার দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে আর আতঙ্কে পাথর হয়ে যায়। কি এমন দেখেছিল সে? তার কথায়, রিয়ার গলায় তীক্ষ্ণ নখের আঘাত, সে মৃতপ্রায়। তার উপর ঝুঁকে বড় বড় নখ দিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করছে একটা অদ্ভুত জানোয়ার। তার দেহের কোমর অবধি অংশ মানুষের মত, তার উপরের অংশ অনেকটা কালো চিতাবাঘ বা ব্ল্যাক প্যান্থারের মত। হাতে দীর্ঘ বাঁকানো নখ। সেটা এবার রিয়ার শরীর থেকে মাংস খুবলে খেতে শুরু করেছে। আচমকা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মীরা চিৎকার করতেই জানোয়ারটা তার দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। তার মুখে ও থাবায় রক্ত মাখা। সেটা তার দিকে এগিয়ে আসতে গিয়েও লোকজনের পায়ের আওয়াজ পেয়ে নাকি স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। পরে লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।

এই অবধি শুনে রমেশ প্রশ্ন করল, "পুলিশ মেয়েটার বয়ান বিশ্বাস করেছিল?" "অবশ্যই না", বললেন সান্যালমশাই, কিন্তু ওদের কিছু করার ছিল না। মীরার পোশাকে আর হাতে কিছু রক্ত লেগেছিল, ওগুলো তার কথা অনুযায়ী রিয়ার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে লেগেছে। প্রথমে নাকি তার বিশ্বাস ছিল রিয়া মরেনি, কেবল আহত। পুলিশের এই যুক্তি পছন্দ না হলেও মেয়েটার কাছে এমন কোনো ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়নি যা দিয়ে এভাবে হত্যা করা সম্ভব। আর মাংস খুবলে নিল কে? যদি মীরাই হত্যা করে থাকে তাহলে তার মোটিভ কি? এসব প্রশ্নে তাকে আর গ্রেফতার করা যায়নি। তবে পুলিশ কিছুদিন কড়া নজর রেখেছিল তার উপর। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই পায়নি।

মীরা শহরতলিতে তার বাবামায়ের সঙ্গে থাকত। তাঁরা খুবই শান্তিপ্রিয় ছিলেন এবং তাঁদের সম্পর্কে কারোর কোনো অভিযোগ ছিল না। তারপর ব্যাঙ্গালোর শহরের বিভিন্ন জায়গায় খুন হতে লাগল, এই একই রকম প্যাটার্নে। সেগুলোর সাথে এই মীরা মেয়েটির আপাতদৃষ্টিতে কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি। তাই পুলিশ তাকে একরকম ভুলেই গিয়েছিল। এর পরের খুনগুলোর মধ্যে একটা কমন ফ্যাক্টর ছিল। সেটা হচ্ছে যে এইসমস্ত খুনগুলো প্রায় প্রতিটাই হয়েছিল হাইওয়ের ধারে কোনো শুনশান পেট্রোল পাম্প বা ধাবা এসবের কাছাকাছি। আর ভিকটিমরা প্রায় সবাই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, বাইকে চেপে ঘরে ফেরার সময় আক্রান্ত হয়। এই খুনগুলোর কোনো কিনারা করা যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো পুলিশের পক্ষে, তখন এর পেছনে কোনো অপশক্তির হাত আছে বলে ধরে নিলেন অনেকেই। ফলে ব্যাঙ্গালোর পুলিশের একজন অফিসার আমার সাথে যোগাযোগ করলেন উপরমহলের নির্দেশে। তখন এরকম কিছু কেস সলভ করে আমার কিছু নামডাক হয়েছে। তাই একজন ডেমনোলজিস্ট হিসাবে আমাকে ব্যপারটার অতিপ্রাকৃত সম্ভাবনার বিষয়টা খতিয়ে দেখতে বলা হল, অবশ্যই আনঅফিশিয়ালি, তবে পুলিশের সবরকম সাহায্য আমি পাব, বিপদকে চিহ্নিত করা, ও তাকে নির্মূল করার কাজে।

ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে কেসগুলোর ডিটেলস পেলাম পুলিশের কাছ থেকে। কেস ফাইল থেকে ভিকটিমদের সব ক্ষতগুলোর ছবি দেখে আর মীরার দেওয়া জীবটির বর্ণনা থেকে মোটামুটি একটা আন্দাজ হল বিষয়টা কি হতে পারে। এসব নিয়ে কাজ তো কমদিন করছি না, এসব বিষয়ে আমার সচরাচর ভুল হয়না। পুলিশ অফিসারকে বললাম, "আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। সেটা নিরসন করতে একবার এই মীরার বাড়িতে যাওয়া দরকার।" তো সেখানে যাওয়া হল। দরজা বাইরে থেকে তালা মারা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর পাড়ার লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও কিছু জানা গেল না। গতকাল বিকেলের পর থেকে কেউ এই পাড়ার বাসিন্দাদের বাড়ির বাইরে বেরোতে দেখেনি। অবশ্য গভীর রাতে চলে গিয়ে থাকলে বলা মুশকিল। শেষপর্যন্ত পুলিশ অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে দরজা ভাঙ্গাই স্থির করলাম।

দরজা ভাঙার পর ভিতরের দৃশ্য দেখে কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে যেতে হল। বাড়ির ডাইনিংয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন মীরার বাবা-মা, তাঁদেরও ঠিক একইরকমভাবে মৃত্যু হয়েছে। আর মীরার কোনো পাত্তা নেই। কোনো মার্ডার ওয়েপনও পাওয়া গেল না যথারীতি। আমার সন্দেহের ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। মীরার সঙ্গে এসবের একটা যোগ আছে, গভীর যোগ। আমি পুলিশ অফিসারকে বললাম আমার কিছু প্রস্তুতি দরকার। হয়ত ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছি, আমাকে আস্তানায় পৌঁছে দিতে বললাম। সেখানে পৌঁছে অফিসারকে বসতে বললাম। তাঁর কৌতূহলের উত্তরে তাঁকে বললাম, "পুরোটা বলার সময় নেই, শুধু এটুকু জেনে রাখুন, আমরা মীরাকেই খুঁজছি। ওর মাধ্যমে এক ভয়ংকর অপশক্তি তার কার্যসিদ্ধি করছে। ওর আত্মা আবদ্ধ, আমরা তাকে মুক্ত করব মাত্র।" আমার সাথে আনা মন্ত্রঃপূত খঞ্জরজোড়া বার করলাম। খুব সুন্দর, প্রাচীন এই খঞ্জরদুটি। অবিকল একরকম দেখতে। হাতির দাঁতের হাতল, আর চকচকে ফলায় প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপিতে খোদাই করা কিছু চিহ্ন। বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি এই খঞ্জরগুলি প্রায় সমস্ত অপশক্তিকে বিনাশ করতে সক্ষম। বেশ খানিকটা জেরুজালেমের পবিত্র তেল ও বালির মিশ্রণও নিলাম। এটা যেকোনো অপশক্তির গতি প্রতিহত করতে সক্ষম। আমার পদ্ধতি দেশি ও বিদেশি মেশানো। আসলে সুপারন্যাচারাল এনটিটি সব নির্দিষ্ট। বিভিন্ন দেশে এদের আলাদা আলাদা নাম মাত্র। এদের প্রতিহত করার বিভিন্ন উপায়গুলি, যা বিভিন্ন শাস্ত্রে বর্ণিত, তার কিছু খুবই কার্যকর, কিছু আবার অপ্রয়োজনীয়। অদরকারী অংশগুলো কাটছাঁট করে প্রয়োজনীয় অংশগুলো কাজে লাগানোই আমার মত বিশেষজ্ঞদের কাজ। এই পর্যন্ত বলে থামলেন দুর্জয়বাবু।

"থামলেন কেন, বলুন!" আমি উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলাম। হ্যাঁ এই যে বলি। একটু সময় দাও বাপু! এই বলে গরম গরম তেলেভাজায় এক কামড় দিয়ে আবার শুরু করলেন ভদ্রলোক।

আমাদের প্ল্যানটা খুব সিম্পল। যেসব জায়গায় এই অদ্ভুত জীব তার শিকার ধরে, সেগুলোকে মার্ক করা হয়েছে ইতিমধ্যে। ওকে হাতেনাতে ধরতে গেলে আমাদের ওর চলাফেরা সীমাবদ্ধ করতে হবে। তাই পরদিন সকালে সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে গিয়ে আমরা জেরুজালেমের পবিত্র মিশ্রণ এবং আরো কিছু জিনিস ব্যবহার করে মন্ত্রঃপূত গন্ডী কেটে দিয়ে এলাম। শহর থেকে বেরোবার সম্ভাব্য সবকটা পথে একইরকম ব্যবস্থা করা হল। ওই অপশক্তি এইসমস্ত জায়গা বা পথের কোথাও যেতে পারবে না। কেবল একটি অকুস্থল আমরা বাদ রাখলাম। ওখানে মানুষজনের যাতায়াত বন্ধ করার ব্যবস্থা হল। সেদিন রাত্রে আমি আর সেই পুলিশ অফিসার তৈরি হয়ে দুজনে দুটি খঞ্জর ও আরো আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে এই কিল জোনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমাদের লক্ষ্য ওই অপশক্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। সে আমাদের চাইতে অনেক শক্তিশালী, তবে সে কিছু নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। জানিনা আমরা তাকে হারাতে পারব নাকি নিজেরাই তার কাছে পরাজিত হব, কিন্তু শেষপর্যন্ত লড়ে যেতে পারব এ বিশ্বাস আমাদের আছে।

অফিসারকে চেনে সে। কারণ মীরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে উনি গিয়েছিলেন। তাই টোপ হওয়ার ভারটা আমার উপরেই পড়েছে। আমিও তাই বড়লোকের বখাটে ছেলে সেজে এসেছি আজ। কারণ তারাই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক শিকার এই অপশক্তির। বাইকটা একটা গাছের আড়ালে পার্ক করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিষ দিতে দিতে এগিয়ে চললাম, একদম রাস্তার মাঝখান দিয়ে। চারদিক নিস্তব্ধ, আলো জ্বলছে বটে, কিন্তু তার তেমন জোর নেই। তখনকার ব্যাঙ্গালোর শহর আর এখনকার শহরটার মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। এখনকার শহর অনেক উন্নত। তখন শহরটা বড় হলেও বেশ কিছু অংশ ছিল সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। আর এই অঞ্চলটা তো শহরের একদম সীমানায়। হঠাৎ একটা মোড় ঘুরতেই একটা অন্যরকম অনুভূতি এল। এ অনুভূতি আমার চেনা। তবে কি সে উপস্থিত হল? পকেটে রাখা খঞ্জরটা শক্ত করে চেপে ধরলাম। হঠাৎ সামনের লাইটপোস্টের আলোটা কয়েকবার দপদপ করে উঠল। তারপরই রাস্তার পাশের অন্ধকার থেকে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো, হ্যাঁ কোনো ভুল নেই, মীরাই বটে! আমি তার কেবল ছবি দেখেছি। এখন বুঝতে পারলাম সে ছবির চেয়ে আরো অনেকগুণ বেশি সুন্দরী। কিন্তু তার চোখদুটো যেন জ্বলছে, রাগ, ঘৃণা, বিতৃষ্ণা মেশানো অমন ভয়াল চোখের দৃষ্টি কোনো মানুষের নয়, হতেই পারে না। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় আমাকে আবার সতর্ক করল। জ্যাকেটের উপরের বোতামটা ঘোরালাম দুবার। এটা আসলে একটা ট্রান্সমিটার। কিছুটা দূরে অপেক্ষা করা পুলিশ অফিসারের কাছে আমার সংকেত চলে গেছে। তিনি একটু বাদেই ছুটে আসবেন এদিকে।

কিন্তু এখানে তখন আরেকটা ব্যাপার আরম্ভ হয়েছে। সেটা যেমন বীভৎস, তেমনই নারকীয়। মীরার চেহারা পাল্টে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। তার দেহের উপরের অংশে চামড়ার রং মিশকালো হয়ে যাচ্ছে, লোমে ভরে যাচ্ছে মুখ ও হাত, হাতের তালু বদলে যাচ্ছে থাবায়, আঙুলের ডগায় জেগে উঠছে ছুরির ফলার মত দীর্ঘ, ধারালো ও বাঁকানো নখ। রূপান্তর হয়ে যাবার পর জীবটা একটা প্রকান্ড গর্জন করে আমার দিকে ছুটে এলো। এদের কথা কেবল বইতে পড়েছি। কিন্তু এরকম জীবকে দেখলাম এই প্রথম। সেই নারকীয় গর্জন শুনে একটু বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। তাই খঞ্জরটা বার করতে একটু দেরি হয়ে গেল। তাই ও যখন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, খঞ্জরটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে রাস্তায়, আর আমি চিৎ হয়ে পড়লাম। আমার বুকের উপর দুটো থাবা রেখে আমার উপর ঝুঁকে আছে জন্তুটা, আমি নড়তে চড়তে পারছি না, ওর মুখ থেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ আমার নাকে ঢুকে আমার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। একটা থাবা মারলেই আমি শেষ। সেই অবস্থাতেই কেবল মনের জোরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে জেরুজালেমের পবিত্র মিশ্রণের একটা শিশি বার করে আনলাম। সেটা ওর গায়ে প্রচন্ড শক্তিতে আছড়ে ভাঙতেই ও সম্পূর্ণ স্থির হয়ে গেল, প্রায় প্রস্তরীভূত অবস্থা। কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষণ থাকবে না, ওর কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। তার আগেই খঞ্জরটা পেতে হবে আমাকে। ওঠার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনো ফল হল না। ওর শরীরটা আমার উপর চেপে বসে আছে। দুহাত দিয়ে কোনোমতে ওটাকে একটু ঠেলে সরিয়ে উঠে বসলাম। কিন্তু খঞ্জরটা তোলার আগেই আমার বন্ধু পুলিশ অফিসারটি এসে পৌঁছল সেখানে। সে দৌড়ে এসে তার খঞ্জরটি আমূল বিঁধিয়ে দিল ওই শয়তানের হৃৎপিণ্ডে। ওর দেহটা মোচড় খেতে শুরু করল। আমরা বিস্ময়ের সাথে দেখলাম, ওর চেহারা বদলে প্রথমে মীরার মত হয়ে গেল, তারপর সে চেহারাও রইল না। সেটা যেন প্রবল কেন্দ্রাভিমুখী আকর্ষণ বলের প্রভাবে ভিতরের দিকে ঢুকে যেতে থাকল, দুমড়ে-মুচড়ে ছোট হয়ে যেতে থাকল। শেষে একটা লেজমোটা রোমশ কালো বেড়ালে পরিণত হল। তারপর সব থেমে গেল। আমরা খঞ্জরদুটো সংগ্রহ করে, বেড়ালটাকে বিধি মেনে দাহ করলাম। তারপর আমার হোটেলে ফিরে এলাম। অফিসারও সঙ্গে এল।

একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে অফিসারকে ব্যাপারটা বোঝাতে বসলাম। সে যথারীতি খুবই আগ্রহী ছিল। তাকে যা বলেছিলাম, সেগুলোই তোমাদের বলছি। মীরা কোনো সাধারণ মানবী ছিল না। সে ছিল একজন 'ক্যাট উওম্যান' বা 'মার্জার মানবী'। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় এদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা খুব রেয়ার অপদেবতার প্রজাতি। "এ ক্যাট হ্যাজ নাইন লাইভস।" অর্থাৎ একটি বেড়ালের নয়টি জীবন। প্রবাদটি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। একটি আত্মা যখন বেড়াল হয়ে জন্মায়, তখন তাকে পরপর নয়টি জন্ম বেড়াল হয়ে অতিবাহিত করতে হয়। পুরাকালে মিশরীয় বিড়াল দেবী বাস্টেটের রূপে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং শয়তান তাঁকে বিবাহ করতে চান। কিন্তু দেবী রাজি হননি। তখন শয়তান তাঁকে অভিশাপ দেন, পৃথিবীতে বেড়ালদের মাধ্যমেও তিনি তাঁর ক্ষমতা বিস্তার করবেন। তাঁর সাথে বাস্টেটের একটি চুক্তি হয়। যার ফলে সকল বেড়াল শয়তানের অনুচর নয়, কিন্তু কোনো বিড়ালী তার অষ্টম জন্মে যদি বিশেষ তিথি নক্ষত্রযোগে অপঘাতে মারা যায়, তাহলে তার আত্মাকে শয়তান দাবী করেন। তাকে তখন তার নবম জন্মে বিড়াল হবার বদলে এইরকম মার্জার মানবী হয়ে জন্মাতে হয়। এরা দেখতে অসাধারণ সুন্দরী হয়, কিন্তু স্বভাবে পুরুষবিদ্বেষী। এমনিতে এরা সাধারণ মানুষের মতই। তবে শয়তানী শক্তি ওঁত পেতে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এদের আশেপাশে। এদের জীবদ্দশায় যদি কোনোভাবে এরা মানুষের রক্তের স্বাদ পায়, তবে এরা নরখাদক হয়ে ওঠে। সেদিন সামান্য একটু রক্ত মুখে যাওয়াতে মীরার মধ্যে নরখাদক জেগে ওঠে। সে প্রথম নিজের মধ্যে ওই পরিবর্তন অনুভব করতে থাকে। তার শরীর খারাপ হয়। আমার বিশ্বাস সে নিজেই রিয়াকে সাথে করে টয়লেটে নিয়ে গিয়েছিল। তার সহজাত প্রবৃত্তির বশে। তারপরের ঘটনা অনুমান করা শক্ত নয়। রিয়াকে মেরে ফেলে সে ভয় পেয়ে যায়। বাথরুমের আয়নায় সে নিজের বীভৎস রূপ দেখেছিল। ভয়ে সে আসল ঘটনা কিছুটা রং ছড়িয়ে পুলিশকে বলে, নিজেকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে।

"কিন্তু সান্যালবাবু, একটা কথা", গৌরব প্রশ্ন করল, "আপনি যে বললেন ও ক্যাট উওম্যান, তাহলে ওর দেহের উপরের অংশটা চিতার মত কেন?" উত্তরে হা হা করে হেসে সান্যাল বললেন, অফিসারও এই একই প্রশ্ন করেছিল। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, 'বিগ ক্যাট ফ্যামিলি' বোঝো তো? বাঘ, চিতাবাঘ, প্যান্থার, এরা সবাই এই ফ্যামিলির অন্তর্গত। এরা বেড়ালের জাতভাই ছাড়া আর কিছু নয়। তাই ওই নাম।

তারপর শোনো, ওকে এরপর নরমাংসলোভ আর রক্তলোলুপতা পেয়ে বসল। শিকার হিসাবে ও বেছে নিল লোফার গোছের ছেলেদের, কারণ রাতে তারাই সহজলভ্য শিকার, আর পুরুষজাতির প্রতি ওর স্বাভাবিক বিদ্বেষও ছিল এর আরেকটা কারণ। নিজের বাবা মাকে হয়ত ও মারত না, তবে আমার অনুমান, ওঁরা ওর আসল স্বরূপ জেনে ফেলেছিলেন, তারপর ওকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। হয়ত ধরিয়ে দিতেও চেয়েছিলেন। তাই ওঁদের মেরে সে ফেরার হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমাদের ফাঁদে পা দেয়, কারণ ও শিকারের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। এদের মৃত্যুতেই এদের অভিশাপের সমাপ্তি। তবে এদের স্বাভাবিকভাবে মারা যায় না, বিশেষ কিছু মন্ত্রঃপূত অস্ত্র ছাড়া। ভাগ্যক্রমে এদের সংখ্যা খুব সীমিত। একটি দেশ ও কালে একটির বেশি এরকম শয়তান জন্মায় না। আবার কয়েকশো বছর পরে হয়ত এরকম এক জীবের জন্ম হবে, আর তাকে বিনাশ করবে কোনো শুভশক্তির সৈনিক। আসলে অশুভের ক্ষমতা প্রচুর, কিন্তু ঈশ্বরের সৃষ্ট দুনিয়ায় স্বয়ং অশুভ প্রভু শয়তানও কিছু অমোঘ নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা। সেগুলো লঙ্ঘন করার শক্তি কারোর নেই। আলোর পাশে চিরকালই অন্ধকারের উপস্থিতি। কিন্তু সবশেষে আলোরই জয় হয়।

সান্যালবাবুর বলা শেষ হতে কাছাকাছি কোনো একটি বাড়িতে বিড়াল ডেকে উঠল, যেন তাঁর কথায় সম্মতি জানিয়েই। ও যেন বলছে, সব বেড়াল খারাপ হয় না। আমরা সবাই প্রথমে একটু চমকে গিয়েছিলাম। তারপর হো হো করে হেসে উঠলাম।

।। সমাপ্ত।।

( এই গল্পে উল্লিখিত অপদেবী সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তবে প্রাচীন মিশরে বাস্টেট বা বিড়াল দেবী সত্যিই পূজিতা হতেন। তাঁর ও শয়তানের গল্পটি লেখকের কল্পিত। )













website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments