গ্রাস Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#গল্প - গ্রাস
ছেলেটাকে অনেক ক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছেন মৈত্রবাবু। শ্যামলা, রোগা, চোখদুটো টানা টানা। বছর দশেক বয়স হবে। ওঁর নাতি দীপ্তর থেকে একটু বড়ই হবে। জুলজুল চোখে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে আছে। দীপ্তর হাতে একটা চিপ্সের প্যাকেট। দীপ্ত সেটা থেকে দু একটা মুখে পুরছে আর একটু পরে পরে দাদুকে বিরক্ত করছে - দাদু, সাগরে আমি কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত যাব। মৈত্র বাবুর মুখে হাসি। তিনি ঐ ছেলেটার দিকে খেয়াল রেখেছেন - বোধ হয় চিপসের লোভে দীপ্তর দিকে তাকিয়ে আছে। আবার দুমিনিট পরে দীপ্ত বলে দাদু আন্দামানে আমরা স্নরকেলিং করেছিলাম, এখানে করব? এবারে দীপ্তর মা বকে ওঠেন - দাদুকে এত বিরক্ত করছ কেন দীপ? চুপ করে বোসো না! এই বলে মৈত্রবাবুর দিকে তাকাতে গিয়ে নজর পড়ে ছেলেটার দিকে - কেমন অদ্ভুত চোখে দেখছে দীপ্তকে! অ্যাই, কি রে? কি দেখছিস হাঁ করে? চিপস খাবি? ছেলেটা হাসি হাসি মুখে মাথা নাড়াতে সোহিনী ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করে ছেলেটার হাতে দেন। ছিলেটা হাতে নিয়েও দীপ্তর দিকেই তাকিয়ে থাকে। এবার দীপ্ত বলে - তোর নাম কি রে?
- রাখাল দাস
- কোথায় থাকিস?
- এই দিকেই গাঁয়ে থাকি
- সাগরে যাচ্ছিস কেন?
- এমনিই
- ওখানে কেউ আছে?
- না
- তবে থাকবি কোথায়?
- তোমরা যেখানে উঠবে ওখানেই কোথাও থেকে যাব।
- আমরা পি এইচ ই ডি বাংলোতে উঠব। তুই ওখানে কি করে উঠবি? তোকে উঠতেই দেবে না।
- আমাকে ফরমাশ খাটার জন্য দুদিন রাখো না। সব কাজ করে দেব। খোকা বাবুটাকে সমুদ্রে বেড়াতে নিয়ে যাব। আমার বড় টাকার দরকার গো।( এ কথাটা সোহিনীকে লক্ষ্য করে বলা।)
সোহিনী বেশ খুশি - কত নিবি?
- রোজের একশ টাকা দিও আর খাওয়া। তোমাদের রুমের বারান্দায় শুয়ে থাকব।
মৈত্র বাবু বলে ওঠেন - রেখে নাও বৌমা, ফুট ফরমাশ খাটবে, দীপ্তর সাথে খেলবে।
কথা পাকা হতে রাখাল গিয়ে বাসের মেঝেতে বসে চিপস খেতে লাগল।
- রাখাল, এই রাখাল, আমাকে অনেক দূরে দূরে ঘোরাতে নিয়ে যাবি তো?
রাখাল ঘাড় নাড়ে।
- আমি কিন্তু সারাদিন সমুদ্রে খেলব। ও মা, তুমি বাবাকে বলে দাও না, আমায় যেন না বকে।
দীপ্তর বাবা সৃজন বাসে বসেও এক মনে মোবাইলে গান শুনে যাচ্ছেন। দীপ্ত সিট থেকে উঠে গিয়ে বাবাকে ঠেলতে থাকে - বাবা, ও বাবা !! আমি সারাদিন মাছের মতো সমুদ্রে সুইমিং করব। তুমি বকবে না।
সৃজন কিছু না বুঝেই মাথা নাড়াল। আবার ঠেলাঠেলি - ও বাবা, আমি স্নরকেলিং করব, আমি মাছেদের দেশে যাব।
- উফ্ দীপ, ডোন্ট বিহেভ লাইক আ সিলি বয়।
বকা খেয়ে দীপ্ত চুপ করে যায়। রাখাল হাসিমুখে ওর কাছে এসে ওর পিঠে হাত দিয়ে ওকে বলে - আমি তোকে নিয়ে যাব রে।
মৈত্রবাবু বলেন - সাগর পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগবে রে রাখাল?
- এই তো বাবু এসে পড়েছি।
বাস থামতেই হই হই করে রাখাল ওঁদের জিনিষ পত্র নামিয়ে দুটো রিকশা ডেকে আনল। দরদাম করে ওদের চারজনকে মাল সমেত রিকশায় চড়িয়ে সে হেঁটে পিছনে আসতে লাগল।
মৈত্রবাবু মনে মনে বেশ খুশি। যাত্রাটা ভালই বলতে হবে। সকালে কলকাতা থেকে বাসে চড়ে হারউড পয়েন্ট ৮ নম্বর লঞ্চ ঘাটে। সেখান থেকে ফেরি ভেসেলে গঙ্গা পেরিয়ে কচুবেড়িয়া। সেখান থেকে বাসে চড়ে আসতে আসতে এই বুড়ো হাড়ে আর সইছে না। ভাগ্যিস রাখালটাকে পাওয়া গেছিল। ওঁরা এসে পৌঁছলেন বাংলোতে। আগে থেকেই দুটো ঘর বুক করা ছিল। একটাতে সৃজন, সোহিনী আর দীপ্ত, অন্যটাতে মৈত্রবাবু। রাখাল বাইরে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু মৈত্র বাবু ওকে নিজের ঘরের মেঝেতে বিছানা করে নিতে বললেন। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর একটু ঘুম, তার পর বীচে ঘোরাফেরা। এখানে সমুদ্র ঢেউ ভাঙে না। তির তির করে এগিয়ে এসে পা ভিজিয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাও সমুদ্রের ভিতরে। পায়ের পাতা ভেজানো জল থেকে হাঁটু জলে। দীপ্ত খুশিতে লাফাচ্ছে, রাখাল সাথে আছে বলে ওঁরাও নিশ্চিন্ত । এই আনন্দটুকু পাবার জন্যই তো মেলা ছাড়া অন্য সময়ে আসা। নির্জন সাগরের বেলাভূমি, কপিল মুনির মন্দির - এ সব যদি উপভোগ করতে হয় তো পৌষ সংক্রান্তির মেলায় না এসে অন্য সময়েই আসা ভাল। সন্ধ্যাবেলা মন্দিরের আরতির ঘন্টাধ্বনি পরিবেশটাকে খুব সুন্দর করে তুলেছে। কিন্তু দীপ্ত কে বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসিয়ে রাখা মুশকিল। সে রাখালের সাথে হুড়োহুড়ি করে খেলতেই ব্যস্ত।
পরদিন সবাই মিলে সমুদ্রে স্নান করতে যাওয়া। কোমর জলে ওরা খেলছে। ঢেউ তেমন নেই। সমুদ্রতটে অবাধে খেলে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়া। কাউকে আসতে দেখলেই সেঁধিয়ে যাচ্ছে গর্তে। দূরে, দিগন্তরেখায়, একটা, দু’টো, তিনটে….অনেক অনেক নৌকা, নাকি ট্রলার। মাছ ধরতে গেছে গভীর সমুদ্রে।
এর পর ভ্যানরিকশায় চেপে বেরিয়ে পড়া গেল দ্বীপ দর্শনে। মঠ–মন্দির-আশ্রম মিলিয়ে এই সাগরসঙ্গম। গঙ্গা এখানে সাগরে এসে মিশেছে। দাদুর মুখে সগর রাজার ষাট হাজার ছেলের কথা শুনে দীপ্ত হেসেই অস্থির। রাখালও মুচকি মুচকি হাসছে।
দুপুর বেলা জমিয়ে খাওয়া দাওয়া - সামুদ্রিক মাছ, মোচার ঘন্ট, ভাজা ভুজি মিলিয়ে রসনা একেবারে তৃপ্ত। বিকেলে ভ্যান রিকশায় চেপে আরেকটু ঘোরাঘুরি, আর সাগরের জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে ছুটোছুটি খেলা।
খেলতে খেলতে দীপ্ত গভীর জলের দিকে চলে যাচ্ছে। রাখাল ওর পিছনে ছুটে গিয়ে ওকে ধরেছে। পিছনে পিছনে সৃজন আর সোহিনী হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসেছে। সোহিনী দীপ্তকে ধরে জোরে নাড়িয়ে দেয় - তুমি এত দুষ্টু হয়েছ, কথা শোনো না? আর কখনো বেড়াতে আনবো না।
- আমিও তোমাদের সাথে আর কখনও আসবো না। এই সাগরে মাছ হয়ে জলে খেলা করব। তোমরা আমাকে খুঁজেই পাবে না।
- থাক তবে, এই সাগরেই থাক, আর কলকাতা যেতে হবে না।
সৃজন সোহিনীর পিঠে হাত রাখে - কী বলছ তুমি? রাগের মাথায় তুমি ছেলেকে যা খুশি তাই বলবে?
সোহিনী কেমন ভ্যাবলার মতো তাকায় - মা হয়ে সে ছেলেকে কি বলল?
রাখাল গিয়ে দীপ্তর হাত ধরে - খোকাবাবু চলো, সাঁঝ হচ্ছে।
সবাই সাবধানে ফিরে আসে। মৈত্রবাবুকে দীপ্ত কেঁদে কেঁদে সব কথা জানায়। তিনি জিভ কেটে বলেন - ছিছি বৌমা, মা হয়ে তুমি এমন কথা বললে কি করে?
যাই হোক, রাখালের তৎপরতায় এই মন খারাপী মেঘ কেটে গিয়ে আবার সবাই হাসি আনন্দ খাওয়া দাওয়ায় মেতে ওঠে। তৃতীয় দিন সবাই মিলে ঘুরে আসা হল মনসাদ্বীপে রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমে আর লাইটহাউস। তার পর আবার সাগর কিনারায়। তবে ভিন্ন পথে। যে পথ সেচবাংলো থেকে সমুদ্রে গেছে সেই পথে। এই পথে ঝাউয়ের জঙ্গল - সে সৌন্দর্য সবাই উপভোগ করে। আজ আবার দীপ্ত খেলায় মেতেছে; তবে আজ ওরা সবাই একসাথে আছে। খুব ছোটাছুটি খেলা চলছে কোমর জলে। কেউ খেয়াল করেনি কখন ঝড়ের মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে। খেয়াল হল যখন, তখন বিশাল একটা ঢেউ এসে ওদের উপর আছড়ে পড়েছে। ওরা সবাই বেসামাল , দীপ্ত বাবার হাত থেকে ছাড়া হয়ে জলের তোড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।
- রাখাল ওকে বাঁচা!!! চেঁচিয়ে ওঠেন মৈত্র বাবু।
রাখাল ঘুরে দাঁড়ায়। ওর চোখে কেমন অদ্ভুত আলো, মুখে নিষ্ঠুর হাসি।
- আমি কি ওর রক্ষাকর্তা? মা হয়ে সাগরের কাছে নিজের ছেলেকে দিয়ে দিল, তাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে কি করে দাদা ঠাকুর?
- তুই কি বলছিস রাখাল? ওর মা কি জেনেশুনে বলেছে? আরে ও তো মুখের কথা! তা বলে তুই ওকে বাঁচাবি না?
- আমাকে ভুলে গেলে মৈত্র মশায়? আমার মাও ভুল করে আমাকে সাগরে দেবে বলেছিল। সেদিন ঝড়ের মুখে তুমি মাঝি মাল্লাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলে একটা শিশুকে জলে ফেলাওনি?
- কি সব বকছিস? ওকে বাঁচা, তুই যা চাস, তোকে দেব। পায়ে পড়ি রাখাল!
- আমার বিধবা মায়ের কান্না ভুলে গেলে ঠাকুর? আর তুমি? চেষ্টা করলে জল থেকে আমাকে বাঁচাতে পারতে না? তা নয় নিজে ঝাঁপিয়ে পড়লে? সেদিন কি আমি ডুবে যেতেই সব সমস্যা মিটে গেছিল? রবি ঠাকুরের কলম কেঁপে গেছিল আমার বিধবা মা আর মাসীর কথা লিখতে। তাই তিনি আর লিখতে পারেননি। তারাও, ঠাকুর তারাও আত্মহত্যা করেছিল।
এ জন্মেও তুমি মৈত্র মশায়। তাই তো শোধ নেবার জন্য আমার অতৃপ্ত আত্মা তোমাদের পিছু নিয়েছিল। এ ঝড় তুফান সব আমার তৈরী।
- রাখাল আমার নাতিটাকে বাঁচা, আমাকে মেরে ফেল।
- না ঠাকুর, নাতি বিনা শূন্য ঘর কেমন লাগে তা তুমি দেখো। রাখালের হাসি সমুদ্রের গর্জনকে ছাড়িয়ে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
না, পারলো না। সৃজন হাজার চেষ্টা করেও দীপ্তকে বাঁচাতে পারলো না। ঢেউয়ের তোড়ে তীরে এসে আছড়ে পড়ল একে একে সৃজন, সোহিনী আর মৈত্রবাবুর অজ্ঞান দেহগুলো। দীপ্ত আর রাখালের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। ঝড় থামল। সূর্য তখন পশ্চিম গগনে রক্ত বমি করছে।
সমাপ্ত
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments