অতৃপ্তি Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#গল্প।
অতৃপ্তি।
--------
বাবারে বাবা!তোরা আর আলোচনার বিষয় পেলি না?এতো বছর বাদে আমাদের দেখা।কোথায় নিজেদের কথা বলবি!ছেলেমেয়েদের কথা বলবি!পুরোনো স্কুলের দিনগুলোর কথা ভাববি!তা না ভূত, প্রেত, প্ল্যানচেট,জন্মান্তর----যত্তসব বাজে কথা।আমার এইসব ভালো লাগে না মোটেও।''
খুব বিরক্ত হয়ে বলল মৌ।আজ প্রায় আঠাশ বছর বাদে পাঠমন্দির স্কুলের কুড়িজন বন্ধু মিলে মিলিত হয়েছে মধ্য কলকাতার পুরোনো চক্রবর্ত্তী বাড়ীতে।চন্দনা চক্রবর্ত্তী মৌ দের বন্ধু।মৌ ই উদ্যোগ নিয়ে ফেসবুকের দৌলতে সব পুরোনো বন্ধুদের আবার একজায়গায় করতে পেরেছে।এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে?তাই সবাই মিলে একটা গেট টুগেদারের পরিকল্পনা করেছে মৌ।কালী পূজোর দিন অনেকের অনেক রকম প্রোগ্রাম। কারো-কারো আবার বাড়ীতে পূজো তাই কালীপূজোর আগের দিন গেট টুগেদারের দিন স্থির হল।পাঠমন্দিরের ঊননব্বইয়ের ব্যাচের কুড়িজন কিচির-মিচির করতে-করতে এসে পৌঁছাল চন্দনাদের পুরোনো খিলেনওয়ালা ঢাউস বাড়ীটায়।
আজ সব বাড়ীতেই মোটামুটি চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো,চোদ্দ শাক,বাড়ী ঘর সাজানোর পর্ব।চন্দু মানে চন্দনা হাসতে-হাসতে বলল-
''ভূত তাড়াব কি!উল্টে আরও কুড়িটা ভূত এসে জড়ো হয়েছে আমার বাড়ীতে।হা! হা! হা! হা!''
চন্দু বরাবরই প্রাণখোলা হাসিখুশি।আজ ওর বাড়ীতে বিরাট খাওয়া-দাওয়া আড্ডার ব্যবস্থা।
''আমি তো ভেবেছিলাম আমরা সব হারিয়েই গেছি।আবার যে আমাদের দেখা হবে সত্যি ভাবিনি রে।কি যে আনন্দ হচ্ছে!''
মেখলা বলল।আজ সকলে আসতে পারেনি।আসতে পারলে আরও দশজন মত হয়ে যেত।কয়েকজন বন্ধু বিদেশে।কয়েকজনকে ধরা যায়নি ফোনে।এইসব নানারকম অসুবিধা আর কি।তবু যে এই মিট টা হয়েছে এইটাই একটা বিরাট ব্যাপার।
চন্দনাদের পুরোনো আগেকার রাজবাড়ী,বড় পাথরের চওড়া সিঁড়ি,দোতলায় নাচঘর,বিরাট বারান্দা,বড় বড় স্ট্যাচু,সামনে বাগান,পাশে পুকুর।তার ধারে বিরাট শিব আর কালীর মন্দির।লাগোয়া বিরাট ঠাকুর দালান।গাছগাছালি ভরা বাগান পেরিয়ে মন্দির সংলগ্ন দালানে যেতে হয়।বেশ একটা গা ছমছমে ব্যাপার।চন্দনার বাবা নেই।মা একলা মানুষ।তাই চন্দনা আর ওর বর চন্দন এই বাড়ীতেই থাকে।মেয়ে বাইরে পড়াশোনা করছে।ছুটি-ছাটায় আসে।তাই চন্দনা চায় ওর কাছে সবাই আসুক-বসুক আনন্দ করুক।তাতে ওর ভালো লাগবে।সময় কেটে যাবে।
আজ চন্দনাদের বাড়ী মেখলা,মিঠু,সুতপা,চন্দ্রিমা,সুভদ্রা,
সুরঞ্জনা,রূপা,জয়তী,পারমিতা সকলেই এসেছে।হঠাৎ করে ভূতের কথা শুরু করল জয়তী।
''বাবা চন্দু তোর বাড়ীটা কেমন গা ছমছমে ভূতের বাড়ীর মত।কেমন ভয়-ভয় লাগছে।এত বড় বাড়ীটায় একা একা থাকিস কি করে রে?''
চন্দনা বলল-
''আমি অতো ভয় পাই না। আমাদের বাড়ীতে এককালে প্ল্যানচেট হত জানিস তো?কত বড়-বড় লোকেরা এখানে প্ল্যানচেটে এসেছে।সে সব গল্প আমি আমার ঠাকুমার কাছে শুনেছি।কোন-কোন আত্মা এখানে আসতে চায়,কারা আবার জন্মাতে চায়,আত্মারা সেসব কথা খাতার পাতায় লিখে দিত।যেকোনো আত্মা খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসত আমাদের বাড়ী।এখনও মনে হয় ডাকলেই আসবে।তাই যারা মারা গেছে তাদের কথা বেশী ভাবা বা আলোচনা করা আমাদের বারণ।বিশেষ করে অমাবস্যাতে।''
আগামীকাল অমাবস্যা।চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার।পুরোনো রীতি মেনে চন্দনাদের ঠাকুরদালানে ঝাড়লন্ঠনে জ্বলছে মোমের আলো।ইলেকট্রিক নেই দালানে।হেমন্তের শুরুতে বেশ একটা শির শিরে শীত-শীত ভাব।জয়তী এইসব শুনে বেশ ভয় পেয়ে গেল।বলে উঠল-
''ওরে বাবা!এতদিন বাদে ডেকে আমাদের পেছনে কি ভূত লেলিয়ে দিবি নাকি রে চন্দু?''
আবার এক দফা হাসাহাসি।সুতপা বলল-
''ধুর ভয় পাবার কি আছে?ওসব ভূত-টূত কিস্যু নেই।সব মনের ভুল।আমি মোটেও ওসবে ভয় পাই না।আমাকে যেখানে যেতে বলবি সেখানেই চলে যাব।সব ভূতের ডেরায়।''
কেউ কিছু বলার আগেই বাগানের ভেতর থেকে একটা পেঁচা বিকট স্বরে ডেকে উঠল।পেঁচার ডাকটা শুনে সকলের বুকের ভেতর টা কেমন জানি ধড় ফড় করে উঠল।এই ভূত-ভূত করতে-করতে হিমেল ঠান্ডা হাওয়া,ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর ভয়ঙ্কর কালীমূর্তির আলো-আঁধারী আবছায়া কেমন যেন সত্যি-সত্যি একটা ভুতুড়ে বাতাবরণ তৈরী করে ফেলল।একটু পরেই ভূত চতুর্দ্দশীর হোম আরতি সব শুরু হবে।দালানের চারদিকে প্রদীপ জ্বলছে।মাঝে-মাঝে হাওয়াতে এক- একটা প্রদীপ নিভে যাচ্ছে।আবার জ্বালাতে হচ্ছে ।বহুদিনের পুরোনো পূজারী ভটচাজ মশাই চন্দনাকে বললেন-
''আমি ব্যাপার ভাল বুঝছি না গো।বার-বার পূজোর প্রদীপ নিভে যাওয়া তো ভাল কথা নয়।এমন তো কখনও হয় না।তাহলে কি মা রুষ্ট হয়েছেন?''
''আপনি ভাল করে মন্ত্রোচ্চারণ করে পূজো আর হোমটা করুন ভটচাজ কাকা।মা কখনও কারো অমঙ্গল করবেন না।মঙ্গলই করবেন।''
একথা বললেও চন্দনার মনটা কেমন খচ্ খচ্ করতে লাগল।হঠাৎ সুতপা বলল-
''আচ্ছা তোদের মধুশ্রীকে মনে আছে?''
''কোন মধুশ্রী?মধুশ্রী মান্না?''
মৌ বলল।
সুতপা বলল-
''হ্যাঁ। খুব ভাল মেয়ে ছিল।যেমন ব্যবহার তেমন গুণ।ভাল গান গাইত ছবি আঁকত।পড়াশোনাতেও খুব ভাল ছিল।আমাকে টপকে প্রতিবার অঙ্কে হায়েস্ট পেত।আমি বাংলাতে বেশী পেতাম বলে ফার্স্ট টা হতে পারতাম।মধুশ্রীর বাড়ীর পাশেই থাকত সুজাতা।ওরা রোজ একসাথে স্কুলে আসত।আর ঐ সুজাতাকে নিয়ে রোজদিন মধুর সাথে আমার মান-অভিমান হতো।মনে আছে তোদের?''
মনে থাকবে না আবার?সকলের প্রিয় মধুশ্রী।সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে নিল।সবার সাথে মিলে-মিশে থাকতো।বন্ধু অন্তপ্রাণ।বন্ধুদের জন্য করতে পারে না এমন কোনো কাজ ছিল না ওর কাছে।সুতপা বলে যেতে লাগল।
''মধুশ্রী গত বছরের মাঝামাঝি আমাকে একদিন ফোন করল।ফোন করে বলল আমার কিছু টাকার দরকার।আমি জিজ্ঞাসা করলাম- কত টাকা?মধুশ্রী বলল- পঞ্চাশ হাজার।বলল- তুই যদি একা না পারিস তো কয়েকজন মিলে জোগাড় করে দে না রে! আমার খুব দরকার।খুব বিপদে পড়েছি।আমার মনে পড়ল দিনের পর দিন ও আমাকে কত সাহায্য করেছে।আমার কত আঁকা লেখা ও দিন রাত এক করে-করে দিয়েছে আমি হাতের কাজ পারতাম না বলে,সেসবও করে দিয়েছে।আমার বাড়ীর অবস্থা ভাল ছিল না।ও দিনের পর দিন আমার জন্য টিফিন বানিয়ে নিয়ে গেছে।ভাবলাম সত্যিই ওর মত মেয়ে হবে না বিপদে পড়ে টাকা চাইছে।কিন্তু আমার বরের অঢেল টাকা থাকলেও আমার ইচ্ছেমত টাকা খরচ করার রাইট ছিল না।আমি জানতাম।কারো থেকে চাওয়ার দরকার নেই।আমি একাই এ টাকাটা দিতে পারব।কিন্তু আমি জানতাম আমার হাতে কিছুই নেই।তাই বললাম দেখছি রে।কিন্তু মধুকে আমি টাকা দিতে পারিনি।লোকের কাছে টাকা চাওয়াটা বড় বাজে স্বভাব এইসব ভেবে মনকে স্বান্ত্বনা দিয়েছিলাম।তারপর মধুশ্রী আর ফোন করলনা একদিনও।আমিও সংসারের গতানুগতিকতায় সব ভুলে গেলাম।তারপর তোরা যখন বললি কালী পূজোর আগের দিন তোরা মিট করবি তখন আমার মধুশ্রীর কথা মনে পড়ল।ভাবলাম ও টাকা চেয়েছিল আমরা সবাই মিলে যদি ওকে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।কিন্তু ঐ নম্বরে বহুবার ফোন করেও ওকে পেলাম না।''
জয়ী বলল-
''আমি শুনেছি ওর নাকি অনেক ধার দেনা হয়ে গেছিল।ওর বরের চিকিৎসা করাতে গিয়ে।ওর সামান্য একটা চাকরি।তাতে ছেলের পড়াশোনা, অসুস্থ বরের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ওর নাকি পথে বসার জোগাড় হয়েছিল।যদিও সবই শোনা কথা।আমি আরও শুনেছি মধুশ্রী----।''
ততক্ষণে মন্দিরে হোম শুরু হয়ে গেছে।হোমকুন্ডের লেলিহান শিখা কেঁপে-কেঁপে উঠছে।মা কালী আরক্ত নয়নে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যেন আমাদেরই দিকে।বাইরে গাছের পাতার খস্ খস্ শব্দ।ভটচাজ মশাইয়ের ওঁ হ্রীং মন্ত্রোচ্চারণে আর মধ্যে-মধ্যে ঘন্টাধ্বনিতে অমাবস্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে ভয়ঙ্কর কেউ যেন আমাদের সকলকে আড়াল থেকে দেখছে।এমনটাই মনে হতে লাগল।জয়ীর কথাটা শেষ হল না হোমকুন্ডের আগুনে নারকেল ভেঙ্গে জল ঢাললেন ভটচাজ মশাই।আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম।এইবার সংকল্প হবে।হঠাৎ তীব্র বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে লাগল।মঙ্গল প্রদীপ নিভে গেল।মা কালীর গলার মালা খুলে এসে পড়ল চন্দুর পায়ের কাছে।বলির খাঁড়া দেওয়ালের গা থেকে ঝন্ ঝন্ শব্দে আছড়ে পড়ল।পেঁচাটা আবার ডেকে উঠল বিকট স্বরে।
এদিকে সকলের খেয়াল হল,সকলে থাকলেও দালানে সুতপা নেই।সুতপা কোথায় গেল?এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করে দেখা গেল দালানের একেবারে কোণার দিকে পিছন ফিরে সুতপা বসে আছে।জয়ী ডাকল-
''এই সুতপা! সুতপা!এখানে বসে আছিস কেন?হোমের ফোঁটা নিবি না?সুতপা!একি সুতপার গা টা এরকম কনকনে বরফের মত ঠান্ডা কেন?''
জয়ী আর অন্যরা অনেকবার ডাকার পর সুতপার দেহটা বাদ দিয়ে মাথাটা পুরো পিছন দিকে ঘোরাল।সেই দৃশ্য দেখে বিকট চিৎকার করে জয়ী অজ্ঞান হয়ে পড়ল।সুতপার চোখদুটো লাল আগুনের মত জ্বলছে।মুখটা বীভৎস!পিশাচের মত! নাকি রাক্ষসী! নাকি ডাইনী!কে ওটা?তারপরই আর কেউ নেই।সকলে জয়ীর মুখে চোখে জল ছেটাতে লাগল।কিছুতেই জ্ঞান ফিরছে না।ঝাড়লন্ঠনটা অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে।পুকুরের জল তোলপাড় করছে।চন্দনাদের পুকুরের মাছ বছরে একবারই কালীপূজোর সময় ধরা হয়।তাই মাছের সংখ্যা বেড়েই চলে।মাছগুলোও সাঙ্ঘাতিক রকম দাপাদাপি করছে।এক অজানা অশুভ ইঙ্গিতে সকলের বুকের ভেতর শুকিয়ে গেল।
হঠাৎ সকলের চোখ পড়ল বাগানের আমগাছটার দিকে।ওকি কার দেহ ঝুলছে ওটা?প্রবলভাবে দুলছে এদিক-ওদিক। যেন গাছটা মাটি থেকে উপড়ে পড়ে যাবে।ভটচাজ মশাই তখন চিৎকার করে মন্ত্র জপ করছেন-
''ওঁ কালী তারা মহাবিদ্যা
ষোড়শী ভুবনেশ্বরী ভৈরবী
ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধূমাবতী----।''
ও কার দেহ? একবার মনে হচ্ছে মধুশ্রী,একবার মনে হচ্ছে সুতপার।গলায় ফাঁস লাগানো।চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে এলোচুল মুখের ওপর এসে পড়েছে।কিকরে যেন রাত কেটে গেল।সকলে কোন জগতে ছিল কারোর আর কিছু মনে নেই।ভোরের আলো ফুটতে কেউ আর গাছের ডালে কোনো দেহ দেখতে পেলনা।তবে সুতপাকেও আর খুঁজে পাওয়া গেল না।চিরতরে ও হারিয়ে গেল।
পরে শোনা গেছিল প্রচুর দেনার দায়ে মধুশ্রী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল।তাহলে কি ঐ ভূত চতুর্দ্দশীর রাতে মধুশ্রীর অতৃপ্ত আত্মাই নেমে এসেছিল চন্দনাদের বাড়ী?তাহলে কি আত্মার অস্তিত্ব আছে?এই প্রশ্ন আজও ঘুরে বেড়ায় ঐ পাঠ মন্দিরের ঊননব্বইয়ের ব্যাচের মেয়েদের মনে।
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments