এপ্রিল_ফুল Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
আজ সকাল থেকে বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। দুপুরে খানিক্ষনের জন্য থেমেছিলো ঠিকই কিন্তু তারপর থেকে একনাগাড়ে হয়ে হয়ে চলেছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর থেকে থেকে মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি। ছাতা মাথায় দেওয়া পথচলতি গুটিকতক মানুষ আর দুএকটা যানবাহন ছাড়া আর কোথাও কিচ্ছু নজরে পড়ছে না। যেদিকেই চোখ যায় কেবল অসহনীয় শূণ্যতা! আড়াল থেকে প্রকৃতি দেবীর এই নির্মম অত্যাচার কখন যে শেষ হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
এই চূড়ান্ত দুর্যোগ উপেক্ষা করে যখন ধর্মতলা থেকে সুভাষগ্রাম পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা ছ’টা। কি ভাবে গোটা রাস্তাটা এলাম তা বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। কলকাতার ব্যাস্ততম অঞ্চল থেকে এরকম একটা জনবিরল জায়গাতে এসে একটু অন্যরকম লাগছে। সুভাষগ্রামে আমার ভালোই জাতায়াত আছে ঠিকই তবে আজ যেন কেমন অদ্ভুত মনে হচ্ছে চারপাশ। দোকানপাট সব বন্ধ। বাড়িগুলোর দরজা জানালাও খোলা নেই। রাস্তায়, গলিতে লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। দেখলে মনে হয় মৃত্যুর আচমকা হানায় গোটা পৃথিবী থেকে প্রাণ নিশ্বেষ হয়ে গেছে, একমাত্র আমি বেঁচে রয়েছি মানুষের দুর্গতির সাক্ষী হয়ে আর বয়ে চলেছি অসম্ভব একাকিত্বের ভার।
গলিগুলোতে প্রায় এক হাঁটু জল দাঁড়িয়ে গেছে। রাস্তার দুধারে আগে যে সমস্ত পুরোনো বাড়িগুলো ছিল, সম্প্রতি তার বেশীরভাগই ভাঙা পড়েছে। সেই জায়গায় মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ফ্ল্যাট। তাদের সদ্য তৈরি হওয়া কঙ্কালসার কাঠামোগুলো অদ্ভুত প্রেতমূর্তি ধারন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অলি গলি পেরিয়ে একটা মাঠের সামনে এসে দাঁড়ালাম। প্রতিদিন বিকেলে এই মাঠে ফুটবল খেলা হয়। আজ এই তুমুল বৃষ্টিতে কেউ আসেনি। মাঠের বেশীরভাগ অংশ বৃষ্টির জল জমে একটা ছোটোখাটো পুকুরে পরিণত হয়েছে। মাঠের দুধারে দুটো গোলপোস্ট, যা কিনা প্রতিদিন ছেলেগুলোর কাছে এতো প্রাধান্য পায়, আজ তারা নির্বাক, হতভম্বের মত একে অপরের দিকে অসহায় ভাবে চেয়ে রয়েছে।
মাঠের গা ঘেঁষে একটা রাস্তা। তারই ওপারে একটা দোতলা আদ্যিকালের বাড়ি। ওটাই আমার গন্তব্যস্থল।এবার প্রশ্ন হচ্ছে, কি এমন কারন ঘটল যার জন্য এই চূড়ান্ত দুর্যোগের মধ্যেও আমাকে আসতে হল এখানে? কারনটা খুবই মর্মান্তিক। সেটা বলার আগে আমার নিজের পরিচয়টা দেওয়া দরকার। আমার নাম সুগত গাঙ্গুলি। পেশায় ব্যাবসায়ী। গড়িয়াতে আমার নিজস্ব একটা সাইবার ক্যাফে আর কম্প্যুটার হার্ডওয়্যারের দোকান আছে। ব্যাবসাটা মন্দ চলে না। বিয়ে থা করিনি। সুতরাং ব্যাবসার লাভের খানিকটা অংশ কাজে লাগালেই আমার হেসে খেলে চলে যায়। সকালবেলা ধর্মতলা গেছিলাম ব্যাবসার একটা কাজে। বেলা বারোটা নাগাদ আমার মোবাইলে ফোন করে রূপক। খবর শুনে আমি স্তম্ভিত। আমার বাল্যবন্ধু অরিন্দম আজ সকালে আত্মহত্যা করেছে। প্রথমটা আমি বিশ্বাস করিনি কিন্তু পরে সোমার সাথেও আমার কথা হল। সোমা অরিন্দমের স্ত্রী। বেচারি একেবারে থম মেরে গেছে। ফোনে একফোঁটাও কান্নাকাটি না করে, ভাবহীন শুকনো গলায় একবার শুধু বলল, “সুগত, তুমি একবার এসো”।
অরিন্দম আর আমি একই স্কুলে পড়তাম। কলেজও এক। যে আমাকে ফোন করে অরিন্দমের খবরটা দিল, অর্থাৎ রূপক, সেও আমার বন্ধু। আরও অনেকে রয়েছে। দলটা নেহাত ছোট নয়। সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে অরিন্দমের সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। ছেলেটা একেবারেই করিৎকর্মা নয় তাই জীবনে কিছুই করে উঠতে পারেনি। পড়াশুনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে প্রোমোটিং শুরু করেছিল কিন্তু টেকাতে পারেনি ব্যবসাটা। তার ওপর বিয়ে করে বছর দশেক আগে। তবে সম্প্রতি তার অবস্থাটা আরও বেশী খারাপের দিকে গেছিলো। বাজারে দেনা হয়ে গেছিল প্রচুর। মাঝেমধ্যেই পাওনাদারেরা বাড়ি এসে, দেনা মেটাতে না পারায়, অপমান করে যেত অরিন্দমকে। সোমাও একপ্রকার বিরক্ত হয়ে উঠেছিল ওর ওপর। অরিন্দম মাঝে মাঝে আমার কাছেও সাহায্যের হাত পেতেছে। আমি যতটুকু সম্ভব করেছি। আজ আফসোস হচ্ছে। বার বার একটাই চিন্তা মনটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে – ইস, আরও একটু যদি করতে পারতাম ছেলেটার জন্য।
আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা বৃষ্টির ধারাকে এখনো অব্যাহত রেখেছে। তার সাথে সাথে আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ব্যাঙ আর ঝি ঝি পোকার সমবেত সঙ্গীত। আজকের এই বর্ষণ মুখর রাত ওদের মজলিশকে একেবারে জমিয়ে তুলবে। অরিন্দমের বাড়িটা যেন থম মেরে রয়েছে। সদর দরজাটা খোলাই ছিল। ঢোকার সাথে সাথে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অরিন্দমের সাথে কাটানোর পুরোনো স্মৃতিগুলো আমার মস্তিষ্কে হানতে লাগল নিষ্ঠুর আঘাত। সত্যিই কি সেই দিনগুলো আর ফিরবে না?
বাড়িটা পুরো অন্ধকার। বোধহয় লোডশেডিং। একতলাটা ফাঁকা পড়ে রয়েছে। অরিন্দমরা দোতলাতেই থাকে। সিড়ি ভেঙে উঠতে লাগলাম ওপরে। রূপক নিচে নামছিল। আমাকে দেখেই বিষাদভরা মুখে বলল, “আয়। সোমা অপেক্ষে করছে”।
“কি করে হল এইসব রূপক?” বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করলাম আমি।
“সোমা সব বলবে। দেখা করে আয়”, সংক্ষেপে, গম্ভীর গলায় উত্তর দিল রূপক।
দোতলায় উঠে একটা লম্বা বারান্দা। তার লাগোয়া পাশাপাশি তিনটে ঘর। আমি প্রথম ঘরটাতে ঢুকলাম। ভেতরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আর দম বন্ধ করা নিরবতা আমাকে যেন গিলে খেতে এল। তবে ঘরটাতে ঢুকে মনে হল আমি যেন সেখানে একা নই। একাধিক ছায়ামূর্তি সেখানে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে। তারা কারা? কারা রয়েছে ঘরটাতে? তারা কি এইজগতের কেউ নাকি অন্য কোনও জগতে, অরিন্দমের সাথে সম্প্রতি আলাপ হওয়া কিছু প্রেতাবয়ব?
অরিন্দম আর নেই, এই নিষ্ঠুর সত্যিটাকে মানতে পারছিলাম না। তাই সারাক্ষনই তার উপস্থিতি অনুভব করছিলাম সারা বাড়িটাতে। হঠাৎ পেছন থেকে ধমকের সুরে রূপক বলে উঠলো, “এ ঘরে কি করছিস? চল পাশের ঘরে। বলছি তো সোমা অপেক্ষা করছে তোর জন্য”।
বেরিয়ে এলাম ঘরটা থেকে। গা টা কেমন যেন ছমছম্ করে উঠলো। সোমাকে কি অবস্থায় দেখব তার নানারকম সম্ভাব্য ছবি মনে মনে কল্পনা করছি আর অস্বস্তি বাড়ছে। কি ভাবে দাঁড়াবো ওর সামনে? কি বলবো? কি সান্তনা দেব? কিছুই বুঝতে পারছি না।
ঘরের ভেতরে একটা নীল আভার হাল্কা এমারজেন্সি লাইট জ্বলছে। একটা চৌপায়া টেবিলের ওপর সেটা দাঁড়িয়ে। ঘরের আর সমস্ত আসবাবপত্র ভালো করে ঠাহর হচ্ছে না অন্ধকারের জন্য। শুধুমাত্র আবছা আলোতে জানালার ধারে পাতা একটা চৌকি নজরে পড়ছে অস্পষ্ট ভাবে। তার ওপরেই বসে রয়েছে সোমা। চুপচাপ, নিথর। যেন পাথরের মূর্তি। চুল গুলো পুরো খোলা ও অবিন্যস্ত। একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে আলোর দিকে। অরিন্দম আর ওর মধ্যে কোনওদিনই সেরকম একটা প্রীতির সম্পর্ক দেখিনি। কিন্তু আজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অরিন্দমের না থাকাটা তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে ভেতর থেকে।
বাইরে বৃষ্টির বিরাম নেই। তার সাথে তাল মিলিয়ে বয়ে চলেছে উন্মাদ বাতাস যার আওয়াজ কোনও এক অতৃপ্ত আত্মার গোঙানির মত শোনাচ্ছে। আমি সন্তর্পণে সোমার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও একবার আমার দিকে মুখ তুলে চাইলো। তারপরে আবার আলোর দিকে তাকিয়ে বলল “সব শেষ সুগত। সব”।
সান্তনা দেওয়ার ভাষা যানা নেই আমার। তাই কিছুই বলতে পারলাম না। সোমা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আলোর দিকে। অন্যান্য বঙ্গবধূদের মত কাঁদছেও না, কপালও ফাটাচ্ছে না করাঘাতে। এই ব্যাবহারটাই অস্বাভাবিক। কেন জানিনা, ওকে দেখে আমার ভালো লাগছিল না একদম। ওর চোখের চাহনি, ওর কথা বলার ধরন, সব কিছুর মধ্যেই সাভাবিকত্বের অভাব লক্ষ্য করছিলাম।
“আর সব কোথায়?” জিজ্ঞাসা করলাম সোমাকে।
“কারা?”
“তোমাদের আত্মীয়স্বজনেরা? আমাদের আর সব বন্ধুরা? কেউ আসেনি? বাড়িটা এরকম ফাঁকা লাগছে কেন?”
“অনেকেই এসেছিলো। তারা চলে গেছে।“
রূপককে কিছু একটা বলবো বলে দরজার দিকে ফিরতেই দেখি ও নেই! এ কি? ও আবার কোথায় গেল?
“রূপক পরে আবার আসবে,” বলল সোমা। “ও বেচারা সারাদিন খুব দৌড়ঝাঁপ করছে। আসলে পাশেই থাকে তো তাই সব দায়িত্ব ওর ওপরেই বর্তেছে”।
কথা শেষ করে সোমা উঠে দাঁড়াল। পাশের ঘরে যাওয়ার দরজাটা খোলা আছে। সোমা সেদিকেই অগ্রসর হল।
আমি কৌতুহল নিবারণ করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, “ও ঘরে যাচ্ছ কেন? কি আছে?”
“তুমি আসবে আমার সাথে? দেখবে কি আছে?”
ক্রমশ সোমার সান্নিধ্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। কম্পিত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম “কি আছে?”
অদ্ভুত একটা হাসি মাখানো কণ্ঠে সোমা বলে উঠল, “এই ঘরেই অরিন্দম গলায় দড়ি দিয়েছে আজ সকালে।“
কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। একটা অজানা আতঙ্ক আমার শিরদাঁড়া বেয়ে বিদ্যুতগতিতে নেমে গেল আর শিহরণ জাগাল গোটা শরীরে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বললাম, “ঐ ঘরে যেয়ো না। তোমার ভয় করবে। মন খারাপ করবে।“
“ওসব আমার আর হবে না সুগত”, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সোমা। “বরং ও ঘরে গেলেই আমার ওর সাথে দেখা হবে। কথা হবে।“
পুরো পাগলের প্রলাপ। বেচারি আঘাতটা নিতে পারেনি। সোমা দরজার দিকে এগোচ্ছে। আমার কথা ও শুনল না। ও ঘরটা তে ঢুকবেই। ঢোকার আগে আমার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “সুগত তুমিও এস। বন্ধুর সাথে দেখাটা তো করে যাও”।
সোমার এই আদেশ পালন করার কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না। তাও কেন জানিনা, কি এক রহস্যময় মন্ত্রবলে আমি সোমাকে বশীভূতের মত অনুসরণ করতে লাগলাম। ঢুকলাম ঘরটার ভেতর। নিকষ কালো অন্ধকার যেন আমার গলা টিপে ধরল। অনুভব করলাম সোমা আমার পাশেই আছে। হঠাৎ ও আমাকে বলল, “দাঁড়াও, আমি আলোটা নিয়ে আসছি”।
বেশীক্ষন অপেক্ষা না করিয়ে সোমা ফিরে এল আলো নিয়ে। অনেক্ষন ধরে জ্বলবার কারনে আলোর তেজ কমে আসছে। সোমা আলোটা হাতে করে নিয়ে চলে গেলো ঘরের একদম কোনে। কি ওর মতলব বোঝা ভার।
ঘরের একদম কোনে গিয়ে আলোটাকে মেঝেতে নামিয়ে রেখে, তার সামনেই বসে পড়োলো সোমা। মনে হল ওর পাশেই একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সোমার মুখের দিকে তাকালাম। তাতে কোনও দুঃখের ছাপ নজরে পড়ল না। বরং ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠল একটা শুষ্ক ভাবহীন হাঁসি। ওর কোটোরে ঢোকা চোখ দুটো আমার দিকে একটা অদ্ভুত নিষ্ঠুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
এবার সোমা আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তির উদ্দেশ্যে বলল, “কই গো? এস! দেখ কে এসেছে!” পরক্ষনেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখ তো সুগত, একে চিনতে পারো কি না?”
ছায়ামূর্তি ধীরগতিতে এগোচ্ছে সোমার দিকে। এখনও তাকে ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ধীরে ধীরে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ফলে প্রস্ফুটিত হতে লাগল তার গোটা দেহটা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। একবার ওদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বুঝলাম ওদিকে তাকানো যতটা কঠিন, না তাকানো তার চেয়ে ঢের বেশী শক্ত।
অবিলম্বে চোখ ঘোরালাম আলোর দিকে। সোমা কোন ফাঁকে তার এলোচুলগুলো মুখমণ্ডলীর ওপর এনে ফেলেছে তা বুঝলাম না। ছায়ামূর্তি এবার সোমার ঠিক পাশে এসে বসল। আলোতে যা দেখলাম তাতে শিউরে উঠল গোটা শরীর। কি ভয়ানক সেই দৃশ্য! স্পষ্ট দেখলাম, সাদা ফতুয়া পরে অরিন্দম বসে রয়েছে। চুলগুলো পুরো উসকোখুসকো। মুখটা পুরো ফ্যাকাশে, পাংশুবর্ণ। নীল আলোতে দেখলাম, গলার কাছে একটা কালো রেখা। বোধহয় ওখানেই দড়ির চাপ লেগে ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছিল অরিন্দমের আজ সকালে।
খানিক্ষন সব চুপ। অরিন্দম আমার দিকে নিষ্ঠুর চোখে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। নিরবতা ভঙ্গ করে ঘষা ঘষা কণ্ঠে ও বলল, “ভালো আছিস সুগত? অনেকদিন পর এলি। আজকাল আর আসিস না কেন? ভাবিস বোধহয় আমি সাহাজ্য চাইবো। না রে। আর সেইসব হবে না। আমি সব পাট চুকিয়ে দিয়েছি”।
ইদানিং সত্যি এখানে আমি আসা কমিয়ে দিয়েছিলাম। কারনটা অরিন্দমের বার বার আর্থিক সাহাজ্য চাওয়াই বটে।
“চুপ করে আছিস কেন সুগত?” বলল অরিন্দম। “আমি তো আর এই জগতের বাসিন্দা নই। তবে তোকে ছেড়ে কি করে থাকি বল? কতোদিনের বন্ধুত্ব। এতো সহজে ভুলে গেলে চলবে কি করে? এবার আয় তো এদিকে? তোকেও আমার সঙ্গী বানিয়ে নিই”।
অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে নিয়েছে আমার গোটা শরীর। অরিন্দম আমাকে ওর দলে টানতে চাইছে। মনে যতটা সাহস আছে তার সবটা জড়ো করে বললাম, “সোমা, ওকে যেতে বল। আমি অনুরোধ করছি। তোমার কি একটুও ভয় করছে না?”
আমার কথা শুনে সোমা খিল খিল করে হেঁসে উঠে বলল, “ভয়? সেটা আবার কি? ও তো মানুষের করে। আমি তো আর......”
“তুমি তো আর কি? কি বলতে চাইছো?” ভীত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম আমি।
জবাবে সোমা বলল, “আজ দশটা নাগাদ অরিন্দম যখন আত্মহত্যা করল, তার পরে আমি আর থাকতে পারলাম না। মানতে পারলাম না ব্যাপারটাকে। এই ঘরেরই এক কোনে ইঁদুর মারার বিষ রাখা ছিল। তার অনেকটাই মুখে পুরে ফেলি। যেখানে এখন বসে রয়েছি, সেখানেই দাপাতে দাপাতে............”
“সোমা!” নিজের অজান্তেই চেচিয়ে উঠলাম। ভয় যেন আমার গলা টিপে ধরেছে। আলো আঁধারের লুকোচুরির ফলে একটা অদ্ভুত প্রেতলোকের দীপ্তি বিরাজ করছে গোটা ঘরটাতে। সেই আলোতে দেখলাম অরিন্দম আর সোমা উঠে দাঁড়ালো। দৌড়ে পালানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। পা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সেই প্রেত দম্পতি আমার দিকেই এগোতে লাগল। নির্মম দৃষ্টিতে তারা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। একবার রূপকের নাম ধরে ডাকবার চেষ্টা করলাম। আওয়াজ বেরোলো না গলা দিয়ে। দুটো পা বেইমানি করবে জেনেও যতটা শক্তি আছে তার সবটা জড়ো করে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে এলাম ঘরটা থেকে। ঘরের ভেতর থেকে শুনলাম সোমা আর অরিন্দমের অপার্থিব অট্টহাসি। আমার তখন আর চলার ক্ষমতা নেই। বারান্দার রেলিং ধরে কোনোমতে ঢুকলাম প্রথম ঘরটাতে। আবার সেই এক অনুভূতি। ঘরটাতে অনেকেই রয়েছে, অন্ধকারে যা আমি বুঝে উঠতে পারছি না। মনে হল যেন শোকস্তব্ধ একটা প্রেতসভা বসেছে সেখানে। আজ কি আমার সত্যিই রেহাই নেই সোমা আর অরিন্দমের হাত থেকে? হঠাৎ দেখলাম দরজার সামনে ওরা দুজনে দাঁড়িয়ে তাদের বিকট মূর্তি নিয়ে। সোমার হাতে আলোটা রয়েছে তাই আরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মুখটা। কি বীভৎস, কী ভয়ার্ত অনুভুতি জাগিয়ে তুলছে সেই মুখ দুটো।
আমি এক পা এক পা করে পেছতে থাকলাম আর ওরা আমার দিকে এগোতে লাগল। বুঝলাম এবারেই ক্লাইম্যাক্স। অরিন্দম অথবা সোমা, কারুর একটা হাত আমার গলা টিপে ধরবে আর টেনে নেবে তাদের জগতে।
পেছতে পেছতে কীসের সাথে যেন পা টা ঠেকে গেল। আর নড়তে পারলাম না। বুঝলাম দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সোমা আর অরিন্দম দুজনেই এবার ঝুকে পড়েছে আমার মুখের ওপর। আমি ভয়ে চোখ প্রায় বন্ধ করতে যাব, এমন সময়...এমন সময়, ঘরের আলোটা দপ করে জ্বলে উঠল, আর অনেকের অট্টহাসি কাপিয়ে তুলল চারদিক। ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি হল যে সমস্ত তালগোল পাকিয়ে গেল আমার মাথার মধ্যে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। একটু একটু করে চোখ খুলে দেখলাম সোমা আর অরিন্দম হেঁসে গড়িয়ে পড়ছে। ঘরে বড় একটা খাটা তাতে বসে রয়েছে আমার সব বন্ধুরা – রূপক, তমাল, বাসুদেব, অরিত্র আর সম্রাট।
ব্যাপারটা কি হল তা বোঝার আগেই দেওয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ল। সম্প্রতিকালের ডিজিটাল ক্লক। তাতে তারিখটাও লেখা রয়েছে – ১লা এপ্রিল, অর্থাৎ যে দিন লোকেদের বোকা বানিয়ে অপদস্থ করার ফাঁদ পাতা থাকে চারদিকে। সারাদিনের ব্যাস্ততার ফলে আমি দিনটার কথা ভুলেই গেছিলাম। বেশীরভাগ লোকেদের ক্ষেত্রে এই জিনিষটাই হয়।
হাঁসি থামিয়ে সোমা আর অরিন্দম এবার উঠে দাঁড়ালো। অরিন্দম তার মুখে লেগে থাকা পুরু পাউডারের আস্তরনটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “পুরো প্ল্যানটা রূপক আর সোমার। আমার একদম সায় ছিল না”।
পাশ থেকে তমাল চেচিয়ে বলল, “তবে রে? গল্প আর স্ক্রিপ্টটা কার সেটা বল! এতো কষ্ট করে লিখলাম!”
“আর মেক আপ?” চেচিয়ে উঠল অরিত্র।
বাসুদেব বলল, “আমার আর সম্রাটের কোনও ভূমিকা নেই। ভাই সুগত, আমাদের ওপর রাগ করিস না”।
অরিন্দম বিছানার ওপর গা এলিয়ে দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, “কয়েক সপ্তাহ আগে প্রোমোটিংটা আবার শুরু করলাম। গতকাল একটা ভালো কন্ট্র্যাক্ট পেয়েছি। অবস্থা আবার ফিরেছে। তোকে ফোনেই যানাতে পারতাম কিন্তু তুই তো আর আসিস না তাই একটু মজা করলাম সকলে মিলে”।
“রাগ করলে না তো সুগত?” এলো চুলগুলোকে পাকিয়ে খোপা বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞাসা করল সোমা। আমি তখনো হতবম্বের মত দাঁড়িয়ে রয়েছি। ঘাড় নেড়ে না বললাম। কিন্তু মনে মনে তারিফ করলাম অরিন্দম আর সোমার অভিনয়কে। এক কালে অরিন্দমের সিনেমা থিয়েটারের অসম্ভব নেশা ছিল। স্কুলে, কলেজে বেশ কয়েকবার পাঠ করেছে নাটকে। অভিনয়টা ও ভালোই যানে।
“ফ্লাস্কে চা আছে। নিয়ে এস”, সোমাকে নির্দেশ দিল অরিন্দম।
“সুগতর জন্য ডবল কাপ”, টিপ্পনি কেটে বলল রূপক।
সোমা হাঁসতে হাঁসতে চলে গেল ঘর থেকে। সম্রাট ঘরের কোনে রাখা টিভিটা চালালো। চালানোর সাথে সাথেই একটা খবরের চ্যানেল। তাতে আজ দুপুরের একটা দুর্ঘটনার কথা খুব ফলাও করে বলা হচ্ছে।
আমার আর এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। এক পা এক পা করে আমি দরজার দিকে যেতে শুরু করলাম।
“কি রে? কোথায় চললি?” হাঁক দিল অরিন্দম।
“রাগ হল নাকি রে?” জিজ্ঞাসা করল তমাল।
“থামা ওকে”, চেঁচিয়ে উঠল রূপক আর সম্রাট।
সোমা এরই মধ্যে চা নিয়ে চলে এসেছে। আমাকে বেরোতে দেখে বলল, “সুগত রাগ করলে নাকি? চা টা তো খেয়ে যাও”।
আমি কারুর কথায় কর্ণপাত করলাম না। আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম সিঁড়ি দিয়ে। আর ওরা চাইলেও আমাকে দেখতে পাবে না।
ঘরের মধ্যে সবাই চুপ করে গেছে। টিভিতে এখনও দুর্ঘটনার সংবাদটা শোনা যাচ্ছে। আসলে ভিকটিম যে আমি সেটা শোনার পর ওদের আর কথা বলার ক্ষমতা নেই।
আজ আসল বোকা আমি ওদের বানালাম। এখানে আসার পথেই দুপুরে বাসে উঠতে গিয়ে পা হড়কে যায় আরা পিছনের চাকাটা থেতলে দেয় আমার মাথা। খবরটা পুরোটাই বলল শুনতে পেলাম আর তার সাথে শোনা গেল সোমার চিৎকার আর এক গাদা কাঁচের কাপ ভাঙার শব্দ। বেচারী খবরটা শুনে কাপগুলো আর ধরে রাখতে পারেনি।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি মাঠের পাশের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশে কালো মেঘের বুক চিরে ধূসরবরণ চাঁদ উঁকি মারছে। দূরে জোড়া শিবমন্দিরের দিক থেকে এক দল কুকুরের ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি যেন হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলেছি। কোথায় যাব জানিনা। যেদিকে প্রাণ চায়, মন চায়, নিরুদ্দেশের পথে। বন্ধুদের কাছে ফিরে যাওয়ার আর উপায় নেই। এখন আর আমাকে কেউ সহ্য করতে পারবে না। মনটা খারাপ লাগল। তবে একটা ব্যাপার জোর দিয়ে বলতে পারি - এরকম নিদারুন এপ্রিল ফুল আগে কেউ কখনও যে হয়নি, এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
(সমাপ্ত)
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments