মরণ Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
মরণ।
----------
তরুবালার সাথে লক্ষ্মীর সম্পর্কটা ঠিক যেন আদায় আর কাঁচকলায়।তরুবালার চোখে তার বৌমা লক্ষ্মী নয় সাক্ষাৎ অলক্ষ্মী।ওনার কেবলই মনে হয় বৌমা লক্ষ্মীর নামকরণটা লক্ষ্মী না হয়ে মনসা, চন্ডী বা কালী হলে খুব ভাল হতো।নিদেনপক্ষে শীতলা হলেও চলত।লক্ষ্মী প্রতিমা বলতে যে শান্ত, স্নিগ্ধ, বিনয়ী একটা স্বপ্নিল চেহারা বা ভাবমূর্তির উদয় হয় মনে; লক্ষ্মীর মধ্যে তার কণামাত্রও ছিল না।এই সংসারে তরুবালার যে কাজগুলো সবচেয়ে অপছন্দের সেগুলো করতেই লক্ষ্মী সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে।শুধু এই সংসারে নয় চিরকাল ঘরে বাইরে সর্বত্র নিয়ম ভাঙাতেই তার আনন্দ আর উদ্দীপনা।তাই লক্ষ্মীর নামকরণটা যেন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের মত হয়ে গেছিল।
তরুবালা ছুঁচিবাইগ্রস্ত জাঁদরেল শাশুড়ীদের মধ্যে অন্যতমা।এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও ওনার কিছু এসে যাবে না কিন্তু তার সংসারে একচুল অনর্থ ঘটলে আর রক্ষে নেই।এই অনর্থ নানাভাবে ঘটতে পারে।টাকায় যেমন টাকা বাড়ে আর জলে জল বাড়ে
তেমনি মানুষের নানানরকম বাতিকও উত্তোরত্তর পরিপুষ্ট হয় আর তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।কতগুলো উদাহরণ দিলে তরুবালার সংস্কারের তরুলতা কেমন বেড়ে উঠছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাবে।শনি মঙ্গলবারে মোচা খেতে নেই,রবিবার মুসুর ডাল খেতে নেই, ভাতের এঁটো আর মাছ মাংসের এঁটো দুটো আলাদা ধরনের এঁটো।কি-করে তা সম্ভব সেটা তিনি নিজেও জানেন না।ছোট টেবিলের পুরোটা এঁটো আর বড় টেবিলের একপ্রান্ত এঁটো,লাউ কুমড়ো একসাথে খেতে নেই,পটল আর পলতার ঝোল রান্না করতে নেই,মেয়েদের লাউ কাটতে নেই,জোড়া ফল খেতে নেই,দুটো ঝাঁটা একসাথে রাখতে নেই ইত্যাদি, ইত্যাদি বলে শেষ হবে না।তার অভিনব বাতিকটি হল এঁটো টাকা কেচে রোদে মেলে দেওয়া।বিভিন্ন মানুষের ছোঁয়ায় অশুদ্ধ টাকাকে শুদ্ধ করার প্রকৃষ্ট পন্থা হল তা কেচে ফেলা।ছেলের মোবাইল, টিভির রিমোট বহুবার তিনি সাবান জলে ডুবিয়েছেন।এছাড়া নানা উপোসের নানা ফর্দ,নানা দেবতার নানারকম পূজোর বিধান তার কন্ঠস্থ।উপোসের চোটে লক্ষ্মী বেচারীর প্রাণান্ত।সে যত খেতে ভালবাসে তরুবালা তত নিত্যদিন নানা পূজোর উপোসের বাহানা তৈরী করে তার খাওয়া ঘুচিয়ে দেন।এছাড়া শ্রাদ্ধ শান্তি অশৌচ পালন এসব নানান ব্যাপারেই লক্ষ্মীর প্রবল আপত্তি।এই তরুবালার এরকম অজস্র বাতিকে জর্জরিত লক্ষ্মী প্রায় প্রত্যেকটি নিয়মই বারংবার খন্ডন করে প্রমাণ করে দেয় যে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে সংসারে কোনো অনর্থই ঘটে না।অনর্থ ঘটার মত অনেক জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই জগৎ সংসারে প্রত্যহ ঘটে চলেছে।তবে এই প্রামাণ্য তথ্যগুলো উপস্থাপন করতে গিয়ে প্রায় নিত্যদিনই তরুবালার বাড়ীতে যে যাত্রাপালা চলে তাতে পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে কাক-চিলের মত প্রাণীকুলও এই বাড়ীর ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না।তরুবালা স্কুলের গন্ডী মাড়াননি কোনোদিন।কিন্তু নিজেকে তিনি সবজান্তা বলে মনে করেন এবং সব বিষয়ে এমন যুক্তি খাড়া করেন যে স্কুল কলেজ পেরোনো শিক্ষিত মানুষরাও ভিরমি খাবে।এদিকে লক্ষ্মীরাণী পড়াশোনা জানা বিদূষী বৌমা।চাকরি করলে অনেক উন্নতি করত।ভাগ্যের ফেরে গৃহবধূ হয়ে বসে আছে।সে যাইহোক লক্ষ্মীর এমন অলক্ষ্মী মার্কা কার্যকলাপে তরুবালার স্বস্তি নেই।
''আমি মরলে আমার এই সংসার উচ্ছন্নে যাবে।আমি মরেও শান্তি পাব না গো।হে ভগবান এ কি অলুক্ষুণে মেয়ের পাল্লায় আমাকে ফেললে গো!ভেবেছিস তোকে আমি ছাড়ব?সেগুড়ে বালি! তোকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।''
এই ছিল তরুবালার মুখের বুলি।আর নিত্যদিনের সাংসারিক যাত্রাপালার ব্যাকগ্রাউন্ড কনসার্ট।তবে লক্ষ্মীরাণীর এই নিয়ে বিশেষ হেলদোল ছিল না।সে তার মত নিত্যদিনই নানারকম অনর্থ ঘটাতে-ঘটাতে সংসারকে কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর বানিয়ে ফেলেছিল।লক্ষ্মী লোকমুখে গল্প শুনেছে তার শ্বশুর যখন মারা গেছিলেন তখন তরুবালা কোন এক ভন্ড গুরুর চরণামৃত খাইয়ে তার স্বামীকে বাঁচিয়ে তোলার বাসনায় তিনদিন ধরে ঘরের দরজা বন্ধ করে অনবরত মুখে চরণামৃত দিয়ে গেছিলেন।ফলে সেই মৃতদেহ পচে তার গন্ধে সে এক বিকট অবস্থা।শেষে দরজা ভেঙ্গে অনেক কষ্টে মৃতদেহ সৎকার করা হয়েছিল।এই হল তরুবালার মহৎ কীর্তিগুলোর অন্যতম কীর্তি। এমন এক চরম পরিস্থিতিতে লক্ষ্মীর নারায়ণ যখন বাণপ্রস্থে যাওয়া একরকম স্থির করে ফেলেছে।সেই সময় সকল জ্বালা জুড়িয়ে তরুবালা ইহলীলা সাঙ্গ করলেন।সবচেয়ে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক যে লক্ষ্মীর সাথে সেই লক্ষ্মীই সবচেয়ে বেশী কাঁদলো তরুবালার মৃত্যুতে।কেননা ঝগড়া করে অনর্থ ঘটানোর তার জুটিটি গেল ভেঙ্গে। তবে মনে মনে লক্ষ্মী ভাবল এইবার আর তার পেছনে খিট খিট করার কেউ রইল না।স্বাধীনভাবে মনের সুখে অনিয়মের রাজত্ব চালাবে সে।
শীতের রাত।হাড়ে-হাড়ে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে।উত্তর দিক থেকে কনকনে হাওয়া বইছে।বুড়ি আর মরার টাইম পেল না।যে সব আত্মীয়দের সাতকালে বাড়ীর ত্রিসীমানায় দেখা যেত না তারাও সব রাতের বেলাই এসে উপস্থিত।নানারকম বিধান আর নিয়মের নিগূঢ় আলোচনায় বাড়ী সরগরম।তরুবালার নিপুণ সংসার পরিচালনায় আর নিয়ম নিষ্ঠার ছায়ায় শান্তির আশ্রম সংসারটি কেমন শিকড় বিস্তার করেছিল এইসব কথার কচকচিতে লক্ষ্মীর প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়।পুরোহিত প্রায়শ্চিত্ত ছাড়াও আরও নানারকম জটিল নিয়ম বলে যাচ্ছেন ঘ্যান ঘ্যানিয়ে।কি কি করলে তরুবালা স্বর্গে গিয়েও একটা কুসংস্কারের বাতাবরণ তৈরী করে সেখানকার দেব দেবীদেরকেও অতিষ্ট করে তুলতে পারবেন এবং পরম শান্তি পাবেন!অশৌচের কদিন কি করা উচিত আর উচিত নয় ইত্যাদি।এদিকে বেলা থেকে তরুবালার শ্বাস উঠেছিল,সেই থেকে ডাক্তার ডাকা ওষুধ পথ্য করে লক্ষ্মীর পেটে দানা পানি পড়েনি।এমনকি বিকেলের চা-টুকু পর্যন্ত না। চা চা করে এখন তার মাথা বন বন করে ঘুরছে।কিন্তু মরা ছুঁয়ে রান্নাঘরে ঢোকা যাবে না! নাকি যাবে?এ নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হচ্ছে।ফ্রিজে ইলিশ মাছের ঝোল ভাত আছে খানিকটা।গরম করে খেয়ে নিলেই হয়।কিন্তু বিজ্ঞ সবজান্তা আত্মীয়রা নাক তুলে বসে আছেন কি যে করবে লক্ষ্মী?কিন্তু না খেয়ে তো আর পারা যাচ্ছে না।
তরুবালাকে নিচে নামানো হয়েছে।ফুল মালা, ধূপের গন্ধে বাড়ী ম ম করছে।আত্মীয় স্বজনের বিনিয়ে বিনিয়ে কান্নার সুরে তরুবালার প্রতি সকলের ভালবাসা আর শ্রদ্ধা উথলে উঠছে।সকলে নীচে নেমে গেছে।নাহ! না খেয়ে আর লক্ষ্মী পারবে না।আর কদিন তো কি জুটবে কপালে জানা নেই।পরম হিতাকাঙ্খী, শাস্ত্রজ্ঞ আর নিয়ম বিশারদেরা এখন তার বাড়ীতে বডি ফেলে দেবে।একটা ছেড়ে একগুচ্ছ শাশুড়ীর পাল্লায় পড়তে হবে এখন কদিন।সুতরাং আজ ইলিশ মাছের ঝোলটা একটু খেয়েই নেবে লক্ষ্মী।অমন বড় বড় তিনখানা পেটির দিকের মাছের লোভ টা ছাড়া যাবে না কিছুতেই।বুড়ি তো আর দেখছে না।তাড়াতাড়ি খেয়েই নীচে নেমে যাবে।এই ঠান্ডায় বরফের মত ঠান্ডা গঙ্গার জলে ডুব দিতে হবে লক্ষ্মীকে।মাগো! ভেবেই কান্না পাচ্ছে লক্ষ্মীর।নির্ঘাৎ নিমোনিয়া হবে।কে যে এইসব জঘন্য নিয়ম বানিয়েছিল?সব ঐ বামুনদের চক্রান্ত।এইজন্য বামুনদের মোটে সহ্য করতে পারে না লক্ষ্মী।খুব সুবিধেবাদী এরা।
গ্যাসটা জ্বেলে কড়ায় ইলিশ মাছের ঝোলটা গরম করতে দিয়েছে লক্ষ্মী।ভাতের হাঁড়ি থেকে ভাত বেড়ে নিয়েছে থালায়।ঝোল ফুটছে টগবগ করে।ইলিশের গন্ধে প্রাণটা আনচান করছে। খিদেটা আরও বেড়ে গেল তার।আপনি বাঁচলে বাপের নাম।ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে হুহু করে।ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল অসময়ে।হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল।গ্যাসটা নিভে গেল দপ্ করে।অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না।রান্নাঘরের জানলাটা প্রবল হাওয়ায় ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ তুলে খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে।মোমবাতি জ্বালতে হবে।একেই তাড়াহুড়ো আর এই সময়ই আলো চলে গেল।মোমবাতি খুঁজে পাচ্ছে না লক্ষ্মী।হঠাৎ অন্ধকারে দেখল রান্নাঘরের দরজা দিয়ে কে যেন একটা ছায়ার মত এগিয়ে আসছে।এগিয়ে আসছে তারই দিকে।কে?কে ঐটা?বিদ্যুত চমকে উঠছে!বাজ পড়ার শব্দ! কে ও?তরুবালা?গ্যাসের ওপর থেকে ইলিশ মাছের কড়াটা তুলে আছড়ে ফেলেছে মাটিতে।ভাতের হাড়িটা উল্টে দিয়েছে ভাত ছড়িয়ে পড়েছে লক্ষ্মীর সারা গায়ে।বিকট হাসিতে লক্ষ্মীর কান ফেটে যাচ্ছে!স্বপ্ন দেখছে না কি লক্ষ্মী?তরুবালা কি তবে মরেনি?তাহলে মরার খাটে কে শুয়েছিল?
বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে লক্ষ্মীর।ঘুটঘুটে অন্ধকারে কে যেন ওর গলাটা টিপে ধরেছে।দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। মরে যাবে নাকি? হিসহিসে গলায় লক্ষ্মীর কানের কাছে কে যেন বলছে-
''আমার সংসারে আমি কিছুতেই অনর্থ ঘটতে দেবো না।ভেবেছিলি আমি মরে গেছি?তরুবালারা মরে না রে।ঘরে ঘরে বেঁচে থাকে।''
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments