Header Ads Widget

বন্ধন

বন্ধন Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)






বন্ধন



   আরামচেয়ারে আধশোওয়া হয়ে থাকা বৃদ্ধা আমাদের দুজনকে মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন । আমি আর সৌমিক ওঁর কাছেই একটি সোফায় বসেছিলাম । পুরোনো আমলের আসবাবে সাজানো ঘর । উঁচু সিলিং । দোতলা বাড়িটা বেশ সেকেলে । কোথায় যেন একটা ঘড়ি টিকটিক করে চলছিলো । 
  পুরো ব্যাপারটা একটু অপ্রত্যাশিত । কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোক আমায় ফোন করে বলেন যে তিনি অনেক চেষ্টা ও সময়ের পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন । আমিই কি মিসেস ঝুলন মিত্র, আগে রায় ছিলেন ?
“হ্যাঁ, কেন বলুন তো ?”
“নমস্কার, আমার নাম দেবেশ বসু । আমি একজন উকিল । আপনার পিতার দিক থেকে এক বৃদ্ধা আত্মীয়া আমার ক্লায়েন্ট, তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক । তিনি...”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমার বৃদ্ধা আত্মীয়া ? তিনি আবার কে !”
“রত্নাবলী দেবী । উনি আপনার বাপের বাড়ি দিক দিয়ে আপনার আত্মীয়া হন ।”
   আমি সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলাম এবার । বাবা ছাড়া বাপের বাড়ী বলতে কিছু ছিলো না আমার কোনোকালে । শুনেছি আমার বাবা মানে সুবীর রায় ছিলেন গোঁড়া এবং কড়া ধনী বনেদী যুক্ত-পরিবারের ছেলে । উনি কলেজ পাশ করে পারিবারিক লোহার ব্যবসার ভার না নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাবেন ঠিক করেন এবং বলা বাহুল্য এর ফলে বাড়িতে প্রবল বাধার সম্মুখীন হন । বাবা এতে কান দেন না । এবং এর পর যখন বাবা মধ্যবিত্ত সুশিক্ষিত দক্ষিণ ভারতীয় পরিবারের কন্যা সাবিত্রী কৃষ্ণানকে বিয়ে করে ফেলেন, তখন দুজনকেই বাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয় না, এবং ঠাকুরদা বাবাকে একবাক্যে ত্যজ্যপুত্র করে দেন । এতে বাবার কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া হয় না । সুবীর ও সাবিত্রী দুজনেই স্কলারশিপ যোগাড় করে বিদেশে চলে যান । বিয়ের বেশ অনেকদিন পরেই আমার জন্ম হয় । পিতৃগৃহের সঙ্গে বাবার কোনো যোগাযোগ ছিলো না, ঠাকুরদা নাকি ওঁর দাদার ছেলেদের ওঁর সম্পত্তির অংশ দিয়ে যান ।
   যাই হোক, আমি এখন দেবেশ বসুকে বললাম, “তা উনি কি জন্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন ?”
“সেটা উনিই বলবেন আপনাকে । সামনের সপ্তাহে যদি একদিন...।”
   সন্ধ্যাবেলা সৌমিক ফিরলে ওকে বললাম ব্যাপারটা । শুনে অবাক হয়ে বললো, “এতো বছর পরে যোগাযোগের চেষ্টা ! কে হতে পারেন !”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, “কে জানে !”
   কলকাতায় আমরা বেশি দিন আসি নি । সৌমিকের আত্মীয়েরা সবাই দিল্লিতে, ও পড়াশোনা করেছে ওখানেই । আমার জন্মের কিছুদিন পরেই আমার মা মারা যান, বাবা আমায় নিয়ে দেশে ফিরে এসে মুম্বইয়ের একটা ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন । আমি মুম্বইতেই বড়ো হয়েছি । সৌমিকের সঙ্গে বিয়ের পর পরই বছর তিনেক আগে বাবা মারা যান । আর এখন সৌমিক ওর এক বন্ধুর সঙ্গে একটা স্টার্ট আপ কম্পানি আরম্ভ করেছে এখানে । প্রচুর খাটতে হচ্ছে ।
চা করতে করতে বললাম, “কোনো ভালো ফ্ল্যাটের খোঁজ পেলে ?”
   সৌমিক বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোচ্ছিলো, বললো, “এঃ, কী বিশ্রী বাথরুমটা...নাঃ, সেরকম কিছু নেই । আমরা যেরকম জায়গায় চাইছি, একটু ভালো হলেই ভীষণ বেশী ভাড়া । কি করবো জানি না ঝুলা...।” ক্লান্তভাবে সোফাটায় বসে পড়লো । আমি চা আর চানাচুর নিয়ে ওর কাছে এসে বসলাম । চারতলার এই ফ্ল্যাটটা আমরা মাস তিনেকের জন্য নিয়েছি, এখানে স্থায়ীভাবে থাকা মুশকিল সত্যি । দেড়খানা ঘর, এইটুকু রান্নাঘর...যানবাহনের অসুবিধে, জল নিয়ে সমস্যা । ব্যবসায় বেশ কিছু টাকা লগ্নী করা হয়েছে, তাই একটু হিসেব করে চলতে হচ্ছে আমাদের । কিন্তু...
বললাম, “এই, দেখা করতে যাবো ওই মহিলার সঙ্গে ?”
  সৌমিক একটা হাই তুলে বললো, “ক্ষতি কী ! দুজনেই যাই চলো । নেক্সট বুধবারে আমার সময় আছে । এই ঝুলা, আজ কী রান্না করেছো গো ?”
  দেবেশবাবু আমাদের ঠিকানা ইত্যাদি দিয়েছিলেন, আমরা শেষদুপুরে গিয়ে পৌঁছলাম । জায়গাটা কিছুটা একটেরেয়, পাড়াটি একটু পুরোনো হলেও বেশ শান্ত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । হলুদ রঙের প্রাচীন দোতলাটির সামনে একটু জমি, পিছনে গাছপালা দেখা যাচ্ছে । বেল বাজাতে একটি শক্তসমর্থ গোছের কোমরে আঁচল-জড়ানো পরিচারিকা দরজা খুলে আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলো । 
....আর এখন ভাবছিলাম মহিলাকে দেখে বেশ অসুস্থই মনে হচ্ছে । শীর্ণ দেহ, মুখে বলিরেখা । পাকা চুলগুলো মাথার পিছনে ছোট্ট খোঁপা করা । পরনে সাদা থান । গলায় একটা সরু সোনার চেন চিকচিক করছে ।
আমায় বললেন, “তুমি ঝুলন তো ? ত্রিদিব রায়ের নাতনি, সুবীরের মেয়ে ?”
বললাম, “হ্যাঁ, শুনেছি । কিন্তু ত্রিদিব রায় বা ওঁর পরিবারের সঙ্গে আমার ও আমার বাবার কোনো যোগাযোগ ছিলো না । আপনি ঠিক কি সূত্রে...।”
“আমার নাম রত্নাবলী ঘোষাল । আমি সম্পর্কে তোমার ঠাকুরদার মাসতুতো দিদি ।”
আমি বললাম, “ও, আচ্ছা ।” আর কি বলবো ভেবে পেলাম না । বাবা তাঁর পরিবার সম্বন্ধে প্রায় কোনো কথাই বলতেন না । তাই আমিও বিশেষ কিছু ডিটেল জানি না ।
“তোমাদের পারিবারিক ব্যাপার আমি সবই জানি । আমার মা আর ত্রিদিবের মা দুই বোন ছিলেন । ত্রিদিবের জন্মের পর মাসি খুব অসুস্হ হয়ে পড়ে, ওরা আমাদের কাছে ছিলো বেশ কিছুদিন নানা কারণে, সেসময় আমি ত্রিদিবকে দেখাশুনো করতাম । তার কিছুদিন পরেই মাসি মারা যায় । ত্রিদিবের স্বভাবটি ঠিক ওদের বাড়ির মতোই হয়েছিলো । সুবীরকে ত্যাজ্য করার ব্যাপারটা আমি আর মা সমর্থন করি নি...।” বৃদ্ধা কথার খেই হারিয়ে ফেলছেন মনে হলো । সৌমিক একটু নড়েচড়ে বসলো । উনি যেন একটু সচেতন হয়ে বললেন, 
“যাই হোক । সেসব অনেক দিনের কথা । এখন শোনো । এই বাড়িটি আমার । আমি খুব অল্পবয়সে নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হয়ে এবাড়িতে মায়ের কাছেই থেকেছি, আমার বাবাও তখন স্বর্গে গেছেন । মা মারা গেলেন তাও তিরিশ বছর হয়ে গেলো । তিনকুলে আর সেরকম কেউ নেই আমার । আর বেশিদিন বাঁচবোও না ।” 
  আমার বেশ অস্বস্তি হচ্ছিলো । সৌমিক বললো, “সে কি এরকম করে বলছেন কেন, মাসিমা, মানে...ইয়ে পিসিমা...” সম্বোধনটা কি হওয়া উচিত ঠিক না করতে পেরেই বোধহয় থেমে গেলো । 
   বৃদ্ধা ক্ষীণ হেসে বললেন, “আমাকে তোমরা ঠাকুমা বলে ডাকতে পারো । অনেক বয়স হয়েছে আমার, স্বাভাবিক নিয়মেই মৃত্যুর সময় হয়ে গেছে । শরীরেও নানা জটিল ব্যাধি, আর মাস তিন চার হয়তো বাঁচবো, আমি জানি ।” বেশ নির্বিকার, আত্মস্থ ভাবেই কথাটা বললেন । “আর এই বাড়িটা আমি ঝুলনকে - তোমাদের - দিয়ে যেতে চাই । আমি বেঁচে থাকতেই তোমরা এসো এখানে, মৃত্যুর সময় যেন দূর হলেও রক্তের সম্পর্কের কেউ কাছাকাছি থাকে, এটা আমার ইচ্ছে ।” বোধহয় ক্লান্ত হয়েই চুপ করলেন । 
   আমরা দুজনেই সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে ওঁর দিকে চেয়ে রইলাম । সেই পরিচারিকাটি এসে ওঁকে কি একটা ওষুধ খাইয়ে জল দিলো । মৃদুস্বরে কী একটা বলতে উনি মাথা নাড়লেন, সে চলে গেলো । 
  বাকশক্তি ফিরে পেয়ে আমিই প্রথমে বললাম, “সে কি, আমাদের দেবেন কেন !” সৌমিক বললো, “না না, দেখুন ইয়ে ঠাকুমা, আমারা তো বেশ দূরসম্পর্কের, আপনার নিশ্চয়ই কাছাকাছি আত্মীয়েরা আছেন ।”
“না, নেই । আমার তিন কুলে কেউ নেই, বাছা, এবাড়ি দেওয়ার মতো । আমার মায়েরা শুধু দু-বোন ছিলেন । ত্রিদিবের ভাইয়ের পরিবারকে আমি পছন্দ করি নি কোনোদিন । আর সুবীরকে আমি স্নেহ করতাম ।”
  পরিচারিকাটি একটি বড় ট্রে নিয়ে ঢুকলো । তাতে চায়ের সরঞ্জাম ও পেষ্ট্রি ইত্যাদি । চা ঢেলে কর্ত্রীকে দিলো, তারপর চলে গেলো । রত্নাবলী বললেন, “তোমরা নাও ।...এবাড়িতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না । আমাকে দেখাশোনারও প্রয়োজন হবে না তোমাদের । আমার রাতদিনের দুজন নার্স আছে । আর ওই মঙ্গলাকে তো দেখলে, ওর মা-ও এবাড়িতে কাজ করতো । ... ব্যাঙ্কের টাকাকড়ি সব অনাথাশ্রমে দিয়ে যাচ্ছি । শুধু এই বাড়িটা...তোমরা নিলে শান্তিতে মরতে পারবো । .... খুব বেশি সময় নেই আমার । তোমরা ভাবতে একটা দিন সময় নাও । পরশু দেবেশকে ফোন করে তোমাদের সিদ্ধান্ত জানিও ।” তারপর হঠাৎ বললেন, ”ঝুলন, তোমাকে একেবারে আমার মাসির মতো দেখতে । খুব সুন্দরী ছিলেন মাসি ।”
   সেদিন বাড়ি ফিরে গিয়ে আমরা দুজনে পরিস্হিতিটা নিয়ে অনেক আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে বাড়িটা প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ নেই । রায়বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর বোধহয় বাবা তাঁর নিজস্ব ও ব্যক্তিগত কিছু প্রযোজনীয় জিনিস ও কাগজপত্র কোনোভাবে জোগাড় করতে পেরেছিলেন । সেগুলো উল্টে পাল্টে একটি পুরোনো কালো সাদা ছবি পেলাম । দুটি যুবতী, ও সঙ্গে একটি ছোট্ট বাচ্চা । পিছনে পেনসিলে অস্পস্ট লেখা - “রত্নাবলী, মণিমালা, ত্রিদিব ।” আবছাভাবে মনে পড়লো বাবা একবার বলেছিলেন ওঁর ঠাকুমার নাম ছিলো মণিমালা ।
   অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা ও-বাড়িতে চলে এলাম । দেবেশবাবুই আইনি কাগজপত্র, দলিল, উইল ইত্যাদি সব বুঝিয়ে দিলেন আমাদের । কিছুটা সঙ্কোচ বোধ করছিলাম আমরা । ঠাকুমাই হেসে বললেন, “এরকম ভাবার কোনো যুক্তি নেই ঝুলন । উত্তরাধিকার-সূত্রে সম্পত্তি লাভ করে না মানুষ ? আমার মৃত্যুর পরে হলে এই বাড়ি তোমরা গ্রহণ করতে নিশ্চয়ই - এখন আমি আরো ক’দিনের জন্য বেঁচে আছি এইটুকুই পার্থক্য ।”
   নিজের মৃত্যু সম্বন্ধে এরকম অবিচলিত মানুষ আমি আর কখনো দেখি নি । তবে একটা নিশ্চিত স্থায়ী বাসস্থান লাভ করে আমরা দুজনেই খুব নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম । সৌমিক নিজের ব্যবসায় মন দিলো । আমি অন-লাইন কাজ করতাম কয়েক ঘন্টা । বাকি সময়টা বাড়িটায় ঘুরে বেড়াতাম । কিংবা ঠাকুমার কাছে গিয়ে বসতাম । ওঁর দক্ষ ও নিপুণ সেবিকারা থাকতো । ওদের সঙ্গে আলাদা কথা বলে বুঝেছিলাম যে ঠাকুমা বেশ অসুস্হ - মানে নানা কারণে, এবং বয়সের জন্যও, ওঁর শরীরের আভ্যন্তরীণ অংশগুলি ক্রমশঃ বিকল হয়ে যাচ্ছে । কিছু করার নেই । ওষুধ এবং যত্নে যতোটা স্বস্তিতে রাখা যায় । ডাক্তারেরা নাকি বলেছেন ওঁর এতোদিন বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্য এ অবস্থায় । আর, হাসপাতালে যাবেন না উনি, দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ।
   আমি কাছে গিয়ে বসলে খুশি হতেন উনি । বেশি চলাফেরা করতেন না । হয়তো কথা বলতেন কিছুক্ষণ, আবার চুপ করে থাকতেন । ওঁকে খুব ভালো লেগে গিয়েছিলো আমার, কেমন একটা টান অনুভব করতাম, সে কি রক্তের কোনো দুর্বোধ্য ইঙ্গিতে ? অল্পদিনের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক “তুই” আর “তুমি”তে নেমে এলো । পুরোনো দিনের কথা বলতেন ঠাকুমা, অতীতের একটা আবছায়া জগত আমার মনে জেগে উঠতো, মনে হতো এই বাড়িটা সেই অতীতেরই অংশ, আর আমি তার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি যেন...
...এই বাড়িটা । আস্তে আস্তে বাড়িটার একটা বিচিত্র সত্ত্বা যেন আমার চারপাশে জেগে উঠতে আরম্ভ করলো । প্রথমে আমি বিশেষ কিছু খেয়াল করি নি । দু একটা ব্যাপারে একটু খটকা লেগেছিলো । 
  একদিন মাঝদুপুরে আমি ঠাকুমার কাছে গিয়ে বসেছিলাম । চারধার চুপচাপ । নিচে মঙ্গলাদি ও অন্য কাজের লোকেরা বোধহয় খাওয়াদাওয়ার পর বিশ্রাম করছে । মঙ্গলাদি ছাড়া এবাড়িতে অন্য কাজের লোকেরা রাত্রে থাকে না, শুধু মাধবদা, এবাড়ির পুরোনো ড্রাইভার, থাকে গ্যারেজের উপরের ঘরে । মাথার উপরে পাখাটা আস্তে ঘুরছে, জানলার পর্দাগুলো টেনে দেওয়া । দিনের নার্স আরতিদি কোণের একটা চেয়ারে বসে উল বুনছিলেন, আমি ওঁকে বললাম, “আপনি পাশের ঘরে বিশ্রাম করুন একটু, আমি বসছি এখানে ।” ঠাকুমা বিছানায় আধ-শোওয়া হয়ে ছিলেন, চোখ খুলে আমার দিকে চেয়ে একটু হাসলেন ।
“তোর কাজ হয়ে গেলো ?”
“হুমম...এখনকার মতো । জল খাবে একটু ?”
“নাঃ । এখানে ভালো লাগছে তো তোদের ?”
“হ্যাঁ গো । এ বাড়িটা খুব সুন্দর তো । কতো জায়গা, চমৎকার সাজানো, পুরোনো পুরোনো পরিবেশটা বেশ লাগে আমার, যেন কতো কিছুর সাক্ষী...।”
“এই বাড়িটারও খুব পছন্দ হয়েছে তোকে ।”
ওঁর কথাটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে, ভাবলাম হয়তো শুনতে ভুল করেছি । কিন্তু উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, “যতদিন না তোকে খুঁজে পাওয়া যায়, বাড়িটা আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিলো, বুঝেছিস ঝুলা ।”
আমি ওঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে বললাম, “কি বলছো বুঝতে পারছি না...।”
চোখ বুঁজে বললেন, “এই বাড়িটা...বাড়িটা না চাইলে এটার স্বত্ত্ব কেউ পেতে পারে না...ও সব ঠিক করে...তোর কথা ও-ই তো জানিয়েছিলো আমায়...।” অসংলগ্নভাবে বলে থেমে গেলেন । মনে হলো একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন । আমি চুপ করে বসে রইলাম । নিচে কে একটা দরজা বন্ধ করলো সামান্য শব্দ করে । সামনের রাস্তা দিয়ে ঠুং ঠুং করে একটা ঠেলাগাড়ি চলে গেলো । আমি দেখলাম বৃদ্ধার ঠোঁটদুটি একটু একটু নড়ছে যেন । 
   আমি ভাবলাম, বয়স ও অসুস্হতার কারণে হয়তো কোনো মনোবিকারের ফলে এইরকম বলছেন ঠাকুমা । তা-ও মনে কেমন একটু অস্বস্তি লেগে রইলো । সৌমিককে কিছু বললাম না ।
    ঠাকুমা দোতলায় থাকতেন । আমরা থাকতাম নিচের তলায়, দুতিনটে ঘর নিয়ে, যাতে আমাদের আসা যাওয়ায় ওঁর শান্তিভঙ্গ না হয় । একদিন সকালের দিকে এঘর ওঘর ঘুরে দেখছিলাম । সাবেক আমলের কাঠের কারুকার্যকরা আসবাব সব - আলমারি শেলফ টেবিল চেয়ার আয়নাদেওয়া দেরাজ এই সব । আমাদের শোবার ঘরটা একটু পিছনের দিকে, তার পাশের ঘরটায় অনেকগুলো বইয়ের আলমারি । বইগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ খেয়াল হলো, ওপাশে পিছনের বাগানের দিকে দেওয়ালে একটা সরু দরজা, আগে লক্ষ্য করি নি । ছিটকিনি খুলতেই দেখি, ওমা, কি সুন্দর একটা অর্ধেক-গোল ছোট্ট বারান্দা, লাল পাথর বসানো মেঝে । সামনের গাছপালাগুলো । টগর বেল গন্ধরাজ। এই সব । উঁচু পাঁচিলের ধারে ধারে ঝুপসি মতো বড়ো গাছ । দুতিনটে টিনের চাল দেওয়া শেড্ মতো, তার ওপর কীসব লতা উঠেছে । এদিকটা বেশ একান্ত আর নির্জন । মুখ তুলে দেখে মনে হলো, বারান্দাটা ওপরে ঠাকুমার ঘরের ঠিক নিচেতেই । 
   সেদিন সৌমিক ফিরতে আমি বললাম, “ওদিকে কী সুন্দর একটা বারান্দা আছে জানো ! চলো আজ ওখানে বসে চা খাই ।” সৌমিক বললো, “কই দেখি কোথায় বারান্দা ?”
“এসো, এই তো এঘর দিয়ে....।”
কিন্তু ওকে দেখাতে গিয়ে দরজাটা আর খুঁজে পেলাম না, বারান্দাটাও নয় । অনেক খুঁজলাম । কিরকম গোলমাল লাগছিলো । বেশ মনে ছিলো, পুরোনো ইংরিজি এনসাইক্লোপিডিয়াগুলোর আলমারিটার পাশেই ছিলো দরজাটা, কাঁচের পল-কাটা গোল হাতল, একটা কোণের দিকে । অন্য কোণে একটা জানলা, সেটা দিয়ে উঁকি মেরে কিচ্ছু দেখতে পেলাম না ।
সৌমিক আমার দিকে তাকালো, আমি বললাম, “কিন্তু আমি তো গেলাম বারান্দায়, লাল মেঝে, লোহার রেলিং ছিলো মনে আছে, আর...।” সৌমিক অনিশ্চিতভাবে বললো, “তোমার ভুল হয়েছিলো নিশ্চয়ই, অন্য কোনোদিকে আছে বোধহয় ।”
খাবার ঘরের টেবিলে মঙ্গলাদি চায়ের ট্রে এনে রেখেছিলো । আমি ওকে বারান্দার কথাটা জিজ্ঞেস করতে আমার দিকে কেমন অদ্ভুতভাবে তাকালো, তারপর মাথা নেড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো । 
সন্ধ্যেবেলা ঠাকুমাকে দেখতে গেলাম । এই সময়টা উনি উঠে বসে একটু চলাফেরা করেন । দেখলাম আর্মচেয়ারে বসেছেন, রেডিওতে কী গান হচ্ছে । আরতিদি বোধহয় ওঁর রাতের খাবার আনতে নিচে গেছে । দুএকটা কথা বলে আমি ওঁর জানলায় গিয়ে নিচের দিকে দেখার চেষ্টা করলাম । 
“কী দেখছিস রে ?”
“বারান্দা...সকালে দেখেছিলাম, এখন কোথায় যে গেলো...।” নিজের কানেই কথাটা কিরকম অসঙ্গত ঠেকলো ।
“ওরকম হয় ।” আমি ঠাকুমার দিকে ফিরে দেখি ওঁর মুখে একটা কৌতুকের হাসির আভাস । “কতো কিছু দেখবি । এই বাড়িটা এমন কতো কিছু দেখায় । আগে যেসব ছিলো, এখন নেই । কিংবা...এখন নেই, হয়তো পরে হবে ।”
“এ সব কী বলছো ঠাকুমা ! দেখায় মানে ? এরকম হয় না কি ।” আমার ভয় করলো হঠাৎ ।
“এ বাড়িটার সব মনে থাকে যে । কিচ্ছু ভোলে না । আবার পরে কী হবে তাও জানে ।”
“ভোলে না মানে?”
“এ বাড়িটা...নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু রেখে দেয় । ও না চাইলে কিচ্ছু বদলানো যায় না ।”
“যাঃ, বাড়ির আবার ইচ্ছে কি গো !”
“এ বাড়ি কতো পুরোনো তোর ধারণা নেই রে ঝুলা । শোন, এটা আমার দিদিমার বসতবাড়ি ছিলো । উনি আমার মা-কে দিয়ে গিয়েছিলেন । আর মাসিকে - মানে তোর ঠাকুর্দার মা-কে অন্য একটা বাড়ি দিয়েছিলেন । আমার মা-বাবা এবাড়িতেই থাকতেন ।”
আমি এসে ওঁর পাশে বসলাম ।
উনি বললেন, “দিদিমা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন এটা । তারও আগে এ বাড়িটা অন্যরকম ছিলো শুনেছি কিছুটা ইঁটের, বাকিটা পাথরের, মাটির...এখানে তখন এতো লোকালয় ছিলো না, জঙ্গল, দীঘি...কারা সব থাকতো তখন, কতো কিছু ঘটেছিলো, তাদের ছাপ রয়ে গেছে এখানে, বাড়িটা সব ধরে রেখে দিয়েছে...।” ওঁর গলা ক্রমশঃ যেন হারিয়ে যাচ্ছিলো । আরতিদি ঢুকলেন, হাতের ট্রেতে স্যুপ, সামান্য ভাত, সবজি সিদ্ধ । আমাদের দুজনেরই যেন চমক ভেঙে গেলো । রাত্রের নার্স উমাদি চলে আসবেন এখনই । 
  কিন্তু এর পর থেকে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো আমার । একদিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমার শোবার ঘরের দিকে যাবো, মুহূর্তর জন্য মনে হলো সামনে একটা পাথুরে দেওয়াল, ভিজে ভিজে, শ্যাওলা জমে আছে । তার পরেই আর দেখতে পেলাম না । ঘরে গিয়ে বসে পড়লাম । এ সব কি ! 
আর এক দিন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার হলো ।
   আমাদের শোবার ঘরের ভিতরের কোণের দিকে একটা আয়না টাঙানো ছিলো । বেশ সুন্দর বড়ো গোল আয়না, সূক্ষ্ম কারুকার্যকরা সেকেলে ফ্রেম । আমি ওটাকে সাবধানে নামিয়ে ঝেড়েমুছে ভাবলাম, ঘরের ঠিক বাইরে খানিকটা লাউঞ্জের মতো যে জায়গাটা আছে, সেখানে টাঙিয়ে রাখবো । বেশ আলো আসে ওখানে, ঝকঝক করবে । চমৎকার জিনিসটা ঘরের কোণে রেখে দেবো না । লাউঞ্জের দেওয়ালে একটা হুকে একটা ঝাপসা-মতো কাঁচা হাতে আঁকা নিসর্গচিত্র ছিলো, সেটা নামিয়ে রেখে সেখানে আয়নাটা টাঙিয়ে দিলাম । এদিক ওদিক থেকে দেখলাম । বাঃ, বেশ দেখাচ্ছে । সন্তুষ্ট হয়ে বাইরের ঘরের দিকে গেছি চিঠিপত্র এসেছে কি না দেখতে । কেউ নেই, মঙ্গলাদি বোধহয় স্নান করতে গেছে, অন্য কাজের লোকেরা বেরিয়েছে হয়তো বা পিছনের বাগানে । লেটারবক্সটা খুলেছি, হঠাৎ একটা কিছু ভেঙেপড়ার ঝনঝন শব্দ হলো । চমকে গিয়ে ছুটে ভেতরে এলাম - দেখি আয়নাটা লাউঞ্জের মেঝেতে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে আছে । ইসস । এত সুন্দর পুরোনো জিনিষটা । কি করে হলো কে জানে - হুকটা তো বেশ শক্তপোক্ত ছিলো আর আয়নাটার পিছনের তারটাও...। 
   রান্নাঘরের পিছনের বারান্দা থেকে তাড়াতাড়ি ঝাঁটা বালতি নিয়ে এসে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম । মেঝেতে কাঁচের টুকরোগুলোর চিহ্নমাত্র নেই । কে সরালো, কখন ? কি ভেবে নিজেদের ঘরে গিয়েই সাংঘাতিক চমকে গেলাম । 
   আয়নাটা আগের জায়গায় ঝুলছে, ঠিক যেখানে ছিলো । ওটার কাছে গিয়ে দেখি, কাঁচের ওপর অনেক সূক্ষ্ম চিড় - তারপর পলকের মধ্যে সেগুলো মিলিয়ে গেলো । আগের মতোই মসৃণ । হতভম্ব হয়ে ভাবলাম, সবটাই স্বপ্ন দেখলাম নাকি । তা কি করে হবে । হঠাৎ মনে পড়ে গেলো, ঠাকুমা বলেছিলেন, এ বাড়ি নিজের ইচ্ছেমতো সব কিছু রেখে দেয় । গা ছমছম করে উঠলো কেমন । আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে সেই নামিয়ে রাখা ছবিটা আবার ওটার আগের জায়গায় টাঙিয়ে দিলাম । কিন্তু - ক’দিন আগেই তো একটা ছোট টেবিল ওপাশের ঘরটা থেকে এনে খাটের পাশে রেখেছি আমরা । রাইটিং টেবলটা জানলার সামনে টেনে এনেছি । কিছু হয় নি তো । আবার এটাও মনে পড়লো, একটা শৌখিন পাথরের বাটি ওপরের কোণের ঘর থেকে এনে বাগানের ফুল দিয়ে সাজিয়ে ঠাকুমার ঘরে রেখেছিলাম একদিন । পরের দিন সেটাকে না দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম । ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করতে অল্প একটু হেসেছিলেন শুধু । পরে খেয়াল করেছিলাম যে ফুলদানিটা কোণের ঘরে তাকের ওপরেই রয়েছে, যেখানে ছিলো । ফুলসুদ্ধ । ভেবেছিলাম মঙ্গলাদি বা কেউ হয়তো সরিয়ে রেখেছে । তা হলে কি...
  সৌমিককে কিছু বললাম না । কিন্তু বাড়িটা যেন লুকোচুরি খেলতো আমার সঙ্গে । একদিন বেশ ভয় পেলাম ।
সকাল থেকে সেদিন মেঘ করে রয়েছে । অনলাইনে কিছু কাজ শেষ করে ভাবলাম, ছাদ থেকে একবার ঘুরে আসি । মেঘবৃষ্টি খুব ভালোবাসি আমি । এবাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাবার সময় ছাদটাও দেখিয়েছিলো মঙ্গলাদি । তারপর আর যাওয়া হয়নি । মনে মনে প্ল্যান করছিলাম টবে করে ফুলের চারা বসাবো ওখানে । 
  দোতলায় উঠেই ডানদিকের বড়ো ঘরটা ঠাকুমার, পাশেই সেবিকাদের ঘর । প্যাসেজটার দুদিকে আরো কয়েকটা ঘর, শেষে ডানদিকের একটা দরজা খুললে দুদিকে দুটো স্টোররুম মতো আর সামনের দরজাটা খুললেই ছাদে যাবার সিঁড়ি । আমি ঠাকুমার সঙ্গে একটু কথা-টথা বলে প্যাসেজে বেরিয়ে এলাম । দুদিকের দেওয়ালে ছবি, ফটো, সেকেলে আলো । অন্যমনস্ক ভাবে ছাদে কী ফুল লাগাবো ভাবতে ভাবতে ডানদিকের শেষ দরজাটা খুললাম । তারপরেই কেমন চমকে গেলাম । সামনে কোনো দরজা নেই তো । প্যাসেজটা সোজা অনেকটা চলে গেছে । স্টোররুম দুটো আছে কিন্তু তারপরেই দুদিকে আরো ঘরের সারি । বাঁদিকের দেওয়ালে কার যেন একটা বাঁধানো পুরোনো ঝাপসা ফটো ছিলো আমার মনে আছে, সেটা রয়েছে, কিন্তু এই লম্বা প্যাসেজটা ছিলো না তো... । ভুল দরজা খুললাম না কি । পিছন ফিরে দেখলাম - কই না, এটাই তো ছাদে যাবার পথটা । আর এই প্যাসেজটা আগে কক্ষণো দেখি নি । মেঝেটা একটু এবড়োখেবড়ো পাথরের, খুব ঠাণ্ডা । দেওয়ালটাও তাই...একটা ময়লা-মতো আলো কোত্থেকে আসছে বুঝতে পারছি না । আস্তে আস্তে এগোলাম । দুদিকের দেওয়ালে কি বিচিত্র সব মুখোশ ঝুলছে, নারীপুরুষের । ঘরের দরজাগুলো বন্ধ, চেষ্টা করেও খুলতে পারলাম না । কেন জানি মনে হলো ভিতরে কারা সব আছে যেন । খুব ক্ষীণ ভাবে একটা গানের সুর কানে আসছে । ”কালো জলে কুচলা তলে ডুবলো সনাতন...আজ সাড়া নেই কাল সাড়া নেই পাইনে দরশন...।” কোনোরকম বললাম, “...ক্ কে ? কে ওখানে !” নিজের গলাটাই কেমন যেন বিকৃত লাগলো । সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলো । আমি আরো খানিকটা এগিয়ে দেখি প্যাসেজটা ডানদিকে বেঁকে আরো কতদূর চলে গেছে যেন ।দেয়ালের মুখোশগুলো আরো অদ্ভুত, আকারে আরো বড়ো । বাঁকের মুখে একটা লম্বাটে কালো মুখোশ, মণিহীন চোখ, খুব চওড়া ঠোঁটের ফাঁকে অজস্র দাঁতের সারি । 
   একটা প্রবল ভয় আমায় আচ্ছন্ন করে ফেললো । পিছন ফিরতেই মনে হলো একটা ঘরের দরজা থেকে মুখোমুখি ঘরের দরজার মধ্যে দিয়ে কে যেন ছায়ার মতো সরে গেলো...আমি প্রায় দৌড়ে বেরোবার দরজা অবধি যেতে যেতে সেই গানের আবছা সুর শুনলাম পিছনে - “যমুনাতে ফুল ফুটেছে নীলকালো আর সাদা, কোন ফুলেতে কৃষ্ণ আছেন কোন ফুলেতে রাধা...।” আমি স্টোররুমগুলোর কাছে পৌঁছে সামনের দরজাটা হাতল ঘুরিয়ে দ্রুত খুলে ফেলে দোতলার প্যাসেজে এসে পড়লাম । দেয়াল ধরে দাঁড়ালাম, মাথাটা ঝিমঝিম করছিলো কেমন । 
দেখি ঠাকুমার ঘর থেকে মঙ্গলাদি বেরোচ্ছে, আমায় দেখে থমকে গেলো, তারপর এগিয়ে এলো । 
“কি হয়েছে, দিদি ?” আমায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলো ।
“আমি, আমি ছাদে যাচ্ছিলাম, কিন্তু...।”
“ছাদে যাবে ? এই তো দরজা ।” হাত বাড়িয়ে খুলে দিলো । দুদিকে স্টোররুম, তার সামনের দরজাটা খুললো, ছাদে যাবার সিঁড়ি । স্পস্ট । আর কিচ্ছু নেই । কোনো লম্বা প্যাসেজ নেই ।
“কিন্তু, আমি যে দেখলাম, মঙ্গলাদি...আর কে যেন গান গাইছিলো...।”
“ওসব কিছু না । অমন হয় । এসো আমার সঙ্গে ।” আমায় ছাদে নিয়ে গেলো । “বিষ্টি আসছে, বেশিক্ষণ থেকো না । আমি যাই, রাজ্যির কাজ পড়ে আছে ।” আমি আর কিছু বলার আগেই নেমে চলে গেলো । আমি আলসের ধারে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম । একটু একটু হাওয়া দিচ্ছে এলোমেলো । আশ্চর্যভাবে অনুভব করলাম আমার আতঙ্কটা যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে । কপালে টুপ করে একটা ঠাণ্ডা জলের ফোঁটা পড়লো । টিপটিপ বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে । কি ভেবে ছাদের একদিকে সরে গিয়ে নিচে ঝুঁকে দেখলাম । এটা ঠাকুমার ঘরের ঠিক ওপরে । সেই লাল বারান্দাটা দেখা যাচ্ছে । কিন্তু আমি জানি নিচে গেলে ওটাকে খুঁজে পাবো না । 
আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঠাকুমার ঘরে ওঁর কাছে গিয়ে বসলাম । আরতিদি বললেন, “তুমি বসো একটু, আমি ওঁর নিয়ে আসি । খাবেন তো দুচামচ স্টু আর দুটুকরো ফল, তুমি একটু বোঝাও দিকি...।” ঠাকুমার শরীর সত্যিই উত্তরোত্তর দুর্বল হচ্ছে ।
আরতিদি চলে গেলে ঠাকুমা বললেন, “মঙ্গলা বললো তুই ভয় পেয়েছিলি নাকি । কি হয়েছিলো ?”
আমি একটু ইতঃস্তত করে বললাম । সবটা মন দিয়ে শুনে ঠাকুমা হাসলেন, সেই ক্ষীণ কৌতুকের হাসি । মঙ্গলাদির মতোই বললেন, “ও কিছু না রে ঝুলা, অমন হয় ।”
“কিন্তু...।”
“ এ বাড়িটা এই সব দেখায় মাঝে মাঝে, তোকে বলি নি ? ভয় পাবার কি আছে । বাড়িটা...তোর কিনা, তাই ও সব দেখতে পাস । শোন, এ বাড়িটা তোর কোনো ক্ষতি করবে না, তোদের কোনো ক্ষতি হতেও দেবে না । রক্ষা করবে তোদের । এটা মনে রাখিস ।”
আমি বললাম, “কিন্তু...আজ যেগুলো দেখলাম, সেসব কি কখনো সম্ভব না কি ? তুমি বলেছিলে, আগে যেমন ছিলো, আবার পরে যেমন হতে পারে, সে রকম দেখায় ?”
“ঝুলা, অস্তিত্ব কী শুধু একরকম হয় রে ? কতো মাত্রা আছে বাস্তবে । এ বাড়িতে কতো রকম মানুষ বাস করে গেছে কতো প্রাচীন সময় থেকে । তাদের মনের জগতের ছাপও যে থেকে গেছে এখানে । কারো কারো চিন্তা খুব - কি বলবো - জোরালো হয় - সেটা থেকে যায় তাদের শারীরিক মৃত্যুর পরেও । এ বাড়িটা সব জমিয়ে রেখে দেয় রে । উপযুক্ত কাউকে পেলে, যেমন তুই - সে সব দেখায় ।”
“ছায়াছবির মতো ?”
“কিছুটা । তবে - এক দিক দিয়ে সত্য । ধরে নে আর এক বাস্তব । আর এক মাত্রা । তবে, নাতজামাইকে হয়তো না বলাই ভালো । আমার মনে হয় ও দেখতে পাবে না ও সব ।”
আমি চুপ করে রইলাম । ঠাকুমা একটু পরে বললেন, “আমি আর বেশিদিন থাকবো না । ...না না, অমন করিস না । অনেকদিন ধরে তৈরি আছি । আমার মা আমায় নিজে এসে নিয়ে যাবেন । আমি অল্পবয়সে বিধবা হয়েছিলাম তো, মা’র ভারি কষ্ট ছিলো সেজন্য, কাঁদতেন, বলতেন আমার মেয়েটা বঞ্চিত হয়ে রইলো সারাজীবন । মারা যাবার সময় বলেছিলেন, মরেও শান্তি পাবো না মা, তোকে নিয়ে যাবো সময় হলেই ।”
“ঠাকুমা, এরকম কথা বোলো না তো, তোমার কিচ্ছু হয় নি তেমন ।”
“...তুই এসেছিস, আমার দায়িত্ব শেষ, বাড়িটাও আমায় ছেড়ে দেবে এবার, মুক্তি পাবো । আমার এই চেনটা পরে থাকিস গলায় ।” 
ঠাকুমা চোখ বন্ধ করলেন । আরতিদি ঘরে ঢুকতে আমি বললাম, “আজ আমি খাইয়ে দিচ্ছি ।”
ওঁর শরীর ক্রমশঃ আরো খারাপ হতে থাকলো । সেদিন সকাল থেকে ঝড়বৃষ্টি । ঠাকুমা দুদিন ধরেই ঘোরের মধ্যে । ডাক্তার শুধু মাথা নেড়ে বললেন, “কিছু করার নেই, মনে হয় আজকালের মধ্যেই...।” আমি আর সৌমিক সারাদিন ওঁর কাছে কাছেই রইলাম । খুব মন খারাপ লাগছিলো আমার । রাত্রের জন্য আরেকজন নার্সকে রাখা হলো । আমি ঠিক করলাম ঠাকুমার পাশেই থাকবো আজ ।
  রাত বাড়ছে । মঙ্গলাদি দরজার বাইরে মেঝেয় শুয়ে আছে । নার্স দুজনে পালা করে কাছে এসে ঠাকুমার নাড়ি প্রেশার ইত্যাদি দেখছে । কী একটা ইঞ্জেকশান দিলো । সব চুপচাপ । মৃদু আলোয় আমি ওঁর স্তব্ধ মুখের দিকে চেয়ে আছি । অনেক গহনে কী কোথাও চেতনা আছে ওঁর ! কী চলছে সেখানে ? আমার কেমন একটা আচ্ছন্নতা এলো । এলোমেলো দৃশ্য দেখছি তন্দ্রার মধ্যে । এই বাড়িটা...একটু অন্যরকম যেন...একটি ছোট্ট মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, লম্বা ফ্রক পরা...একটি কিশোরী, ডুরে শাড়ি, বেড়া-বিনুনী আর নোলক পরে, সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামছে, পায়ে মল, তারপরে সে নববধূর বেশে...দৃশ্য পাল্টে গেলো, বিধবার বেশে এক সদ্যোতরুণী, তীব্র একটা কষ্ট...তার পরে আরো গভীরে স্বপ্নের মধ্যে জেগে উঠি আমি । সিঁড়ির ওপরটায় দাঁড়িয়ে আছি আমি, কোলে একটি ছোট্ট শিশু, সে চিৎকার করে কাঁদছে । ওর গলায় একটা সরু চেন । ইস এতো রাত্রে এতো কাঁদছে, সবাই উঠে পড়বে তো, আর বাইরে কী ঝমঝম বৃষ্টি, ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে নামছি আমি । কে যেন সদর দরজায় কড়া নাড়ছে অধৈর্য ভাবে, আমি দরজা খুলে দিই, বৃষ্টির মধ্যে এক মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে, আকুল আগ্রহে উনি দুহাত বাড়িয়ে শিশুটিকে কোলে নেন । কান্না থেমে যায় । শুধু বৃষ্টির শব্দ । বৃষ্টি, বৃষ্টি...আর বিদ্যুৎ...কেউ কোথাও নেই...
    চমকে ঘোর কেটে যায় । উমাদি আমার কাঁধে হাত রেখে ডাকছেন আমায় । সোজা হয়ে বসতে উনি আমায় ঠাকুমার দিকে দেখান । কোমল কণ্ঠে বিষণ্ণ ভাবে বলেন, “চলে গেছেন । ডাক্তারকে ফোন করা হচ্ছে, কিন্তু...।” আমি মনে মনে বলি, “জানি তো । আমিই তো এগিয়ে দিলাম...।” মঙ্গলাদি ঘরে ঢোকে । আমি আচ্ছন্নতা কাটিয়ে উঠে সৌমিককে ডাকতে যাই ।
    বেশ কিছুদিন কেটে গেছে । ঠাকুমা চলে যাওয়ার পর জীবন আবার নিয়মিত ছন্দে ফিরে এসেছে । মঙ্গলাদি ও মাধবদা - পুরোনো কাজের লোকেরা - আমাদের অনুরোধে থেকে গিয়েছে । সৌমিকের ব্যবসা ভালো চলছে, ওর পার্টনার মানে শুভেন্দুদা দুজনেই প্রচণ্ড ব্যস্ত । আমি এখন পুরো সময় অনলাইনে কাজ করছি, মাঝে মাঝে অফিসে যেতে হয় । সবই ঠিক আছে । আর বাড়িটা...হ্যাঁ, ঠিকই আছে । শুধু কখনো কখনো দু-একটা অবাস্তবের ঝলক দেখায় আমায়, যেন খেলাচ্ছলে । আমি ঠাকুমার কথা মনে করি - সব মনে থাকে ওর । যা হয়েছে, যা হবে, যা হতে পারতো, অচেনা কারো মনের গোপন ছবি...। চেনা কোনো দরজা খুলে হয়তো দেখি অচেনা কোনো ঘর, মাঝরাতে অনুভব করি কারা যেন মৃদু পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে, নিস্তব্ধ দুপুরে কী একটা গানের সুর কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেসে আসে ছাদের দিক থেকে...“কোন ফুলেতে কৃষ্ণ আছেন কোন ফুলেতে রাধা”...
সৌমিককে কিছু বলি না ।
  সেদিন আমায় সকালে আমাদের অফিসে একটু যেতে হবে । সৌমিক ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরিয়ে গেছে । শিবুদি, বাড়ির মোটা কাজের সহায়িকা ছুটি নিয়েছে । মাধবদা দেশে গেছে কয়েকদিনের জন্যে । মঙ্গলাদি বাজারে যাওয়ার আগে আমায় বলে গেছে, “দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যেও গো দিদি, আমার কাছে চাবি আছে ।” আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম । রাস্তা দিয়ে খানিকটা গিয়ে একটা বাসস্টপ আছে, পৌনে দশটা আন্দাজ যে বাসটা পাওয়া যায় সেটা ধরে আমার অফিস অবধি সোজা পৌঁছানো যায় । খুব সুবিধে । আমি ব্যাগে ল্যাপটপ ইত্যাদি গুছিয়ে নিয়ে ফোনটা নিয়ে দোতলা থেকে নেমে সদর দরজার দিকে এগোলাম । বাসটা মিস না হয়ে যায়, তাহলে...
সদর দরজাটা কোথায় ?
  কি রকম হচ্ছে ব্যাপারটা ! এই তো বসার ঘরটা, তার সামনে একটুখানি জায়গা, জুতোর র়্যাক, গোল আয়না, ফুলদানিতে হলদে ডালিয়া ... ওপরে অর্ধবৃত্তে লালনীল কাঁচ বসানো দরজাটা তো এখানেই থাকার কথা...কোথায় গেলো ? পিছনে ঘুরে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সিঁড়িটার কাছে ফিরে গেলাম, সবকিছু তো আগেরই মতো, শুধু সদর দরজাটা কোত্থাও নেই । কি ভেবে দৌড়ে গিয়ে বাড়ির পিছনের দরজাটার ছিটকিনি নামিয়ে খুলতেই দেখি....
...দরজাটার ওদিকটাতে আরেকটা বাড়ি, ঠিক এই বাড়িটার নকল, শুধু উলটো । সেই বাড়িটাতে আমি ঘুরে বেড়াই, তারও সদর দরজা খুঁজে পাই না, ফিরে আসি নিজের বাড়ি, কোথাও দরজাটা নেই... কতোটা সময় কাটে কে জানে !       
  সিঁড়ির নিচে মুখ হাঁটুতে গুঁজে বসেছিলাম । দরজাতে চাবির আওয়াজ শুনে মুখ তুলে উঠে দাঁড়ালাম । সদর দরজা খুলে মঙ্গলাদি ঢুকছে, হাতে বাজারের ব্যাগ । আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললো, “ওমা দিদি তুমি বেরোও নি ! আমি তাই চিন্তা করছিলুম...কী কাণ্ড হয়েছে জানো, ওই যে বাসটা তুমি ধরো মাঝে মাঝে....আরেকটা বাসের সঙ্গে ধাক্কা মেরেছে গো, ওই শিবমন্দিরটার সামনে, কাঁচ ভেঙে তুবড়ে একাকার, মানুষও মরেছে, কতো লোককে হাসপাতালে নিয়ে গেছে...ইস যদি তুমি ধরতে গো ওটা...।” রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো । শুনলাম পিছনের দরজা খুলে বাইরে গেলো ।
  আমি সেদিন আর বেরোই নি । কি রকম যেন লাগছিলো । সারা দিন ধরে অনেক ভেবেও ব্যাপারটা যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারলাম না । বাড়িটা আমায় বেরোতে দেয় নি । রক্ষা করেছিলো । অজান্তেই গলার সরু চেনটা ছুঁলাম ।

ঠাকুমা বলেছিলেন, এ বাড়িটা তোদের কোনো ক্ষতি হতে দেবে  না।












website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments