Header Ads Widget

আত্মা

আত্মা Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)





#গল্প 


হ্যাঁ, আত্মা তো আছেই । আমাদের শরীরের ভেতরেও আত্মা আছে আবার শরীর ছাড়াও আত্মা আছে অনেক । আমদের বিষয় ওই সব কায়াহীন অশরীরী আত্মা, আর আমার বিশ্বাস ওরা আছেই। এবং আছে বলেই হয়তো মাঝে মাঝেই এমন সব কান্ড ঘটে যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনা। বিশ্বাস হচ্ছে না তো ? আচ্ছা আপনার দরজাটাতো খোলাই ছিল হঠাৎ বন্ধ হলো কি করে ? মনে হয় নি কখনো ? কিংবা মধ্যরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঘুম ভাঙ্গতেই কোথাও কিছু নেই, এমন হয়েছে কখনো ? হয়নি ? অসম্ভব ! হয় আপনার ঘুম ভীষণ গভীর, কিছুই বলতে পারেন না, নয়তো আপনি খুব ভাগ্যবান । ভালো করে লক্ষ্য করুন আপনার ঠিক ঘাড়ের পাশেই গরম শ্বাস অনুভব করছেন কিনা ? না, ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই আপনার কোন ক্ষতি করবে না। যদি করার হতো তাহলে এতদিনে বুঝতে পারতেন। তবে সাবধানের মার নেই ! অযথা ওদেরকে বিরক্ত করবেন না অবশ্যই ।
আত্মা আছে কি এই নিয়ে বড় বড় শহরে অনেক কর্ম কান্ড চলছে । একদল ভুত পাগল লোক তো পাঁজি পুঁথি ঘেঁটে রাত্রিবেলা বেরিয়ে পড়েন ভুত ভুতনীর খোঁজে। এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে দেখেন কোথায় কারা আছেন । সঙ্গে থাকে রকমারি যন্ত্রপাতি । বিশেষ বিশেষ ক্যামেরাও আছে যাতে আবছা হলেও স্পষ্ট বোঝা যায় কেউ একজন আছেই। ওরা বলেন ঘোস্ট ওয়াক। আর ওদের ভাগ্যটাও তেমনি, কোন না কোন সময় ঠিক দেখা হয় যায়।
তা যাক ওসব বড় বড় মানুষদের কথা । আমার বিষয়টা হচ্ছে অন্য । আমি অতি সাদাসিধে ভুত বিশ্বাসী লোক । কখনোই সেচ্ছায় ওদের ক্ষেপাই না, ওরাও জেন্টেলম্যান এগ্রিমেন্টের মতো আমার কোন ক্ষতি কোনদিন করেনি । আর সত্যি বলতে কি বাপের দেওয়া একটাই প্রাণ বেঘোরে হারানোর একদমই ইচ্ছে আমার নেই । দুই একবার না জেনেই ফাঁদে পা দিয়ে দিয়েছিলাম অবশ্যই কিন্তু বরাত জোরে জোর বেঁচে গেছি। এবার ভাবছি নিজের অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা আর কিছু শোনা গল্প পরিচিত মহলে, সবার সাথে শেয়ার করবো যার কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই । বিশ্বাস করা না করা আপনাদের, তবে আমি বিশ্বাস করি । গল্পের স্বার্থে নামের দুই একটা অক্ষর একটু এদিক ওদিক হলেও যারা গল্পগুলো জানেন তারা ঠিক নিজেদের চিনে নিতে পারেন, আমার বিশ্বাস । 

 উপালির সাথে আমার মানে আমাদের পরিবারের পরিচয় প্রায় দুই দশক। একটু কম বেশি হতে পারে, তা কিন্তু আমাদের পারিবারিক আত্মিক সম্পর্ক অল্পদিনেই অনেকটাই ঘনিষ্ঠ। ওর সুবাদেই ওর মা বাবার সাথে পরিচয়, তারপর‌ বাড়িতে যাওয়া আসা। আমরা মেসো, মাসীমা ডাকতাম ওরাও আমাদের ঠিক ওভাবেই স্নেহ করতেন । মেসো একটু মেজাজী ছিলেন যদিও, তবে খুব আড্ডাবাজ লোক ছিলেন এই কথাটা সত্যি । কাপড় চোপড় টানটান ইস্ত্রি দেওয়া, আর সাদা । ময়লা কাপড়ে তার প্রচন্ড এলার্জি । সহজেই লোকের সাথে মিশতে পারেন । দেখা হলে নিজে থেকেই খোঁজ খবর নিতেন সবার । খুব বেশি চলা ফেরা করতে পারতেন না, শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন । মাঝে মাঝেই বাড়াবাড়ি হতো। অনেকেই অনেক ভাবে বুঝিয়েছে কিন্তু কিছুতেই সিগারেট ছাড়তে পারতেন না। আমিও অনেক বার বলেছি কিন্তু ওই একটা জায়গাতে একদম অনঢ়। আর একটা বিষয়ে মনের মধ্যে কষ্ট ছিল, মেয়েটাকে মন মতো পাত্রস্থ করতে পারছিলেন না । যখন‌ই দেখা হতো কথা প্রসঙ্গে প্রসঙ্গটি যথারীতি আলোচনায় আসতো। আমরা বুঝতাম তার মনে একটা কষ্ট কাঁটার মতো গেঁথে আছে। 
শিলচর যতদিন ছিলেন, দেখা সাক্ষাৎ হতো, তারপর কলকাতায় চলে যেতেই যোগাযোগ একটু কমে যায় কিন্তু যোগাযোগ ছিল। আমরা ভেবেছিলাম ব্যস্ত শহরে এই বয়সে মানিয়ে নেওয়া ওর পক্ষে হয়তো খুব কষ্ট হবে, কিন্তু দেখা গেল খুব অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। কমপেক্সে অনেকগুলো ফ্ল্যাট বাড়ি। গেট পেরিয়েই ভিতরে এক পাশে সাজানো বাগান, অন্য পাশে একটা বড় পুকুর, আসলে ফিশারী । দুই জায়গাতেই বয়স্কদের বসার জন্যে জায়গা তৈরি করে রাখা। কলকাতায় আসার পর মেসো প্রায়‌দিন‌ই এখানে এসে বসতেন, বিশেষ করে ফিশারীর দিকটাতে । ওখানে বসে বসে সিগারেট খেতেন আর জলে মুড়ি ফেলে মাছের সাথে খেলা করতেন । চেনা লোক পাশ দিয়ে গেলে রক্ষা নেই । ডেকে খোঁজ খবর নেওয়া তার নিত্যদিনের কাজ । খেলা থেকে রাজনীতি, বাজার থেকে রান্নাঘর যার যে বিষয় প্রিয় ওই বিষয় নিয়েই আড্ডা চলতো ঘন্টাখানেক। আর অবসরে পরিবারের লোকজন এড়িয়ে চুটিয়ে চলতো সিগারেট। 
সেই মেসো যখন মারা গেলেন তখন ছিল মার্চ মাস। ইচ্ছে থাকলেও তক্ষুণি আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন সব কাজ শেষ, প্রায় বছর ঘুরতে চললো।
কমপ্লেক্সের গেটে এন্ট্রি করতে হয়। নাম ঠিকানা লিখছি, দারোয়ানটা জিজ্ঞেস করল, স্যার কোথা থেকে আসছেন।
বললাম, আসাম।
-- আমাদের কাকাও তো আসামেই থাকতেন, তাই না ?
দারোয়ানটা গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে চাইছে । আজকাল কার কি উদ্দেশ্য বলা যায় না। ভালো করে আপাদমস্তক দেখে বললাম, হ্যাঁ । তোমার বাড়ি কোথায় ?
-- নিলাম বাজার স্যার ।
-- ওঃ তাই বলো । তুমি তাহলে আমাদের ওদিকার‌ই লোক ?
একগাল হেসে বললো, কাকা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। উনি চলে যাবার পর বাড়িটাই কেমন যেন হয়ে গেছে।
পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ভালোই হলো, তুমি তো আমাদের ওদিককার‌ই লোক। একটু খেয়াল রেখো। আর আমার নম্বর তো এখানে লিখে দিয়েছি যদি প্রয়োজন হয় ফোন করে জানিও কিন্তু । আমি কেন যেন খুব ক্যাজুয়েল মন থেকেই কাজটা করেছিলাম, সত্যি সত্যিই যে প্রয়োজন পড়তে পারে আমার ধারণাতেই ছিল না ।
ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলাম সবাই যেন কেমন একটা বিধ্বস্ত হয়ে আছে। সবাই বলতে উপালি আর মাসীমা। বাড়িতে তো তৃতীয় কোন ব্যাক্তিই নেই । দুজনেই খুব চুপচাপ । মুখে খুব বেশি কথা নেই । আমি যাওয়াতে কতটা খুশি হলো বুঝতে পারলাম না । মেসোর ঘরটাতে টেবিলে সুন্দর করে ফটোটা সাজানো, সামনেই একটা ছোট্ট সুন্দর কৌটা । পাশেই একটা ফুলদানিতে কিছু তাজা ফুল। একটা সাদা সার্ট আর একটা ট্রাউজার হেঙ্গারে ঝুলছে। বিছানা চাদর থেকে টেবিল ক্লথ সব ধবধবে সাদা, টানটান করে পাতা। মেসো সাদা রঙ খুব পছন্দ করতেন। কাপড় চোপড়ের ব্যাপারে খুব সিলেকটিভ ছিলেন । যেদিন থেকে পরিচয় সেদিন থেকেই সব সময়ে ওকে সাদা কাপড়েই দেখেছি। তাও ইস্ত্রি করা কাপড়। হেঙ্গারে টাঙানো কাপড়গুলোও দেখলাম টানটান ইস্ত্রি করা। আসলে মানুষ চলে যায়, যারা থেকে যায় তাদের ভীষণ কষ্ট। প্রিয় মানুষটির এই স্মৃতি গুলো আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে চায়। মেসোর ঘরটাতে ঢুকতে যাবো, নাকে এলো কড়া তামাকের গন্ধ । যেন একটু আগেই এখানে কেউ সিগারেট খেয়েছে। পাশেই এস্ট্রেতে আধপোড়া সিগারেট। আমার খুব অবাক লাগলো, এখানে কে সিগারেট খেতে পারে ।
ঘরে ঢুকতে যাবো, উপালি পেছন থেকে আমার হালকা ভাবে আমার হাত টেনে ধরলো। মনে হলো, ও চাইছে না আমি ওই কোঠার ভেতরে যাই। আমি আর ভিতরে যাইনি। দরজাতে দাঁড়িয়েই ফটোতে প্রণাম দিলাম।
 সেদিন অনেকটা সময় থেকেছি, কিন্তু কোথায় যেন ছন্দ পতন ঘটে গেছে, প্রাণ নেই। আমার এতদিন পরে আসাই কি কারণ ? হয়তো আরো আগেই আসা উচিত ছিল, কিন্তু সব চাওয়া তো সব সময়ে সম্ভব হয় না । সবচেয়ে আশ্চর্য লাগলো, এই যে আমি এতদূর থেকে গেলাম, ওরা কিন্তু আমাকে একবার‌ও থেকে যেতে বলেনি বা নিদেনপক্ষে এই ভর দুপুরে খাওয়ার কথাটা পর্যন্ত বললো না। অবাক লাগলো আমার। 
ফেরার পথে দেখলাম সেই দারোয়ানটি তখন‌ও গেটে পাহারা দিচ্ছে। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। বললাম, চলি ।
-- আছেন তো কিছুদিন ?
বললাম, আপাতত এই সপ্তাহ ।
-- তাহলে আবার আসবেন স্যার । কেউ এলে ওদের মনটা ভালো থাকবে ।
বললাম, দেখি ।
সেবার আর সময় করে উঠতে পারিনি। তাছাড়া আজকের এই ঠান্ডা ব্যবহারের পর মনটাও নষ্ট হয়ে গেছে । যাওয়ার তাগিদটাই হারিয়ে ফেলেছি । আমার আর যাওয়া হলো না ওদের ওখানে, তার আগেই আমি ফিরে এসেছি শিলচর।
দিন পনেরো পর হঠাৎ একদিন একটা ফোন। বললাম, কে বলছো ?
-- আমি রিয়াদ স্যার, কলকাতা থেকে বলছি।
-- কে রিয়াদ ? ওই নামে তো আমি কাউকে চিনি না ।
-- আমি সানরাইজ এপার্টমেন্ট থেকে বলছি স্যার, রিয়াদ । সেই যে দাড়োয়ান -- আপনার সাথে পরিচয় হয়েছিল।
সানরাইজ এপার্টমেন্ট বলতেই সব মনে পড়ে গেল। বললাম, হ্যাঁ এবার চিনতে পেরেছি, বল - ।
-- আপনি কি চলে গেছেন স্যার ?
বললাম, হ্যাঁ, কেন বলতো ?
-- তাহলে থাক স্যার ।
বললাম, থাকবে কেন ? বল কোন কাজ ছিল কি ?
-- না, যদি কলকাতা থাকতেন, তাহলে বলতাম একবার আসতে ।
-- কেন ? কিছু হয়েছি নাকি ?
-- হ্যাঁ, কিছু তো একটা হয়েছে স্যার অনেকদিন ধরেই , কয়েকদিনের জন্য ওদেরকে যদি অন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতেন --।
বললাম, আমি তো বলেছিলাম কিন্তু একবছর না হলে ওরা তো কোথাও যাবেন না বলেছেন।
-- এক বছর তো হয়ে গেছে স্যার ।
বুঝলাম, কিছু তো একটা হয়েছে। ন‌ইলে যেচে কেউ এভাবে ফোন করতো না । আমার এক বন্ধু থাকে কলকাতায়, ওদের ওখানে নয়, অনেকটাই দূর তবু তাকেই বললাম, একটু খোঁজ খবর নিয়ে জানাতে। শিলচরে বসে এর চেয়ে বেশি আমি কি আর করতে পারি।
তারপর কেটে গেছে চার পাঁচ দিন। আমি প্রায় ভুলতেই বলেছি। হঠাৎই বন্ধুর ফোন এলো। যা শুনলাম রীতিমত ভয়াবহ। উপালি নাকি আজকাল স্বাভাবিক ব্যবহার করছে না।‌‌ অধিকাংশ সময়েই ঘরের মধ্যে থাকে । শুধু রোজ একবার উল্টো দিকের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আনে। বাড়িতে দুজন মাত্র মহিলা, সিগারেট যে কে খায় ঈশ্বর‌ই জানেন ।‌ আরো একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, মেসো মারা গেছেন একবছরের উপর হতে চলো, কিন্তু এখনো রোজ নিয়ম করে ধোপাবাড়ি থেকে উনার কাপড় ধুইয়ে আনা হয়। প্রায়‌ই ওদের ঘর থেকে অদ্ভুত‌ সব শব্দ শোনা যায়। ফ্ল্যাটের লোকেদের ধারণা কিছু একটা সমস্যা আছে ওখানটায়।
এমন সব কথা শুনলে কার না ভাবনা হয় । বললাম, আমি তো দুমাস পর এমনিতেই আসছি । এই মুহুর্তে আসাটা কি খুব জরুরী ?
 -- হ্যাঁ, এলে ভালো হয় স্যার।
এরপর আর কোন কথা চলে না । নেকস্ট এভেইলেবল ডেটেই টিকিট কেটে নিলাম। একবার রিয়াদকে ফোন করা প্রয়োজন। দুবার ফোন করেও সেই রাত্রে যোগাযোগ করা গেল না । পাওয়া গেল পরদিন সকালে । প্রথমে কিছু বলতে চাইছিল না । তারপর যা বললো, সেটা শোনে গায়ে কাটা দেবার অবস্থা। বললে, উপালিদিদি আগেও দু'বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল, আপনি যাবার পর এই কদিন আগে আবার । বরাট জোরে বেঁচে গেছেন। আমি তো চোখে চোখে রাখি । সোসাইটিতেও খুব আলোচনা হচ্ছে । ওরা থানায় খবর দিয়েছে। পুলিশ এসেছিল ।
বললাম, সেদিন বললে না কেন ? তখন‌ তখনই কিছু একটা ব্যবস্থা নিতাম ।
 বললে, প্রথম দেখাতেই কি ওভাবে বলা যায় স্যার ? একবার কষ্ট করে আসুন, নিজের চোখে দেখে যা ভালো মনে হবে একটা ব্যবস্থা নিন । 
বললাম, আমি আসছি, কয়েকদিনের মধ্যেই। এই কটা দিন একটু খেয়াল রেখো ।

এবার হোটেলে না গিয়ে সোজা ওদের ফ্ল্যাটেই উঠবো, মনস্থির করেছি । ভাইজাকে আমার কিছু কাজ ছিল, সেখান থেকে সরাসরি কলকাতা পৌঁছেছি তখন রাত্রি সাতটা দশ । সানরাইজ এপার্টমেন্টে যেতে যেতে আরো আধ ঘন্টা সময় লেগে গেল । গেটে যথারীতি রিয়াদ দাঁড়িয়ে । এগিয়ে এসে বললে, দিন স্যার আমি পৌঁছে দিচ্ছি ।
বললাম, তার আগে ব্যাপারখানা কি বলো ?
রিয়াদ কোন উত্তর দিল না, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে র‌ইল চুপচাপ ।
বললাম, তোমার ফোন পেয়ে এতদূর ছুটে এলাম অথচ এখন তোমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোচ্ছে না কেন ?
-- স্যার আমি বললে আপনি তো বিশ্বাস করবেন না, তাই --
-- বিশ্বাস যোগ্য হলে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবো, তুমি নিঃসংকোচে বলো --
রিয়াদ খুব ইতস্তত বোধ করছে বুঝতে পারছি । নিজের মুখে প্রথমেই না বলে বললে, আমি বলি স্যার, আপনি দুই তিন দিন এখানে থাকুন, নিজের চোখে সব কিছু দেখুন, তারপর না হয় বসে কথা বলি ।
-- কিন্তু কি দেখতে হবে মানে লক্ষ্য করতে হবে তার একটা হিন্টসতো দেবে --
-- সব কিছুই দেখবেন স্যার ।একটু চোখ কান খোলা রাখবেন, তবেই হবে। দিন আপনার স্যুটকেশ আমি পৌঁছে দিচ্ছি ।
আমাকে কোন সুযোগ না দিয়েই রিয়াদ আমার লাগেজ তুলে নিল হাতে । হালকা একটা স্যুটকেশ, আমি নিজেই নিয়ে যেতে পারতাম তবু ওর আগ্রহে আপত্তি করলাম না।
গেট ছেড়ে সবে এপার্টমেন্টের দিকে এগুচ্ছি হঠাৎই পিছন থেকে খুব চেনা গলায় কেউ যেন ডেকে উঠলো, দেবপম --
চমকে উঠলাম, কে ডাকলো আমায় । মনে হলো ওপাশের পুকুরের পার থেকে কেউ ডেকেছে আমাকে । গলাটা খুব চেনা ! মেসো নয় তো ? কি করে সম্ভব ? মুহুর্তে সারা শরীরে একটা শিহরণ উঠলো । একসাথে অনেক গুলো প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করছে । তবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফিরে তাকাতে যাচ্ছি, রিয়াদ একঝটকায় আমার হাত চেপে ধরলো । বললে, একদম‌ই পেছনে তাকাবেন না স্যার । সোজা এগিয়ে চলুন ।
আমি প্রচন্ড শক্ড । ওকে যে ফিরিয়ে প্রশ্ন করবো 'কেন' সেই সৎ সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছি । বাকিটা পথ মাথা নুইয়ে চলে এলাম । মুখে কোন শব্দ নেই দুজনের । যেন বাতাস এসে থমকে গেছে এখানটায় ।
উপালিদের দরজায় স্যুটকেশ নামিয়ে দিয়ে রিয়াদ নিঃশব্দে চলে গেল । মুখে কিছুই বললো না। ওকে দেখে মনে হলো না কিছু হয়েছে । মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন, এইটা কি কোন ষড়যন্ত্র ? কার হতে পারে, কি তার উদ্দেশ্য ? আমার মধ্য থেকে একটা কাঁটা খচখচ করছে ।

দরজা খুলে মাসীমা ভীষণ অবাক । কোন প্রকার খবর না জানিয়ে এসেছি । বললাম, কয়েকদিন থাকবো ।
-- বেশ তো বাবা থাক না কিছুদিন, তোমার নিজের‌ই তো বাড়ি ।
উপালি ততক্ষণে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে । বললাম, ব্যাগটা কোথায় রাখি বলতো ?
উপালি এক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বললেন, ওটা তুমি আমার ঘরেই রেখে দাও ।
-- আর তুই ?
উপালি হাসলো । বললে, কেন ? ভাই বোন একঘরে থাকা যায় না ? তারপর নিজে থেকেই বললে, দাও, আমার কাছে, আমি নিয়ে যাচ্ছি ।

হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হতে মিনিট দশেক । ফিরে এসে দেখি চা তৈরি । আড়চোখে দেখলাম এককাপ চা মেসোর ফটোর সামনেও দেওয়া হয়েছে । এই প্রাকটিশটা আমি আমার কলকাতায় মাসতুতো বোনদের বাড়িতেও দেখেছি । ওরা দিনের প্রথম খাবারটা মেসোমশাইএর ফটোর সামনে দিয়ে তারপর খায় । আসলে এইসব ছোটখাটো কাজগুলোর মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে আঁকড়ে ধরার প্রচেষ্টা ।
উপালি হাতে একটা থলি নিয়ে বেড়োবে যাচ্ছিল । বললাম, আজ রাতে শুধু ডাল আর ডিম ওমলেট খাবো ।

রাতে খাওয়া শেষ হলে উপালিকে বললাম, চল একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি । 
আসলে রোজকার অভ্যাস, ভাত খাওয়ার পর একটা সিগারেট খেতে খুব ইচ্ছে হয় । ছাদের একটা কোনে দাঁড়িয়ে আছি । সামনেই সদর রাস্তা । একপাশে গোছানো বাগান, অন্য পাশে একটা বড় পুকুর । আসলে ওটা একটা ফিশারী, তবে লোকে ওটাকে পুকুর বলেই জানে । দুপাশেই সুন্দর বসার ব্যবস্থা করা । পুকুর পাড়ের ওদিকটা মেসোর খুব প্রিয় । বিকেলবেলা সময় সুযোগ পেলেই একটা বেঞ্চে গিয়ে বসতেন । উপালিকে দেখলাম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওই পুকুরটার দিকে ।
দুজনেই ছাদে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ কারো সাথে কারো কথা নেই , শ্মশানের নিস্তব্ধতা । নীচে পায়রার খোঁপগুলো থেকে টেলিভিশনের বিচিত্র সব আওয়াজ । দূরে ঝিঝি পোকাদের বিরক্তিকর দল বেধেঁ ডানা নাড়ার শব্দ । ওকে একটু সময় দিলাম নিজের মধ্যে হারিয়ে যেতে । এই অবসরে নিজেকেও খানিকটা গুছিয়ে নিলাম ।
দেখতে দেখতে দুই দুইটা সিগারেট শেষ । কি দিয়ে শুরু করা যায় ভাবছি । উপালিও কেমন যেন চুপ করে গেছে । পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বললাম, কি রে কিছু বলবি ?
-- তুমি আজকাল অনেক বেশি সিগারেট গাও ।
-- কেন ? তুই খাস না ?
-- ছিঃ দাদা --
-- তাই ? তাহলে রোজ রোজ কার জন্যে সিগারেট কিনিস ?
উপালি চমকে উঠলো । বললে, তোমাকে কে বললে ?
-- সে দিয়ে তুই কি করবি ? কথাটা মিথ্যে কিনা বল ?
উপালি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে । আমি বুঝতে পারছিলাম এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ওর পক্ষে অস্বস্তিকর । নিজের প্যাকেটটা আলতো করে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, নিবি ?
উপালি প্রচন্ড লজ্জায় আমার পাশ থেকে ছিটকে সরে গেল । বললে, না, না, দাদা, বিশ্বাস করো, আমি খাই না ।
-- লজ্জা করিস না --
এবার একটু বিরক্ত হয়েই বললে, বললাম তো আমি খাই না ।
-- তাহলে রোজ রোজ কার জন্যে সিগারেট কিনিস ?
উপালি আবার চুপ করে যায় । আলতো করে পিঠে হাত রেখে বললাম, আমাকে খুলে বল্ । তোদের জন্যেই আমার এতদূর ছুটে আসা ।
-- তোমাকে নিশ্চয়‌ই সোসাইটি থেকে ফোন করেছে ।
-- না রে, রিয়াদ ফোন করেছিল ।
-- ওহ, রিয়াদা, ছেলেটা সত্যি ভালো । ওর জন্যেই আমি দুই দুই বার প্রাণে বেঁচে গেছি ।
বললাম, শুনেছি । কিন্তু কেন এসব করিস বলতো ? তোর কিসের অভাব ? একবার‌ও মাসীমার কথা মনে আসে না তোর ?
-- আমি তো ইচ্ছে করে করি না দাদা, বাবা আমাকে ডাকে যে !
খুব বিরক্ত লাগলো । বললাম, আজেবাজে কথা বলিস না ।
-- সত্যি দাদা, বিশ্বাস করো । উপালির গলার একটা অদ্ভুত‌ আকুলতা । আমার দিকে ফিরে দাঁড়াতেই দেখি ওর দুচোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল ঝরছে । একটা অসহায় মুখ । খুব মায়া হলো, মুখে কথা সরছিল না ।
একটু সময় নিয়ে বললাম, স্যরি, মনে কিছু নিস না । আসলে তোর কথাগুলো আমি বিশ্বাস করলেও অন্য কেউই বিশ্বাস করবে না ।
-- কেন রিয়াদা নিজের চোখে দেখেছে । এবার আমার চমকে ওঠার পালা । মুহুর্তে মনে পড়ে গেল গেটের সেই ঘটনা । শিঁউড়ে উঠলাম । তাহলে আমি ঠিক‌ই শুনেছি । কাল সকালেই একবার রিয়াদের সাথে কথা বলতে হবে । উপালিকে কি বলি বুঝতে পারছি না । চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি ।
উপালি নিজে থেকেই বললে, চলো নিচে যাই । মা একা ।
-- এক মিনিট, তুই ঠিক ঠিক মেসোকে দেখেছিস ? না মানে ভুল‌ও তো হতে পারে ।
-- দেখেছি, তবে স্পষ্ট নয় ।
বললাম, তাহলে ? কোথাও ভুল‌ও তো হতে পারে , তাই না ? তাছাড়া দোষ তো তোদের‌-ই, যে চলে গেছে, তাকে যেতে দিতে হয় । এভাবে যে সকাল থেকে খাবার দেওয়া, রোজ রোজ কাপড় চোপড় ধুইয়ে দেওয়া -- এসব যত বেশি করবি ততই মনের উপর চাপ সৃষ্টি হবে । এখন থেকে ওসব বন্ধ কর ।
-- বন্ধ করলেই ভীষণ উৎপাত শুরু হয়ে যায় ।
-- বাজে কথা, ওসব মনের দুর্বলতা ।
-- না, দাদা, সত্যি ।
বললাম, যেমন --
-- সে তুমি বুঝবে না । চল, নিচে যাওয়া যাক ।

এই ধরনের সমস্যা কোনদিন নিজে মোকাবিলা করিনি । কাউকে যে বলবো, বিশ্বাস করবে না কেউ । অথচ যা দেখছি, সব কিছুই ধোঁয়াশা । নিচে নেমে এলাম ।
উপালিকে দেখলাম এক প্যাকেট সিগারেট আর একটা দিয়াশলাই মেসোর ফটোর পাশে রেখে দিল । পাশেই রাখা এস্ট্রেটা আরো একবার পরিস্কার করে দিল । তারপর আস্তে করে দরজা টেনে দিল ঘরে ।
আমাকে দেওয়া হয়েছে উপালির ঘরে থাকতে । মাসীমার ঘরে উপালি আর মাসীমা এক‌ই বিছানায় । যে যার ঘরে চলে এসেছি । আমি শুয়ে আছি বিছানায় । কিছুতেই ঘুম আসছে না চোখে । এখানে আসার পর যা কিছু দেখছি, শুনছি তার কোন কিছুর‌ই ব্যাখ্যা পাই না । ভেতরে ভেতরে অযথাই অশান্তি । শুধু শুধু একটা ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে । কিছুতেই ঘুম আসছে না । পাশের ঘরে উপালিদের কোন সাড়া শব্দ নেই । বোধ হয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে । হঠাৎই একটা দুর্বুদ্ধি মাথায় এলো । নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম । উপালিদের ঘরের দরজা ভেজানো । কোন সাড়া শব্দ নেই । এখন‌ই সময় । আমি পা টিপে টিপে মেসোর ঘরে দরজা খুলে ভিতরে গেলাম । আমাকে বুঝতে হবে আসল রহস্যটা কি ?
খুব গোছানো ঘর, টিপটপ, ফিটফাট । ঘরে তাজা ফুলের গন্ধ । একটা সাদা পাট ভাঙ্গা সার্ট আর পাজামা হেঙ্গারে ঝুলানো । ফটোটা জ্বলজ্বল করছিল, যেন আমাকেই লক্ষ্য করছে । একবার চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলাম, তাকানো যাচ্ছিল না । ফটোর সামনেই একটা সুন্দর কাঁচের কৌটা, ভেতরে সাদা সাদা কি সব জিনিস । হাতে নিয়ে দেখলাম মুখটা মোম দিয়ে সীল করে রাখা ।একটু যেমন কেমন কেমন লাগলো । খুলতে গিয়েও খুললাম না, জায়গাতেই রেখে দিলাম । আসার সময়ে কি মনে হতেই টেবিলে রাখা সিগারেট প্যাকেট আর দিয়াশলাইটি পকেটে পুরে নিলাম । 
সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই । রাত তখন কটা বলতে পারবো না । হঠাৎই মনে হলো কেউ যেন আমাকে ডাকছে ।
-- আমার সিগারেট, দেবপম আমার সিগারেট -- । চমকে উঠলাম। মনে হলো কেউ যেন আমাকে গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকছে । আমি স্পষ্ট একটা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করছিলাম । ভয়ে ভয়ে চোখ খুলতেই রক্তে একটা ঠান্ডা বিদ্যুৎ বয়ে গেল । চোখ খুলে তাকাতে পারছিলাম না ভয়ে । আমার ঠিক গা ঘেঁষে উনি কে ?সাদা সার্ট, সাদা ট্রাউজার -- একটা ধোঁয়াশে চেহারা -- মেসো নয় তো ? হাতে পায়ে শক্তি চলে গেছে । বুক শুকিয়ে কাঠ । ঘুম নিমেষে উধাও । এক মুহুর্তে ভেবে নিলাম কি করা উচিত । এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিলাম অনেক দূরে । নিরাপদ দূরত্বে এসে চোখ খুলে দেখি কোথাও কিচ্ছু নেই । সবটাই মনের ভুল । মনে মনে হাসলাম, দুঃস্বপ্ন ।
এক গ্লাস জল খেয়ে আবার বিছানায় শুতে যাবো, ঠিক তখুনি মেসোর ঘর থেকে জোরে একটা আওয়াজ এলো । মনে হলো কিছু একটা পড়ে ভেঙ্গে গেছে। ছুটে বেরিয়ে এলাম বাইরে । মেসোর ঘরের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই উপালি মাসীমা দুজনেই এসে হাজির । ওরাও শব্দটা শুনতে পেয়েছে । উপালির মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে । আমি দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই উপালি হাত টেনে ধরলো । বললাম, ভয় পাস নে, আমাকে একটু দেখতে দে ।
এক ঝটকায় দরজা খুলে দিতেই অবাক কান্ড কোথাও কেউ নেই । শুধু টেবিলের ফুলদানিটা মাটিতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে আছে । ঘরের ভেতরটা ভালো করে আরো একবার দেখলাম । হেঙ্গারে ঝুলানো সার্ট কাপড় মাটিতে, বাকি সব ঠিক ঠাক । জানালায় পর্দা সরিয়ে দেখতেই নজরে এলো একটা পাট খোলা । মনে মনে হাসলাম, শুধু শুধু ভয় পেয়েছি । বললাম, দেখলি তো, জানলার পাট খোলা, বিড়াল বা কিছু হয়তো ঢুকে ছিল ঘরে, আর তোরা শুধু শুধু -- ।
বললাম, যা শুয়ে থাক । কাল সকাল বেলা কাঁচের টুকরো গুলো পরিষ্কার করে নিস। ঘর থেকে বেড়িয়ে দরজা টানতে যাবো, হঠাৎই টেবিল থেকে এস্ট্রেটা উড়ে এসে পায়ের কাছে পড়লো । এবার কিন্তু সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম । অল্পের জন্যে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো । প্রচন্ড প্রচন্ড ভয় লাগলো । পা দুটো যেন পাথর হয়ে গেছে । টেনে সরাতে পারছি না । মাসীমা সঙ্গে সঙ্গেই ঝাড়ু আনতে ছুটলেন । উপালি চিৎকার করে উঠলো, বাবার সিগারেট ।
ভয়ে, লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিলে যাবার অবস্থা । আমার জন্যেই এই এতসব কান্ড । না বলে সিগারেট প্যাকেট পকেটে ঢোকানো তো চুরির পর্যায়ে পরে । উপালির দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না । পকেটে থেকে আলতো করে সিগারেট প্যাকেট আর দিয়াশলাইটি বাড়িয়ে দিলাম । উপালি তাড়াতাড়ি আরো একটা ফুলদানি এনে সাজিয়ে দিল টেবিলে । একটা নতুন এস্ট্রেও এনে রাখা হলো, সাথে সিগারেট আর দিয়াশলাই । বুঝলাম এই ধরনের ঘটনা আরো অনেকবার ঘটেছে তাই সব বন্দোবস্ত আগে থেকেই করে রাখা । দরজা টেনে যে যার ঘরে ফিরে গেলাম । সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি সেদিন । ভোর রাতে হয়তো একটু চোখ লেগেছিল । ঘুম ভাঙ্গলো উপালির ডাকে ।চোখ খুলে দেখি ও চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ওকে বসতে বলে, একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম । ফিরে এসে দেখি বিছানা তোলা শেষ । 
আমাকে চা ধরিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল উপালি । বললাম, একটু বস ।
-- কিছু বলবে ?
-- হ্যাঁ, কালকের ঘটনাটির জন্যে আমি সত্যি লজ্জিত রে । আমি বুঝতেই পারিনি এমন একটা কিছু --- ।
উপালি হাতের ইশারায় আমাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে বললে, আমি বুঝতে পারছি দাদা, প্লিজ ।

মনে মনে একটা ছক তৈরি করে নিয়েছি । একবার বাজারে যেতে হবে । রিয়াদের সাথেও একবার বসা দরকার । প্রয়োজনে বন্ধুকেও ডাকতে হতে পারে । আপাতত বাজারে যাবো মনস্থির করে কাপড় জামা পড়ছি এমন সময়ে একটা অজানা নম্বর থেকে ফোন । 
কথা এগুতেই বোঝা গেল, সোসাইটির সেক্রেটারী । একবার কথা বলতে চান । বললাম, বিকেলে বসি ।
-- এখন কি খুব অসুবিধা হবে ? আমরা বেশ কয়েকজন ছিলাম --
বললাম, বেশ, দশ মিনিট । 
উপালিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম সেক্রেটারীর ফ্ল্যাটটি কোথায় ।
-- তোমাকে ডেকেছে ?
বললাম, হ্যাঁ ।
-- কেন ? উপালির চোখে মুখে উৎকন্ঠা ।
-- জানি না রে । দেখি কি বলে ।

সেক্রেটারী, প্রেসিডেন্ট সবার সাথেই কথা হলো । ভালো কথা কেউই বললেন না । ওদের ধারণা উপালি মানসিক ভাবে অসুস্থ । ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটাই কথা, 'ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিন ।
মিনিট ত্রিশ ধরে এক‌ই কথা বারবার শুনতে শুনতে বললাম, দেখুন আমি রক্তের সম্পর্কে ওদের কেউ ন‌ই কিন্তু নিজের ছেলে বা ভাইএর মতো ওরা আমাকে দেখেন, তাই বুঝতেই পারছেন শেষ কথা বলার আমি কেউ ন‌ই । তবে আমার তরফে যতটুকু দেখার আমি দেখবো ।
সোসাইটি থেকে জানিয়ে দিলেন ওরা কোন দায়িত্ব নিতে পারবেন না । মনে মনে হাসলাম, কতটা দায়িত্ব ওরা পালন করছেন সেতো বোঝাই যাচ্ছে । বেরিয়ে এলাম।

বাজারে যাবো ভেবেই বেরিয়ে ছিলাম, গেটের রিয়াদের সাথে দেখা হয়ে গেল। বললাম, তোমার সাথে আমার কিছু কাজ ছিল যে । কখন ফ্রি থাকো, মানে ডিইটি থাকে না ?
-- এইতো এখন‌ই অবসর আছি স্যার , বিকেলে চাইলে বিকেলে --
বললাম, বেশ তো চল কোথাও বসা যাক । একটু নিরিবিলি হলেই ভালো ।
--- পুকুরের ওদিকটায় বসবেন ? যেখানে কাকু বসতেন ? জায়গাটা খুব সুন্দর, আপনার ভালো লাগবে স্যার ।
বললাম, বেশ চলো ।
দুজনেই এসে বসলাম সেই বেঞ্চটার পাশেই আরো একটা বেঞ্চে । বেশ খানিকটা সময় নীরবেই কাটলো । সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে । বললাম, নাও --
-- না স্যার --
-- আহা লজ্জা পাচ্ছ কেন ? খাও --
রিয়াদ খুব সংকোচে একটা সিগারেট তুলে নিল । আগুন দিতে দিতে বললাম, তোমার কি মনে হয় ?
-- কি স্যার ?
-- এই যে এতসব ঘটছে --
রিয়াদ একটু সময় চুপ করে থাকলো । তারপর নিজে থেকেই বললো, আমার মনে হয় এটা ওই সব স্যার ।
বললাম, ওইসবটা কি খুলে বলবে তো ?
-- কাকুর জিন, আপনারা বলেন আত্মা ।
-- তুমি দেখেছো কখনো ?
-- দেখেছি স্যার ।
-- কি দেখেছো ?
তারপর রিয়াদ যা বললো, আমার সাধারণ বুদ্ধিতে তার কোন ব্যাখ্যা নেই । আমি রীতিমত হতভম্ব । এই সব ঘটনা কেন ঘটে, কি তার মোটিভ সত্যি বোঝা মুশকিল । সাধারণ ভাবে যা বুঝি হয়তো সবটাই ভুল । আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি দেখেছো ? তখন রিয়াদ বলল, তাহলে স্যার শুরু থেকেই বলি ?
বললাম, বলো ।
-- প্রথম প্রথম দিদিকে দেখতাম স্যার বিকেলের দিকে এখানটায় এসে বসতো । ওই যে বেঞ্চটা, যেখানে কাকু বসতেন ঠিক ওখানটায় । একা একা বসে থাকতো, কখনো নিজে নিজেই বিড়বিড় করে কথা বলতো, কখনো গুনগুন করে গান গাইতো, আমি দূর থেকে দেখতাম । সন্ধ্যে অবধি বসে নিজের খেয়ালেই ফিরে যেত ঘরে । বাপ মরা মেয়েটা, বুঝতেই পারছেন স্যার -- এখানে তো কোন আত্মীয় স্বজন নেই যার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারে, তাই হয়তো একা একা এখানে এসে বসতো । আমার হাতে ওই সময়ে কাজ খুব থাকে । সময় পেলে আমিও গিয়ে পাশে বসতাম, তখন খুব সুন্দর গল্প করতো দিদি । একদিন একা গেটে ডিউটি দিচ্ছি, সময়টা সন্ধ্যে হয় বা হয়ে গেছে, আপনি আসার মাস তিনেক আগে, দেখতেই পাচ্ছেন আমার ওখান থেকে এই জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে । দেখলাম দিদি ওই জায়গাটায় বসে আছে ।
রিয়াদ আঙ্গুল তুলে সেই বেঞ্চটা দেখিয়ে দিল । বললাম, বেশ --
-- আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দিদি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পুকুরের দিকে, আমি দেখছি, দিদি এগিয়ে যাচ্ছে, তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা প্রচন্ড শব্দ হলো জলে । আমি ছুটে গিয়ে দেখি দিদি জলে ডুবে যাচ্ছে । সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপ দিলাম। তারপর অনেক কষ্টে তুলে আনলাম দিদিকে । ততক্ষণে লোক জানাজানি হয়ে গেছে, অনেক লোক পাড়ে এসে জড়ো ।সবাই জানতে চায় কি ঘটেছিল । আমি ইচ্ছে করেই চেপে গেলাম সত্যিটা । বললাম, অন্ধকারে পা ফসকে গেছে । লোকেও তাই বিশ্বাস করলো । আমি কিন্তু সাবধান হয়ে গেলাম । আমি জানি এসব মানসিক রোগ, একবার যখন চেষ্টা করেছে তখন আবারো করবে । আবার, আবার যতক্ষণ না সফল হয়। আমি তাই দিদি এদিকটায় এলেই নানা অছিলায় আশেপাশে ঘোরাফেরা করতাম । আসলে কাকু আমাকে খুব স্নেহ করতেন । 
বললাম, তারপর --
-- একদিন কি একটা কাজে একটু অন্য দিকে গেছি আর সেদিনই আবার সেই কান্ড । চারদিকে চিৎকার চেচামেচি শুরু হয়ে গেছে । সবাই তো সাঁতার কাটতে জানে না । ছুটে গেলাম । জলে ঝাঁপিয়ে তুলে নিয়ে এলাম দিদিকে । আর ঠিক যখন ঘাট থেকে দিদিকে তুলে নিয়ে আমি উঠছি, আল্লা কশম, এই দেখুন আমার সব লোম এখন‌ও খাঁড়া হয়ে গেছে, আমি স্পষ্ট দেখলাম কাকু প্রচন্ড রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন যেন খুন করে ফেলবেন । স্যার, আপনি বিশ্বাস করবেন না আমি দুই রাত্রি চোখ বন্ধ করতে পারিনি । আমি সত্যি সত্যিই দেখেছি ।
বললাম, তারপর ?
-- তারপর পরদিন দিদির ফ্ল্যাটে গিয়ে আচ্ছা বকাঝকা করলাম । কাকীকে ও বললাম, ওকে বেড়োতে না দিতে । আমি জানতাম দিদি সিগারেট খায় । প্রতিদিন তাই এক প্যাকেট সিগারেট কিনতে বেড়োতে হয় । বললাম, এখন থেকে তোমার বাইরে যাওয়া বন্ধ । তোমার বাজার থেকে সিগারেট সব আমি এনে দেব । দিতাম‌ও স্যার রোজ নিয়ম করে ।
বললাম, তারপর ?
-- তারপর একদিন বাজার হাট করে দিয়ে মুর্শিদাবাদ গেছি নিজের একটা কাজে । সব মিলিয়ে দুই দিন ছুটি । যেদিন সকাল বেলা ফিরে আসার কথা কাজ শেষ না হওয়ায় আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেল । আমি সবে ফিরেছি, গেটে দিদির সাথে দেখা । বুঝে গেছি দিদি সিগারেট আনতে যাচ্ছে । বললাম, দাও আমি এনে দিচ্ছি ।
দিদি বললে, থাক, লাগবে না। আমি তো এসেই গেছি । তুমি বরং কাল থেকে আবার এনে দিও । 
আমি আর গা করলাম না । দিদি যখন ফিরে যাচ্ছে -- ঠিক আপনাকে যে জায়গাতে গতকাল হাত টেনে ধরেছিলাম ঠিক ওখানে আসতেই কে যেন পিছন থেকে ডাকলো, " বুড়ি ---"
আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি । গলাটা খুব চেনা । দিদি চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালো । আর তার পর‌ই আচ্ছন্নের মতো হাঁটতে লাগলো ওই পুকুরটার ওদিকে । আমি ওইদিকে ফিরতেই দেখি বেঞ্চের উপর সাদা ধবধবে সার্ট কাপড় পড়ে কাকু বসে আছে । আর ধীরে ধীরে দিদি ওইদিকেই যাচ্ছে । আমারও প্রচন্ড ভয় করছিল । কিন্তু কী একটা শক্তির জোরে আমি ছুটে গেলাম আমি নিজেও জানি না । পেছন থেকে হাতটা টেনে ধরতেই দিদি দাঁড়িয়ে গেল । সামনে তাকিয়ে দেখি ওখানটাতে কেউ নেই । পরপর এসব ঘটনার পর আমার ধীরে ধীরে সাহস এসে গেছে । এখন আর আমি ভয় পাই না । এইতো গতবার আপনি যাবার পর আরো একবার চেষ্টা করেছিল । তারপর‌ই তো সোসাইটি থেকে তোড়জোড় শুরু হয়েছে, থানা পুলিশ কত কি । তবে ওদের জন্যে সত্যি ভাবনা হয় স্যার । 
আমি কোন উত্তর দিলাম না । রিয়াদ নিজে থেকেই বলতে লাগলো -- এখন আমি প্রায়‌ই দেখতে পাই । আমাকেও ডাকে, উত্তর দিই না । তিন তিনবার ডাকে, সাড়া না দিলে ওইদিন আর বিরক্ত করে না । আমি পরীক্ষা করে দেখেছি । আপনাকেও তো ডেকেছিল , মনে আছে ?
কি জবাব দিই রিয়াদকে । চুপচাপ আরো একপ্রস্থ সিগারেট জ্বালিয়ে বললাম, তুমি এ













website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments