দেওয়ালের মুখ Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
অনেক চেষ্টা করেও বদলিটা আটকাতে পারলো না পল্লব। এক বছরের জন্য জব্বলপুর যেতে হবে। সকলের মন খারাপ হয় গেলো। কিন্তু অফিসের আদেশ অমান্য করার উপায় নেই। সবার মন আরও বেশি খারাপ হয় গেলো ছোট্ট নাতি রনির জন্য। দাদু, ঠাকুমা তাকে চোখে হারায়। তবু চোখের জল ফেলে তিন বছরের নাতিকে বিদায় জানাতে হলো তাঁদের। ছেলেকে নিয়ে পল্লবের সাথে চলে এলো মেঘা জব্বলপুরে। পল্লব ফোনে যোগাযোগ করে আগে থেকেই একটা বাড়ি ঠিক করে রেখেছিলো। সেখানেই উঠলো ওরা। আসবাবপত্র দু তিন দিনের মধ্যেই চলে এলো সব। এবার সেই ভয়ঙ্কর কাজ টা শুরু হলো। ঘর গোছানোর কাজ। পল্লব কে পরদিনই অফিস ছুটতে হলো। তাই মেঘা একা হাতে বাড়ির কাজ এবং ছেলে দুজনকেই সামলাতে লাগলো।
বাড়িটা বেশ ভালো। বড় বড় ঘর। বড় একটা জমি ড্রয়িং রুমের ঠিক পাশে। সেখানে মেঘা বেশ কিছু সবজি এবং ফুল গাছ লাগিয়ে ফেলেছে। রনিও বল খেলার একটা মনের মতো জায়গা পেয়েছে। রবিবার করে কর্তা গিন্নি সকালের জলখাবার আর বিকেলের চা পর্ব বাগানেই সারে। ভালোই সময় কাটতে লাগলো মেঘার। যদিও মাঝে মাঝে নতুন জায়গায় একা লাগে। আসলে বাড়ি থেকে দূরে এসে থাকা মেঘার এই প্রথম। সকালে বাড়ির কাজকর্ম করতে হয় আর বিকেলে রনিকে নিয়ম করে পড়তে বসাতে হয়। এখানকার একটা প্লে স্কুলে ভর্তি করেছে রনি কে। সেই রুটিন মাফিক পড়াশোনা করায় মেঘা। সেদিন পড়া পারেনি বলে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো ছেলেকে। অনেক্ষন কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর নিষ্কৃতি দিয়েছিলো। রাতে ঘুমোনোর সময় মেঘা দেখলো ছেলের কান তখনো লাল হয় আছে। এবার মায়ের মনে ব্যথা লাগলো। কষ্ট হলো ছেলের জন্য। বেচারা খুব কেঁদেছে আজ। কানে ভালো করে হাত বুলিয়ে আদর করলো। তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো। গালে লোশন লাগাতে লাগাতে আনমনে ঘরের দেওয়ালে দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতে লাগলো। পল্লব মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ মেঘার মনে হলো আঁকিবুকি কেটে দেওয়ালে যেন একটা মুখ তৈরি হলো। অবিকল মানুষের মতো। মুখটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এবার ভ্রু দুটো এমন ভাবে বেঁকিয়ে ঠোঁট টা ফোলালো যেন মনে খুব দুঃখ হয়েছে। যেমন মেঘার. হয়েছিল রনি কে দেখে। কিন্তু দেওয়ালে মুখ! এ ও কি সম্ভব? পল্লবকে ডাকার জন্য মুখ ফেরাতেই, দেওয়ালের অবয়ব টা হারিয়ে গেলো। মেঘা ভালো করে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো। নাঃ, কোনো আঁকিবুঁকির চিহ্ন নেই দেওয়াল টায়। ওকি কল্পনা করছিলো এতক্ষন? তাই হয়তো হবে। আলো নিবিয়ে শুয়ে পরলো।
এরপর আবার সব কিছু আগের মতো চলতে লাগলো। আগের ঘটনার কথা ভুলেই গেলো মেঘা। জব্বলপুর জায়গাটা খুব সুন্দর। পাহাড়, ঝর্ণা, নদীর সংমিশ্রণ।এখানে মার্বেল রক, ধুঁয়াধার ফলস, ভেদাঘাট সব ঘুরে দেখলো ওরা। ওদের বাড়ির কাছাকাছি একটা জায়গা আছে যেখানে মাসে একবার করে হস্তশিল্প মেলা বসে। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা বলেছে যে সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর ঘর সাজানোর সামগ্রী পাওয়া যায়। পল্লব আর মেঘা ঘুরে ঘুরে সেখান থেকে পছন্দসই কিছু জিনিসপত্র কিনলো।দুটো বেতের চেয়ার, একটা সৌখিন আয়না, কিছু সুগন্ধি মোমবাতি ইত্যাদি। বাগানে বেতের চেয়ার গুলো বেশ মানানসই লাগলো। আয়নাটা রাখলো শোবার ঘরের দেওয়ালে। বাকি জিনিস গুলো এক এক করে সাজিয়ে রাখলো ঘরের বিভিন্ন জায়গায়। দুপুরে বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম সেরে খাওয়া দাওয়া করে ভাবলো এবার একটা ভাত ঘুম দেওয়া যাক। রনি তো অনেক আগেই গভীর ঘুমের দেশে আর পল্লব ও এখন অফিসের কাজে ব্যস্ত। তাই ঘুমটাই এখন একমাত্র সময় কাটানোর উপায়। শোবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেলো। রনি রোজকার মতো দেওয়ালের দিকে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আর দেওয়াল থেকে একটা মুখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ রকমের ঘাবড়ে যায় মেঘা। চুপচাপ দূর থেকে দৃশ্য টা দেখে ও। নাঃ মুখ টা কোনো ক্ষতি করছে না রনির। কেবল দেখে যাচ্ছে। মেঘা এবার এগোল। খাটের কাছে আসতেই মুখটা মেঘার দিকে ফিরে একগাল হেসে হারিয়ে গেলো। মেঘা এবারে একটু থতমত খেলো। আগের দিন মুখটাকে দেখে ও ভেবেছিলো চোখের ভুল। কিন্তু বার বার চোখের ভুল তো হয় না। ভাবলো পল্লব আসলে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করবে। রনি কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলো। রাতে পল্লবকে আজকের অভিজ্ঞতার কথা জানালো।
"তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে মেঘা? " বলেই পল্লব হাসিতে ফেটে পরলো।
"আমি সত্যি সত্যি মুখটা দেখেছি দেওয়ালে। তুমি বিশ্বাস করো।" কাতর কণ্ঠে বললো মেঘা।
"তুমি কি টিভি তে নিশ্চয় কোনো থ্রিলার দেখছো আর নিজের মনে এসব কল্পনা করছো। এর থেকে নাচ গানের অনুষ্ঠান দেখো। মন ভালো থাকবে। এসব অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা আসবে না। "
মেঘার মনটা খারাপ হয় গেলো। পল্লব কে ও বিশ্বাস করাতে পারলো না। তারপর ভাবলো পল্লব বিশ্বাস করবেই বা কি করে। মেঘা যদি নিজে না দেখতো, লোকের মুখে শুনলে ওর নিজের ও বিশ্বাস হতো না হয়তো। তাই পল্লব কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। মনে তবু খুঁতখুঁতে ভাব টা রয়ে গেলো। দেওয়ালে ওটা কি ছিল?
পরদিন নিত্য কাজে ব্যস্ত হয় গেলো সে। কিন্তু আজ শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে। রান্না বান্না শেষ করে, ঘরের কাজ খানিকটা ফেলে রেখেই বিছানায় এসে বসলো। গা টা গরম গরম লাগছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। খাটে বসে দেওয়ালে মাথাটা এলিয়ে দিলো। কেমন একটা ঘোর মতো লাগছে। মাথা যন্ত্রনা করছে।এমন সময় মনে হলো যেন কারোর হাত মাথা স্পর্শ করলো। হাত টা আস্তে আস্তে ওর মাথা টিপে দিচ্ছে। বেশ আরাম বোধ হচ্ছিলো। ভাবলো একবার তাকিয়ে দেখে। কিন্তু এতো আরাম লাগছিলো যে তাকানো হলো না। কখন যেন ঘুমিয়ে পরলো মেঘা। ঘুম ভাঙলো ফোনের শব্দে। পাশের বাড়ির শর্মা ভাবি ফোন করেছে। রনি স্কুল থেকে এসে অনেক্ষন ধরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বেচারা ছোট বলে ডোর বেল অবধি হাত পৌঁছায় না। উনি ছাদ থেকে এতক্ষন দেখছিলেন। শেষে ঘরে এসে মেঘা কে ফোন করেন। মেঘা তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে রনিকে ঘরে ঢোকায়। ছেলেটা ভয় পেয়ে গেছে মা দরজা খুলছে না দেখে। মেঘা ঠিক করলো এবার থেকে বাইরে একটা টুল রেখে দেবে। যাতে রনি কলিং বেলে হাত পায়। আসলে এমন কোনোদিন হয়নি যে রনি এসে মাকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি। আজ মেঘার শরীর খারাপের জন্য এমনটা হলো। এটা ভাবতে ভাবতেই মেঘার মাথা টিপে দেওয়ার কথা টা মনে পরলো। রনি কে খাইয়ে দাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। তারপর দেওয়ালের সামনে এসে দাঁড়ালো। মনে অজস্র প্রশ্নের ভিড়। মুখটা কে? কেন ই বা ওর সামনে আসে? আর কি কেউ দেখতে পায়? এই সব চিন্তা যখন মেঘা করছে দেওয়ালে আপনা থেকেই আস্তে আস্তে দাগ পরতে লাগলো। যেন কেউ পেন দিয়ে দেওয়ালে নাক, চোখ, কান ইত্যাদি আঁকতে লাগলো। ক্রমে ক্রমে একটা গোটা মুখ আঁকা হয়ে গেলো। কি জীবন্ত! ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা পরছে। অল্প করে হাসলো যেন। এবার মাথা নেড়ে নিজের কাছে ডাকল। মেঘার পুরো ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগলো। তবু কৌতূহলবশত দেওয়ালের কাছে গেলো। এবার মুখটা কথা বলে উঠলো।
"শরীর ভাল আছে এখন?"
একটি নারী কণ্ঠে মেঘা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। খানিকটা মন্ত্রমুগদ্ধের মতো মাথা নাড়লো। মুখটা ওর উত্তর শুনে উৎফুল্ল হলো।
"তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে।"
মেঘা এবারে জিজ্ঞেস করেই বসলো, " তুমি কে? এখানে কি ভাবে আসো? "
মুখটা হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলো।
"আমি? আমি তো এখানেই থাকি। কিন্ত সবাই আমায় দেখতে পায় না। আমাকে তোমার বন্ধু বা প্রতিবেশী বলতে পারো। তোমায় আমি পছন্দ করি তাই তোমার কাছে আসি। তোমার সমস্ত সুখ দুঃখ আমায় বলতে পারো।
"তোমার নাম কি? " জিজ্ঞেস করলো মেঘা।
"আমার কোনো নাম নেই। তুমি যা ইচ্ছে বলে ডাকতে পারো। "
"তুমি তাহলে আমার সহেলি। তোমাকে সহেলি নামেই ডাকবো। "
"বাহ্! বেশ নাম তো! " মুখ খুব খুশি হলো।
এরপর মেঘার সত্যি সত্যি বন্ধুত্ব হয়ে গেলো মুখের সাথে। সারা দিনের কাজ কর্ম সেরে ও এসে বসতো নতুন সহেলির সামনে। মন খুলে রনির গল্প, পল্লবের গল্প, এমনকি কলকাতা র বাড়ির ও গল্প করতো সহেলির সাথে। মেঘা ভাবলো ভালোই হলো মন খুলে কথা বলার একজন কে পাওয়া গেলো।
একদিন রাতে খাবার টেবিলে রনি হঠাৎ খেতে খেতে বলে উঠলো, "বাবা, মা জানো তো দেওয়ালে একজনের সাথে কথা বলে। "
পল্লব ভুরু কুঁচকে মেঘার দিকে তাকায়।
"কার সাথে কথা বলে মা, রনি সোনা? " ছেলে খামখেয়ালিপনা করছে ভেবে পল্লব হাসতে হাসতে পাল্টা প্রশ্ন করে।
"জানি না। আমি দেখতে পাই না। কিন্তু মা দেখতে পায়। ওর নাম সহেলি আন্টি। তুমি দেখতে পাও বাবা? " রনির সরল জিজ্ঞাসা।
"কাকে? "
"দেওয়ালে সহেলি আন্টি কে!"
পল্লব এবার একটু সিরিয়াস হয়।
"মেঘা, এসব কি বলছে রনি। তুমি দেওয়ালের মধ্যে কাকে দেখতে পাও? আগের দিন আমি ভাবলাম তুমি প্রলাপ বকছো। " একটু বিরক্ত হয় পল্লব।
"ও শুধু আমাকেই দেখা দেয়। কি করবো বলো।" মেঘার অকপট স্বীকারোক্তি।
"তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? রাতে ঘুম হচ্ছে না ঠিক করে?এবার থেকে একটা করে ঘুমের ওষুধ খাও রাতে। আর উল্টো পাল্টা কল্পনা করা বন্ধ করো। " মেজাজ দেখিয়ে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলো ও।
মেঘার মন টাও খারাপ হয় গেলো। রনির ওপর একটু অভিমান ই হলো। কি দরকার ছিল ছেলেটার এসব বলার! শুধু শুধু রেগে গেলো পল্লব।
কিন্তু পল্লব এরপর থেকে মেঘার ওপর নজর রাখতে শুরু করলো এবং লক্ষ্য করলো যে মেঘা একটা বিশেষ
দেওয়ালের সামনে বসে থাকে। কখন গল্প করে, কখন হাসে, এমনকি মাঝে মাঝে হাত ও বোলায় যেভাবে একজন মানুষের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হয়। এসব দেখে পল্লব আর দেরী করা উচিত মনে করলো না। সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার নামি সাইকোলজিস্ট এর এপয়েন্টমেন্ট নিলো। মেঘা কেও সে কথা জানালো। কারণ পল্লব জানে রুগি কে না জানিয়ে এসব রোগের চিকিৎসা হয় না। মেঘা কে বলতে সে রাজি হয়ে গেলো। মেঘা ভেবে দেখল যে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক ই বটে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগের দিন মেঘা ঠিক করলো ঘটনা টা সহেলি কে জানাবে।
"ওরা যা ইচ্ছে ওষুধ দিক, আমাদের বন্ধুত্ব ভাঙতে পারবে না। তোমার স্বামী যা বলছে, তুমি চুপচাপ করে যাও। তোমাদের পৃথিবী অনেক জটিল।
সাইকোলজিস্ট কে কিছু না লুকিয়ে সমস্ত টাই বললো মেঘা। সব শুনে তিনি বললেন যে মেঘা হয়তো তার বাড়ি বা বন্ধু বান্ধবদের মনে মনে খুবই মিস করছে। বললেন মানুষের মনের ভেতরেও একটা মন আছে। সেই ভেতরের মন কি ভাবছে তা আমরা বাইরে থেকে টের পাইনা। তখন সেগুলো নিয়ে আমরা ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি। আর যারা কল্পনা প্রবন হয়, তারা চোখের সামনে সেগুলো কে কল্পনা করে। তিনি কিছু ওষুধ পত্র লিখে দিলেন আর পল্লব কে ফোনে যোগাযোগ রাখতে বললেন।
সহেলি ঠিকই বলেছিল। রোজ রাতে ওষুধ গুলো পল্লব নিজে হাতে করে মেঘা কে খাওয়ায়। কিন্তু মেঘার মধ্যে একটুও পরিবর্তন হয়নি। সে এখনো খোস মেজাজে আড্ডা মারে। তবে এখন সে একটু সাবধানী হয়েছে। কারোর সম্মুখে আর সে দেওয়ালের সামনে দাঁড়ায় না। কিন্ত বই পড়ার ফাঁকে বা মোবাইলে ঘাটার অছিলায় পল্লব দেখেছে যে মেঘা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে। কখন বা চোখ দিয়ে ইশারা করছে। ঠিক পর মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে নিচ্ছে।এই ভাবে মাস পাঁচেক চললো। ডাক্তারের ওষুধে কোনো পরিবর্তন হলো না মেঘার। সাইকোলজিস্ট জানালো যে হয়তো মেঘা বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের কাছে গেলে ঠিক হয়ে যাবে। পল্লব ঠিক করে ফেললো অফিসে কথা বলে ট্রান্সফার এর ব্যবস্থা করতে হবে। এক মাসের চেষ্টায় ট্রান্সফার অর্ডার টা পেয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে এসে সকলকে খবর দেওয়া মাত্র ই উচ্ছসিত হয়ে উঠলো রনি।
"বাবা, আমরা তাহলে দাদু, ঠাম্মার সাথে থাকবো আবার! কি মজা, কি মজা। "
মেঘা শুকনো হাসি নিয়ে বললো, " ভালই তো। কবে যেতে হবে?"
"আজ থেকে তিন দিন পর। আমি টিকিট কেটে ফেলেছি।" পকেট থেকে ফ্লাইটের টিকিট গুলো মেঘা কে দেখালো। মেঘা যেন খানিকটা উদাস হয় গেলো। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে শোবার ঘরটার দিকে তাকালো।
পল্লব ভাবলো সিদ্ধান্ত টা ঠিকই নিয়েছে সে।এই দু দিন রনি যতটা উৎসাহিত ছিল নিজের বই, খেলনা গোছগাছ করা নিয়ে, মেঘা ততটাই চুপচাপ। নিজের কাজ করে যাচ্ছে। ওর মনের ভেতরে যে কষ্ট হচ্ছে সেটা টের পাচ্ছিলো পল্লব। কিন্তু এই পাগলামি কে প্রশয় দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
দু দিন কেটে গেলো। সমস্ত গোছগাছ শেষ। কিছু মালপত্র কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাল জব্বলপুর ছেড়ে চলে যাবে ওরা। সকাল থেকে মেঘার কাজে মন আনচান করছে। সাহেলির জন্য মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। দুপুরে খেতে বসে পল্লব অনেক কথা শোনালো। মেঘা মাংসে নুন দেয়নি আবার তরকারিতে এক গাদা ঝাল দিয়ে বসে আছে।এই কদিন পল্লব নানা অছিলায় মেঘা কে খোঁটা দিয়ে যাচ্ছে। ওর নাকি কোনো কাজে মন নেই। কথাটা অস্বীকার করার ও উপায় নেই। যেদিন থেকে বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে শুনেছে, সাহেলিও মনমরা হয়ে গেছে। মেঘা কে অনেকবার বলেছে,
"তুমি আমার সাথে চলো। আমাদের জগৎ অনেক সুন্দর। তোমার মন ভালো হয়ে যাবে। একবার এসে দেখে যাও। "
মেঘা এসব কথায় কর্ণপাত করেনি।মেঘা যতবার ঘরে যাচ্ছে সাহেলি মুখ ব্যাজার করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখ দুটো ছলছল করছে।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় এগারোটা বেজে গেলো। পল্লব শেষ বারের মত চেক করে প্যাকিং করে নিয়েছে। সারাদিনের কাজকর্মে দুজনেই ক্লান্ত। পল্লব তাই শোয়া মাত্রই নাক ডাকতে লাগলো। মেঘা এসে দাঁড়ালো দেওয়ালের সামনে। বেশ কিছক্ষন অপেক্ষা করলো সাহেলির জন্য। কিন্ত ওর দেখা নেই। হয়তো অভিমান হয়েছে। মন খারাপ নিয়ে ই শুয়ে পরলো মেঘা।
ঘুমের মধ্যে টের পেল কে যেন খুব স্নেহের সাথে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে গায়ে। চট করে উঠে বসলো ও। আলো জ্বালালো। অঝোরে কাঁদছে সহেলি। মেঘাও নিজেকে আর আটকাতে পারলো না।
"তুমি আমায় ফেলে যেওনা মেঘা। " বলেই ফেললো সহেলি।
"আমার যে কিছু করার নেই বন্ধু। " মেঘার আহত কণ্ঠ।
"একবার এসো আমার পৃথিবী তে। আর তো কোনোদিন দেখা হবে না। এই টুকু অনুরোধ রাখো। "
"কিন্তু আমি তোমার কাছে যাবো কিভাবে? " আশ্চর্য হলো মেঘা।
সহেলি এবার নিজের হাত টা বাড়িয়ে দিলো।
"কিন্তু আমি ফিরবো কিভাবে? "
"আমি তো আছি "।
মেঘা ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলো ছেলে, বর দুজনেই অকাতরে ঘুমাচ্ছে।মনে মনে ভাবলো দেখি না কি হয়। সহেলি তো আমার কোনোদিন ক্ষতি করেনি তাই ওকে বিশ্বাস করাই যায়। এরপর তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। ওর শেষ অনুরোধ টা না হয় রাখলাম। তবে ফিরে আসতে হবে তাড়াতাড়ি। এই ভেবে গভীর বিশ্বাসে হাত ধরলো সাহেলির। সঙ্গে সঙ্গে দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে গেলো ভেতরে। বান্ধবী কে এবার পুরোপুরি দেখতে পেল। একটা লাঠির ওপর বসানো একটা মুখ। সেই লাঠির গায়ে আটকানো কাঠির মতো একটা মাত্র হাত। কিন্তু পা বলে কিছু নেই। দেখে মনে হচ্ছে ছোটবেলায় মেলা থেকে কিনে দেওয়া কাঠি ওয়ালা পুতুল। তফাৎ হচ্ছে- এরা জীবন্ত।এখানে এসেই কেমন যেন শীত করতে লাগলো মেঘার। ওর ধারণা ছিল না যে দেওয়ালের এদিকে একটা জগৎ থাকতে পারে। এখানে কতো আলো। আকাশ টা নীলের বদলে গোলাপি।আর সেখান থেকে তুলোর মতো ঠান্ডা ঠান্ডা কি পরছে। এই জায়গায় সাহেলির মতো অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদেরও কেবল মাথাটা দেখা যাচ্ছে। ওরা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে মেঘার দিকে তাকাচ্ছে। সহেলি ওর পাতলা হাতে মেঘা কে ধরে আছে। এবার বললো,
"আমার বাড়ি চলো মেঘা। "
মেঘা হেসে সম্মতি দিলো। দুজনে একসাথে চললো। মেঘার এবার একটু অন্য রকম লাগছে। একজন মানুষের সাথে চলা আর একজন অদ্ভুত দেখতে কারোর সাথে চলার মধ্যেই তফাৎ তো আছেই। এখানকার গাছ গুলো সব হলুদ। আর রাস্তায় লাল গালিচা পাতা। যেতে যেতে মেঘা দেখলো একটা পুকুর। সেখানে জ্বলন্ত লাভা টগবগ করছে। এই ঠান্ডার মধ্যে এরকম গরম পুকুর! কয়েক পা এগোতে দেখতে পেল সাহেলির মতো একজন একটা মানুষের বাচ্চা কে নিয়ে একবার আকাশের দিকে ছুড়ছে আর নামাচ্ছে। এক সময় হাত ফস্কে বাচ্চাটা নিচে পরে গেলো। তারপর ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। কিছুতেই থামছে না। হয়তো বা খুব ব্যথা পেয়েছে। এবার সেই মুখটা বিরক্ত হয়ে বললো,
"তু্ই আজকাল বড্ড কাঁদিস। আর তোকে নিয়ে খেলতে ভালো লাগে না। " এই কথাগুলো বলেই বাচ্চা টাকে সেই পুকুরের ফুটন্ত জলে ছুঁড়ে ফেললো। মেঘার বুকের ভেতরে ছলাৎ করে উঠলো।
" সহেলি, কি নির্মম ওই মুখটা! ওই বাচ্চা টাকে ওভাবে ফেলে দিলো! ও মরে যাবে তো!"
"ও কিছু না। বোধহয় খেলনা টা পুরোনো হয়ে গেছিল। চল আমরা অন্য কথা বলি। " সহেলি আর ও একটা মাঠের মতো তুলতুলে নরম জায়গার ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু মেঘার কানে একটা খটকা বাজতেই থাকলো। খেলনা! এই জগতে মানুষের বাচ্চা খেলনা! বাচ্চাটা এখানে এলো কি ভাবে? তার মতোই কি.......
"মেঘা এই আমার বাড়ি। এখন থেকে তোমারো। চলো ভেতরে যাই। "
মেঘা দেখলো অসংখ্য ছোট ছোট বরফের টুকরো দিয়ে তৈরি করা একটা বাড়ি। ভেতরে ঢুকতেই মেঘা কাঁপতে লাগলো। বাড়িটা সুন্দর করে বানানো। অনেক গুলো ঘর।ওর চোখে পরলো কয়েকটা মেয়ের ছবি দেওয়ালে টাঙানো।
"এরা কারা? " স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করে মেঘা।
"এরা আমার বন্ধু ছিল। "
"ছিল মানে? এখন কোথায়? " মেঘার স্বরে অজানা ভয়।
"এখন আর নেই।"
""নেই মানে? কোথায় গেলো ওরা? " মেঘার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
"মেঘা এবার তুমি বিরক্ত করছো। এখানে তুমি আর আমি গল্প করবো বলে এসেছি। আমরা এখানে খুব ভালো থাকব। তোমার ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। " সাহেলির গলায় এই প্রথম আদেশ।
কোনো এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের কথা আন্দাজ করে মেঘা এবার প্রতিবাদ করে।
"আমাকে যেতে দাও। অনেক্ষন হলো। কাল আমায় চলে যেতে হবে। "
সহেলি জোরে জোরে হাসতে লাগলো।
"কোথায় যাবে? এটাই তো তোমার বাড়ি। তুমি এখন আমার খেলনা। আমাদের এরকম খেলনা লাগে মেঘা। কিন্তু তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমায় খুবই ভালোবাসি। তুমিও তো আমায় ভালোবাসো। তোমাকে আমি রোজ খাইয়ে দেবো। মাথায় হাত বুলিয়ে দেবো। কতো রকমের গল্প করবো। তোমার আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। তুমিও তো আমার কাছেই থাকতে চাও। বলো চাওনা? "
মেঘার বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে। গলা শুকিয়ে গেছে। রনির আর পল্লবের মুখ দুটো মনে পরছে। কি সর্বনাশ করলো ও নিজের। বাড়ি টা থেকে ছুটে বেরোতে যাবে.... সঙ্গে সঙ্গে হাত টা ধরে নিল সহেলি। কাঠির মতো হাতে কি জোর। মেঘা সেই বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না।
"তুমি ওদের ভুলে যাও বন্ধু। ওরাও তোমাকে কিছু দিন বাদে ভুলে যাবে। আমরা এখানে অনেক ভালো থাকবো।"
মেঘা এবার কেঁদে ফেললো।
"ওটা আমার পৃথিবী সহেলি। আমাকে ওখানে ফিরে যেতে দাও। ওরা আমার নিজের। তুমি আমার কেউ নও।তোমার আমার জগৎ আলাদা। "
"রনি.. ই.. ই... "বলে পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠলো মেঘা। বাড়ির দেওয়াল টা হঠাৎ ই যেন ছুঁতে পারলো হাতের সামনে।
এই প্রথম বোধহয় রনি দেওয়ালের ওদিকের কারোর আওয়াজ শুনতে পেল। খাটের ওপর উঠে বসলো।আলো জ্বালানো ঘরে মাকে দেখতে না পেয়ে ঘাবড়ে গেলো বেচারা। কি মনে হতে দেওয়ালের দিকে তাকালো। এখানেই তো মা আজকাল তাকিয়ে ওই আন্টির সাথে কথা বলে।
"রনি আমাকে বাঁচা, বাবা!"হাউ হাউ করে কাঁদছে মেঘা। কিন্ত কিছুতেই বান্ধবীর কবল থেকে বেরোতে পারছে না।
"মেঘা তুমি আমাকে ছেঁড়ে যেতে পারবে না "। সাহেলির মুখ এখন আগুনের মতো লাল হয়ে গেছে।
ছোট্ট রনি ছুটে গিয়ে দেওয়ালের মধ্যে হাত ঢোকাতেই পেয়ে গেলো মায়ের একটা হাত।
"বাবা ওঠো। মাকে বাঁচাও। বাবা! বাবা!"
ধড়মড়িয়ে ওঠে পল্লব। রনি কে দেওয়ালের সাথে লেপ্টে থাকতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়।
"কি হয়েছে বাবু, মা কোথায়? "
"মা দেওয়ালের ভেতরে। কাঁদছে। আন্টি বোধহয় ধরে নিয়ে গেছে। তুমি মা কে বার করো। "
পল্লবের মাথা কাজ করছে না। একি অবাস্তব কথা বলছে রনি। মেঘা দেওয়ালের ভেতরে! কিন্তু মেঘার অনুপস্থিতি আর ছেলের আকুতি দেখে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। সেও হাত বাড়ালো। একটা হাতের স্পর্শ পেল। সত্যিই তো এটা তার স্ত্রীর হাত। স্পর্শে বুঝতে পারলো সে। কিন্তু মেঘা কে কিছুতেই টেনে আনতে পারছে না। কেউ যেন আটকে রেখেছে ওকে। রনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,
"মা তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। তুমি কোথাও যাবে না। ঠাকুর মাকে পাঠিয়ে দাও এখানে। "
চলতে লাগলো টানাটানি।
নাড়ির টানেই হোক বা রনির ঠাকুরের দয়াতেই হোক মেঘা তার প্রিয় বান্ধবীর হাত ছাড়িয়ে দেওয়াল ভেদ করে হুড়মুড়িয়ে এসে পরলো খাটের ওপর। রনি মাকে জড়িয়ে ধরলো।
"তুমি কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেছিলে মা? "
"আমার ভুল হয়ে গেছে সোনা। আর কক্ষনো যাব না। "
ছেলেকে চুমু তে ভরিয়ে দিতে থাকে মেঘা।
পল্লব অবাক চোখে শুধু দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
"দেওয়ালে মুখটা তাহলে সত্যি সত্যি ছিল!"
সমাপ্ত।
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments