পার্কস্ট্রিট_সিমেটরি Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#পার্কস্ট্রিট_সিমেটরি
#ভূতের_শহর_কলকাতা
আর পারা যাচ্ছে না!
ভ্যাপসা গরম, সাথে চ্যাটচ্যাটে ঘাম। দু এক পশলা বৃষ্টি নামছে বটে, কিন্তু তাতে একটুও স্বস্তি হচ্ছে না। তার উপর বাড়িতে একেক দিন একেকটা সমস্যা। আর অফিসের কথা তো ছেড়েই দিলাম। প্রতিদিন বসের মুখঝামটা শুনতে শুনতে জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গেল। সত্যি সত্যি আর পারা যাচ্ছে না!
তাই ভাবলাম আজ অফিস থেকে ফেরার পথে একবার গল্প দাদুর বাড়িতে ঢুঁ মেরে যাই। দাদুর বয়স আশির কাছাকাছি। ওনার অট্টালিকাটা বহুদিন ফাঁকা পড়ে ছিল। তারপর হঠাৎ একদিন তিনি বিদেশ থেকে এসে সেখানে থাকতে শুরু করলেন। অফিস থেকে ফেরার পথেই ওনার সাথে আমার আলাপ। ভালো গল্প বলেন বলে আমি ওনার নাম দিয়েছি, গল্প দাদু।
সদর দরজা পেড়িয়ে আমি ভারি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। বাইরে এতো গরম, কিন্তু দাদুর অট্টালিকায় যেন বসন্তের বাতাস বইছে। এদিকে এ ঘর ও ঘর ঘুরে, কোথাও দাদুর দেখা পেলাম না। চলে যাব কিনা ভাবছি হঠাৎ কাঁধে একটা টোকা পড়ল। চকিতে পিছন ফিরে দেখলাম হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন গল্প দাদু।
"আপনি কোথা থেকে এলেন?" আমি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
"আসিনি তো, আমি এখানেই ছিলাম। তুমি খেয়াল করনি। এস এস।" আমার হাত ধরে ওনার লাইব্রেরীতে এনে বসালেন।
"কীহে মুখ শুকনো কেন? কিছু হয়েছে?" দাদু ভুবন ভোলানো হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন।
"আর বলবেন না। জীবনে এতো সমস্যা, এতো দুশ্চিন্তা, আর ভালো লাগছে না। সত্যি কথা বলতে কি এখন বেঁচে থাকাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।" আমি মাথা নিচু করে করুন সুরে বললাম।
মুহূর্তে দাদুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ধমকের সুরে বললেন, "বাজে বোকো না। বুড়িয়াল গ্রাউন্ড রোডে গেছ কোনোদিন?"
"সে আবার কোথায়? যাওয়া তো দূরের কথা কোনোদিন নামই শুনিনি।" আমি কাঁচুমাঁচু মুখ করে বললাম।
"ও তাই? যাই হোক স্বামী গোকুলানন্দের সামনে, জীবনটাই সমস্যা এই জাতীয় কথা বললে তিনি তোমাকে বুড়িয়াল গ্রাউন্ড রোডে যেতে বলতেন।" দাদুর মুখে রহস্যময় হাসি খেলা করে উঠল।
"বুড়িয়াল গ্রাউন্ড মানে তো কবরখানা। ওখানে যেতে তিনি কেন বলতেন?" আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম।
"ওখানে গেলে তুমি ডিকেন্স সাহেব এবং আরও ষোলশো জনের সাহচর্য পেতে।" দাদু সোজা কথায় উত্তর তো দিলেনই না উল্টে রহস্য আরও ঘনীভূত করলেন।
"চার্লস ডিকেন্স? ওনার কবর তো নিশ্চই ইংল্যান্ডে থাকবে। অত দূর যাওয়ার মতো পয়সা আমার নেই।"
"বলি ইউং বেঙ্গল মুভমেন্ট কি ইংল্যান্ডে হয়েছিল? তার হোতা এখন কোথায় শুয়ে আছেন জানো?" পরপর বেশ কয়েকটা বউন্সারের পর দাদু একটা ফুলটস দিলেন।
"আচ্ছা এবার বুঝেছি। আপনি পার্ক স্ট্রিট সিমেটরির কথা বলছেন। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম ওখানে ডিরোজিওর সমাধী আছে। ইউং বেঙ্গল মুভমেন্টের হোতা তো তিনিই ছিলেন।" আমি দিব্যি বলটা বাউন্ডারীর বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, "বুড়িয়াল গ্রাউন্ড রোড নামটাতো কোনোদিন শুনিনি। সেটা কোথায়?"
"নামটা শোননি এতে তোমার দোষ নেই। একি আজকের কথা! সেসময়কার ব্রিটিশদের অনেকেই ভারতের জল হাওয়ার সাথে সহজে মানিয়ে নিতে পারতো না। সাথে ছিল নানা রকমের রোগ, মহামারী - ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়েরিয়া ইত্যাদি। এসবের কবলে ভারতে আসা ব্রিটিশদের অনেকেই অকালে প্রাণ হারাতো। প্রথম দিকে তাদের কবর দেওয়া হতো সেন্ট জন্স চার্চের কাছে তৈরী কলকাতার প্রথম গ্রেভিয়ার্ডে। কিন্তু স্থানাভাবের কারণে ১৭৬৭ সালে আর একটি গ্রেভিয়ার্ড তৈরী হয়। তার সংলগ্ন রাস্তার নাম রাখা হয় বুড়িয়াল গ্রাউন্ড রোড। যা পরবর্তীকালে পরিবর্তীত হয়ে দাঁড়ায় পার্ক স্ট্রিট। ১৮৪০ সাল অব্দি ষোলশোর বেশী ব্রিটিশকে এখানে কবর দেওয়া হয়। এর মধ্যে যেমন ছিলেন ডিরোজিওর মতো খ্যাতনামা মানুষ, তেমন ছিলেন সাধারণ ব্রিটিশ এবং গোরা সৈনিকরাও। সৈনিকদের ক্ষেত্রে রাতের বেলা গান স্যালুট সহ কবর দেওয়া হতো। সমাধির উপর নোঙ্গর এবং শিকল থাকলে বুঝতে হবে, সেই ব্যক্তি নৌ বাহিনীতে ছিলেন।" দাদু এক নাগাড়ে বলে গেলেন।
"আর চার্লস ডিকেন্স সাহেব তাঁর কবরও কি ওখানেই আছে নাকি?" আমি চাতকের মতো দাদুর দিকে চাইলাম।
"আরে না না। আমি বলেছি ডিকেন্স সাহেব ওখানে আছেন। এনার নাম ওয়াল্টার ডিকেন্স। ঐ যে বললাম ওখানে অনেক গোরা সৈন্যদের কবর দেওয়া হতো। ইনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রেসিডেন্সী আর্মির একজন সৈন্য ছিলেন। তবে এক্ষেত্রে চার্লস ডিকেন্স এর নাম আসবে কারণ সম্পর্কে এই ডিকেন্স সেই বিখ্যাত ব্রিটিশ নভেলিস্টের ছেলে।"
"আরিব্যাস! চার্লস ডিকেন্স এর ছেলের সমাধী এই কলকাতায় আছে। আর কে কে আছে ওখানে দাদু?" আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
"আরও অনেকেই আছেন। এই ধর চার্লস হিন্দু স্টুয়ার্ট।"
"চার্লস স্টুয়ার্ট তো খৃষ্টান নাম। এর মধ্যে আবার হিন্দু কোথা থেকে এলো?" আমার সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
"কারণ তিনি হিন্দু ভাবধারায় এতো অনুপ্রানীত হন যে নিজেকে হিন্দু স্টুয়ার্ট বলে পরিচয় দিতেন। শুধু তাই নয়, তিনি রোজ সকালে উঠে গঙ্গা স্নানে যেতেন। ব্রিটিশ রমনীদের শাড়ি পড়তে বলতেন। আর হিন্দুদের দেখলে খুব আনন্দ সহকারে বলতেন, জয় সিতারামজী।"
"বলেন কি! এ যে দেখছি দৈত্য কুলে প্রহ্লাদ।" আমি মুখ হাঁ করে বললাম।
"হে হে তা বটে। ব্রিটিশ কবি ওয়াল্টার ল্যান্ডরের প্রেমিকা রোজ আলমারও এখানে চীর নিদ্রায় শায়িত। কিন্তু রোজের বাড়ি থেকে এই সম্পর্ক মেনে নেওয়া হয়নি। ওয়াল্টারের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শেষে এটাই তার কাল হয়। এখানে এসে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রোজ মেমসাহেব আনারস খেতে খুব ভালোবাসতেন। এই আনারস নিয়ে সে সময় একটা মজার ঘটনা ঘটে। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান এতো উন্নত হয়নি। সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। এহেন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশরা সন্দেহ করতো যে আনারস এবং তরমুজ থেকে কলেরা রোগ হয়। তাই সেসময় কলকাতার অনেক জায়গায় এই দুটি ফলের বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়।"
"কি কান্ড! যত দোষ, আনারস আর তরমুজ ঘোষ। দুটো নিরীহ ফলকে বিনা দোষেই দোষী করা হল?" আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
"নিরীহ ফলদের প্রতি এতো সহমর্মিতা ইতিপূর্বে আর কেউ দেখায় নি। যাক সে কথা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের মধ্যে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্সও এখানে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন। আর আছে একদল ভূত।" স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দাদু চোখ পাকিয়ে বললেন।
"এই পর্বের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে এতো ভূত আছে, আর কবরখানায় ভূত থাকবে না এটা হতেই পারে না।" আমি সবজান্তার মতো বলে বসলাম।
"ভূতদের ব্যাপারে দেখছি তোমার প্রবল আগ্রহ! তাহলে শোনো, পার্ক স্ট্রিট সিমেটরির ভূত নিয়ে কত গল্পই তো শোনা যায়। অনেকের নাকি এখানে ঢুকলে নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হয়। কারোর কারোর নাকি মেরুদণ্ডে অদ্ভুত এক শিরশিরানী অনুভব হয়। কেউ কেউ বলেন সমাধিগুলোর ছবি তোলার পর তা অদ্ভুত ভাবে বেঁকে যায়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে যায় ডেনিসন পরিবারের গল্প।"
"ডেনিসন পরিবার? তাঁরা আবার কারা?"
"এনারা তেমন বিখ্যাত নন। এই ডেনিসন পরিবারের সকলে অজানা রোগে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যান। তাদের কবর গুলিও পাশাপাশী আছে। বর্ষাকালে নাকি এই কবরগুলি থেকে রক্ত বার হতে দেখা যায়।" দাদুর তৈরী করা রহস্যের মেঘ যেন ঘরময় ছেয়ে যায়।
"কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সমাধী থেকে রক্ত! আর স্বামী গোকুলানন্দ সবাইকে ওখানে যেতে বলেন। কোনো কান্ডজ্ঞান নেই ওনার!" আমার খানিক রাগ হল।
"না না সবাইকে বলেন না। শুধু তাদের বলেন যারা মানসিক কষ্টে ভুগছে। বেঁচে থাকাটাই যাদের কাছে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।" দাদু শান্ত ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
"ও গ্রেভিয়ার্ডে গিয়ে বসে থাকলে বুঝি ভুতের ভয়ে সব মানসিক কষ্ট চলে যাবে?" আমি ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রশ্ন করলাম।
"আরে পুরোটা শোনো আগে। দিল্লী রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ স্বামী গোকুলানন্দ মহারাজের মতে মানুষ যদি সপ্তাহে একদিন কিছু সময় গ্রেভিয়ার্ডে গিয়ে বসে থাকে তাহলে সে বুঝবে যে একদিন সেও এই মানুষগুলোর মতো প্রাণহীন হয়ে কোনো কবরের নিচে শুয়ে থাকবে। অর্থাৎ তার ভয়, দুশ্চিন্তা, ঈর্ষা, লোভ, উচ্চাকাঙ্খা সব কিছু শেষ হবে ওই কবরে বা চিতার আগুনে। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য। স্বাভাবিক নিয়মে সব মানুষের জীবন পথ একদিন শেষ হবে। তাই এতো দুশ্চিন্তার নিট ফল হল শূণ্য।"
"হু স্বামী গোকুলানন্দ মহারাজ ঠিকই বলেছেন," আমি ভাবুক হয়ে বললাম।
"শুধু শুধু দুশ্চিন্তা কোরো না। ঠান্ডা মাথায় সমস্যাগুলো সমাধান করার চেষ্টা করো। ভগবান এতো বড় উপহার তোমাকে দিয়েছেন সেটা কাজে লাগাতে হবে তো।" দাদু বিজ্ঞের মতো বললেন।
"উপহার? ভগবান আমাকে দিয়েছেন? কি বলুন তো?" আমার ভারি কৌতূহল হল।
"জীবন।" দাদুর মুখের কোনে একটা প্রশান্তির হাসি খেলা করে উঠল।
শব্দটা শুনে আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই তো জীবনের থেকে বড় উপহার আর কি হতে পারে? দাদুর বলা এই একটা শব্দে আমার মাথা থেকে যেন একটা বোঝা নেমে গেল।
"জীবন বড় অমূল্য। যাদের আছে তারা পড়োয়া করে না, আর যাদের নেই তারা শত কাঁদলেও ফেরৎ পায় না। তাই যতদিন জীবন আছে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত বেঁচে নাও। বুঝলে হে।" এবার দাদু ভাবুক হয়ে বললেন।
আমি মাথাটা উপর নিচে দুলিয়ে খুশি মনে "হ্যাঁ" বললাম। তারপর ঘড়িটা দেখে বিদায় চাইলাম, "দেরী হয়ে যাচ্ছে দাদু। বাড়ি ফিরতে হবে। আজ উঠি।"
"হ্যাঁ এস। মন খারাপ লাগলেই আমার কাছে চলে আসবে। আর একটা গল্প শোনাবো, কেমন।" দাদু স্নেহের পরশ মাখিয়ে বললেন।
"সে আর বলতে," আমি সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাসি মুখে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে এলাম।
কয়েক পা এগোতেই মনে পড়ল ব্যাগটা ফেলে এসেছি। সেটা নিতে আবার লাইব্রেরীতে ঢুকতেই দেখলাম ঘর ফাঁকা। দাদু নেই। জলজ্যান্ত মানুষটা এতো তাড়াতাড়ি কোথায় চলে গেল কে জানে...
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments