চিলেকোঠা Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#গল্প
চিলেকোঠা
১.
পইপই করে বলে দিয়েছিল ঠাকুরমা, "ওঘরে যাস না। ওঘরে আজ পর্যন্ত যারা যারা গেছে, আর যারা ফিরেছে, তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।" বুড়ি এসব কথা বলে আর দাঁতহীন মুখটাকে বিকৃত করে, যন্ত্রনার গল্প বলতে চায় বোধহয়। আমার যদিও সময় সময় হাসি আর যন্ত্রনা গুলিয়ে যায়।
"জানিস বাড়িটা বানিয়েছিলেন আমার শ্বশুরমশাই, তোর ঠাকুরদার বাপ। লোকটা বৃটীশ আমলে পুলিশে চাকরী করতেন। স্বদেশের লোকের রক্ত লেগেছিল তাঁর হাতে। তাঁর উপর ওনার বউরা কেন জানি না কেন বাঁচত না। একবার হয়েছে কী বাবা ফিরেছেন ডিউটি থেকে, সেদিন শুক্কুরবার, রিটায়ারের ৬ মাস বাকি তখন। এক স্বদেশীর বাড়ি হানা দিতে গিয়ে তখন তাঁর চতুর্থবার পত্নীলাভ হয়েছে। দেখেন, নতুন বউএর ভাই এসেছে, বউ খেতে দিয়েছে তাকে। এখন সম্বন্ধী হলেও লোকটা আসামী। বাবা তাকে বললেন, খেয়ে নিয়ে আমার সাথে থানায় যেতে হবে। এতে গৃ্হশান্তি বিঘ্নিত হতে পারত।কিন্তু আশ্চর্যভাবে, নতুন বৌ কিছুই হয়নি ভাব দেখিয়ে হেসে তাঁকে খেতে দিল।
তারপর বাবার আর কিছু মনে নেই। কিন্তু তোর দাদুর কাছে শুনেছি, শহর থেকে শনিবার বাড়ি ফিরে তোর মেজকাদাদু মানে দীনেশ দেখেছিল, বাবা চিলেকোঠার সামনে বসে আছেন, মুখে উদ্ভ্রান্তের মত দৃষ্টি আর বাড়িতে না আছে তার নতুন মা, না তার ভাই। চিলেকোঠা দূরে থাক জগতসংসারে তাদের আর খোঁজ মেলেনি। মেয়েটির বাড়ির লোক অভিযোগ করেছিল, তোর বুড়োদাদা তাদের মেয়ে এবং ছেলেকে গুমখুন করেছে। কিন্তু ওই বললাম না, খুন হলেও লাশ লাগে।"
আমি বললাম, "তারপর।"
"তারপর আর কী, বাবার সুস্থ হতে বছরখানেক লেগেছিল। কিন্তু উনি আর কখনও চিলেকোঠার নামও করেননি। ছাদে ওঠার কথা ভাবলেও তাঁর চোখে একটা ভয় আসত। তোর দাদু চিলেকোঠার দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেন।"
"ও ভাবলাম একটা গা ছমছমে গল্প বলবে, সেখানে সারাগায়ে দগদগে ঘাওলা ভুত উল্টো হয়ে ঝুলে থাকবে। ডাইনি গরম চিমটে দিয়ে লোকের বুক থেকে বের করে আনবে স্পন্দনশীল হৃদপিন্ড। ধুর বুড়ি, তুমি না টু সুইট ফর ভুতের গল্প।"
"ভাই হেসে উড়িয়ে দিচ্ছ দাও। কিন্তু তোমার ছোটকাদাদুর মত উঁকি মারতে যেও না। "
"সে তো স্টেটসে থাকে। সে আবার কী করল?"
"এই ঘটনার সময় তার বয়েস ছিল ৪, সে মামার বাড়ি বড় হচ্ছিল। আমার বিয়ের পর আমি তাকে বাড়ি নিয়ে আসি, সে জানিস তো?"
" জানব না বুড়ি। ছোটকাদাদু তো তোমার নাম শুনলেই হিক্কা তোলে। তোমার বিশ্বমাতা মোড তো জগদ্বিখ্যাত। "
" ফাজলামো মারিস না, তখন তার বয়েস ১৪। তোর বাবা-পিসি-কাকাদের যে দল ছিল তার পালের গোদা। সে একদিন ঢুকেছিল ওই ঘরে।"
" অ্যাঁ! তার আবার কী চেঞ্জ হল?"
" তোর মেজকাদাদুকে তোরা দেখিস নি। সে তোর দাদুর চেয়ে বছর পাঁচেকের ছোট ছিল। তা হল কী সে তখন সবে চাকরী পেয়েছে.... চলে যাবে বলে বাড়ির সকলেরই মন খারাপ। সেই সময় বাচ্চু, মানে তোর ছোটকাদাদু একদিন ঢুকল ওই ঘরে। তালাটা কি করে খুলেছিল জানি না? তবে তোর দাদুভাই তখন দিল্লীতে, আর বাবাকাকারা সব গেছে ইস্কুলে। বাচ্চুর শরীরটা ভালো ছিল না। সেদিনই দীনু চলে যাবে। ট্যাক্সি এসে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চুর দেখা নেই। ভাবলাম বোধহয় কোথাও লুকিয়ে কাঁদছে। বিদায় দিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম। পেলাম কোথায় জানিস?"
"চিলেকোঠায়... সেও নিশ্চয় ভ্যাবলা হয়ে..."
" প্রথমটা ঠিক, পরেরটা নয়। চিলোকোঠার মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল ও৷ তার সর্বাঙ্গে আঁচড়ের দাগ, জামা ছেড়া। আর কখনও কাউকে ওই ঘরে ঢুকতে দিইনি। আর জানিস ওই একদিনে আমার ডানপিটে ছেলেটা কেমন বড় হয়ে গেল। "
"বুড়ি, তুমি না...."
" দাদুকে জিজ্ঞেস করিস! সোনা তুমি কক্ষনো ওখানে যেও না।"
২.
দিন কাটছিল বেশ, হঠাৎ একদিন বুড়ি খুব মরে গেল। সবাই সেদিন বাড়িতে ব্যস্ত, আমার ভালো লাগছে না। চোখের ফাঁক গলে ছাদে চলে গেলাম।চিলেকোঠার ঘরটার বন্ধ দরজার দিকে চোখ পড়ল। এর কাঠের ফাটলে চোখ রেখেছি বহুবার। কিছু নেই। একটা সাদামাঠা ঘর, দেওয়াল জোড়া একটা আলমারি আর একটা ভাঙা খাটিয়া ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে নি। আজ মনে বড় রাগ হল। তালায় একটা টান দিলাম, ওমা নিজের থেকে খুলে এল। ঘরটায় ঢুকে পড়লাম।
গা বেয়ে একটা শিরশিরানি নেমে গেল। ঘরের দেওয়ালে একটা ময়লা আয়না। সেখানে মুখ দেখা যায় না প্রায়। দেওয়ালের রং কোনো এককালে সাদা ছিল, কিন্তু চুন- খসে পড়ে আর দেওয়ালে নোনা ধরে কেমন একটা খয়েরী রঙ নিয়েছে। যেন দেওয়ালে পুরোনো শুকনো রক্তের দাগ। আলমারির পাল্লাটা হাল্কা ফাঁক হয়ে আছে। তার গায়ে যেন লম্বাটে আঁচড়ের দাগ দুটোতিনটে। ঘরের কোণে মাকড়শার জাল, জানালার শিকে জঙ ধরেছে, খড়খড়ি খসে গেছে তিনচারটে আর তার ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর ঢুকছে ঘরে। সব মিলিয়ে ওই ভুতের গল্প যেমন হয়।
আমার কৌতুহল বেড়ে গেল। আলমারির পাল্লাটা ধরে টান মারলাম। একটা অদ্ভুত ক্যাঁচ করে শব্দ হয়ে দরজাটা খুলে গেল। আর ঠিক সেই সময়েই বাইরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। একটা ভ্যাপসা গন্ধ ছেড়ে কী একটা গড়িয়ে পড়ল তাক থেকে। হাত দিয়ে দেখি একটা মাথার খুলি...
মাথাটা ঘুরে গেল হঠাৎ। জ্ঞান ফিরল, দেখি ঠাম্মার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি চিলেকোঠাতেই। ঠাম্মার মুখে মৃদু হাসি। আশ্চর্য ব্যাপার, আমার একটুও ভয় করল না। ফাঁকা আলমারিটার দিকে তাকাতে দেখি। তার ভিতরে একটা লম্বা সুড়ঙ্গ মত। সেটা দিয়ে সিড়ি নেমে গেছে ভিতরের দিকে।
৩.
ঠাম্মার দিকে তাকালাম। বুড়ি বললে, "দেখতে ইচ্ছা হলে নেমে যা। আমি আছি।"
পায়ে পায়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলাম। সিড়ির শেষে একটা অলিন্দ, দুপাশে ছোট ছোট ঘর। প্রথম ঘরটায় উঁকি দিলাম। ঘরের মধ্যে একজন প্রৌঢ়, বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজোড়া তরুণ তরুণীর দিকে তাক করে। তরুণ তরুণীর মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি। তারা বলল," বন্দে মাতরম।" প্রৌঢ়র বন্দুক থেকে গুলি বেরিয়ে এল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম "সরে যাও।" সাথে সাথে তিনজোড়া চোখ পড়ল আমার দিকে। আমি ছিটকে বেরিয়ে আসতে আসতে দেখলাম। তরুণীর বুক থেকে রক্ত ছিটকে লেগেছে দেওয়ালের গায়ে, যেখানে যেখানে দাগ।
পিছনে বন্দুক হাতে প্রৌঢ়। আমি একদৌঁড়ে উল্টোদিকের ঘরে ঢুকে পড়লাম।
ঘরটা জীর্ণ। সুকুমার কিশোরকে চেপে ধরেছে আর যুবক, বিছানার সাথে। একহাতে মুখ চেপে ধরে চলছে ধর্ষণ। কিশোরের চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে বিছানায়। হঠাৎ আমার পাশ কাটিয়ে একজন নারী, ঢুকে পড়লেন ঘরে। হাতে তার একটা পুরোনো রিভলভার। গুলি চলল। যুবকের ঘিলু ছিটকে পড়ল দেওয়ালে। কিশোরের চোখ মুছিয়ে দিলেন নারী আর খুব চেনা চেনা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মুখে আঙ্গুল দিয়ে যেন মানা করলেন কিছু বলতে। আমি কিছুনা বলে বেরিয়ে এলাম। উল্টোদিকের দরজা থেকে আলো ছিটিয়ে পড়ছে মেঝেতে। ঢুকতে ইচ্ছা হল। কিন্তু সেই লোকটি? বলতে বলতেই আলো সম্মোহন করল আমায়। কিন্তু একি...
প্রথম ঘরটি এখন মতই দ্বিতীয়ের মতই দীর্ণ। কিন্তু ফাঁকা। বাইরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটি, তার চোখে জল। মহিলা ঢুকলেন, চোখের জল মুছিয়ে বললেন, দাদা চলে গেছে বলে দুঃখ কীসের, আমরাও কি যাচ্ছি। বলতে বলতেই মহিলার চেহারাটা বেড়ে দ্বিগুন হল, নখর দন্ত ব্যাদান করে সে খিমচে ধরল কিশোরের কাঁধ। কিশোর জ্ঞান হারানোর আগে দেখল দুটো শ্বদন্ত তার কাঁধের কাছে। আমি পিছোতে ধাক্কা খেলাম দরজায়। মহিলা ফিরে তাকালেন। আমি দরজার বাইরে এসে হাঁপাতে লাগলাম।
অন্য আরেকটি দরজা পেলাম সামনে। চেয়ারে পিছ মোড়া করে বাঁধা সেই প্রথম ঘরের বলশালী প্রৌঢ়।সেখানে, সেই জোড়া নারী পুরুষ তার সামনে পোঁটলায় ভরে নিচ্ছে গয়নাগাটি বাসনপত্র। বাঁধন শেষে আলতো করে পুরুষের গালে চুমু খেল মহিলা,তারপর বেরিয়ে গেল। পুরুষের মুখের বাঁধন তখন খুলে পড়েছে। সে চিৎকার করে বলল, ওদের ধর বিট্টু। বিট্টু আমার ঠাকুরদার ডাকনাম। বেরিয়ে এলাম।
সামনে সারি সারি দরজা। বুঝছি যা কাণ্ড হচ্ছে সেই দরজার ওপারে। এদিকে ফেরার সিড়িও খুঁজে পাচ্ছি না আর। বুঝতে পারছি সে দরজা দিয়ে ঢুকেছি, আর যে দরজা দিয়ে বেরিয়েছি সেদুটো আলাদা।। অলিন্দ এখন অনন্তের মত দীর্ঘ।
অলিন্দ হঠাত নড়ে উঠল। দূরের দৃষ্টিপথের বাইরের অন্ধকারটা যেন নড়ে উঠল। আর আমার সমস্ত ইন্দ্রীয় চিৎকার করে এন বলে উঠল। পালিয়ে যা। একে একে আলো নিভিয়ে অন্ধকার এগিয়ে আসতে শুরু করল আমার দিকে। আমি তখন দৌঁড়াচ্ছি। অন্ধকার ঘাড়ের উপর এসে পড়েছে প্রায়। এমন সময় ঘাড়ের কাছে এক্টা ঠাণ্ডা চেনা স্পর্শ। আর ফিসফিসে শব্দ। "দাদুভাই, আমার সাথে এসো। সামনে দেখি সিড়ি।শেষ অবধি সিড়িতে উঠতে শুরু করলাম, তারপর আর কিছু মনে নেই।
চোখ খুলে দেখি মুখের উপর ঝুঁকে পড়া অনেক অনেক মাথা। ছোটকাদাদু, মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছেন। জানালা খোলা....
দাদুকে বলছেন ছোটকাদাদু, দাদা বৌদি একেও নিশ্চয় এই ঘর নিয়ে গল্প শুনিয়েছে। এই পোড়ো ঘরের আলমারীতে খুলি দেখে নিশ্চয় ভয় পেয়েছে। আমি মুখটার দিকে চেয়ে রইলাম। সেই কিশোরের মুখটা বসানো। ছোটকাদাদু, মিনতিমাখা চোখে আমার দিকে তাকালেন, তারপর বাঁদিকের দেওয়ালের দিকে তাঁর দৃষ্টি চলে গেল। সেখানে পুলিশের ইউনিফর্ম পরে বসে আছেন সেই বন্দুকধারী প্রৌঢ়। আমার বুড়ো দাদু। আশ্চর্য, গোটা বাড়িতে ওনার এ বয়সের ছবি আর নেই।
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments