মিঠি Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#গল্প --মিঠি
========================
কোন হাওয়া নেই ,বাতাস নেই অথচ বাগানের দোলনাটা কি করে দুলছে ! প্রথমে মৃদু ,ধীরে ধীরে বেগ বাড়ছে।
সৃজনী দোতলার ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে ,স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেইদিকে।যেদিন থেকে এই হাভেলীতে পা দিয়েছে তার পরের দিন থেকেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি তার শিরা -উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত ।কেউ আছে ! কেউ আছে! অলক্ষ্যে সে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে ।
ইমলী হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে আসে সেখানে , বলে--ভাবী , তোমার চায় ।পিয়ে নাও ।নহিতো ঠন্ডা হয়ে যাবে।
বলে ,টি টেবিলে নামিয়ে রাখে।পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে ভাবীর কাছে ।সৃজনী তার কথার উত্তর না দিয়ে শুধু হাতের ইশারায় দেখায় বাগানের দোলনাটার দিকে।
ইমলী রেলিং ধরে তাকায় সেদিকে , সত্যি তো ঝুলাটা ঝুলছে কি করে !
দোলনাটা ক্রমে আরো আরো জোরে ,আরো জোরে দুলতে থাকে ।
সৃজনী ভয় পেয়ে হাত সরাতে গিয়ে ইমলীর হাতে ছোঁয়া লাগতেই, শক্ত করে চেপে ধরে তার হাত।আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ইমলীকে বলে--ইমলী আমার খুব ভয় করছে রে এখানে।
ইমলীর বয়স কম হলে কি হবে ,যথেষ্ট সাহসী ও শক্ত মনের মেয়ে সে।বলে--ওখানে হয়তো বাতাস দিচ্ছিল তাই ঝুলাটা ঝুলছিল।ডরনা মত ভাবী।
যদিও মনে মনে তারও প্রশ্ন, কি করে ঝুলাটা ঝুলছে !
সে ভাবীর হাত ধরে ঘরের দিকে নিয়ে যায় ।যেতে যেতে সৃজনী পেছনে ফিরে তাকায়, দেখে,দোলনাটা আর দুলছে না।থেমে গেছে,স্তব্ধ হয়ে গেছে।
সৃজনী ভালোবেসে বাড়ির অমতে বিয়ে করে অভিলাষকে ।অভিলাষ বাঙালী নয় ,মাড়োয়ারী ।কলকাতায় ওর ব্যবসার কাজে যে অফিসে টেন্ডার সাবমিট করতে যেত সেই অফিসে সৃজনীকে বেশ কয়েকবার দেখে ভালো লেগে যায় তার।সৃজনীও আলাপ পরিচয়ের গন্ডী পেরিয়ে আরো কাছাকাছি আসে অভিলাষের ।ঘনিষ্ঠ হয় ওরা।তারা দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার।কিন্তু সৃজনীর বাড়ির কেউই মেনে নিতে পারেনা অবাঙালী অভিলাষকে ।শেষপর্যন্ত ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে।এরপরই অভিলাষ ওকে নিয়ে আসে তাদের এই হাভেলীতে ।
শহরের উপকণ্ঠে ,একটু নিরিবিলি ও মনোরম জায়গায় এই হাভেলী ।চারিদিকে সবুজের সমারোহ ।প্রথম দিন জায়গাটা দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিল সৃজনীর ।
অভিলাষের বিশাল পৈতৃক ব্যবসা ।বাবা ,মা , দাদা কেউই আর জীবিত নেই।তাই সমস্ত ব্যবসা তাকে একাই সামলাতে হয় ।তার বড়ভাবী থাকে নিজের বাপের বাড়ি ।ব্যাস এইটুকুই জানে সৃজনী ,এর চেয়ে বেশি কিছু তার জানা নেই ।
ইমলী বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে ।অভিলাষের ড্রাইভার আনোয়ার চাচা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে বাড়ি দেখভাল করার জন্য ।আনোয়ার চাচা থাকে হাভেলীর পেছনে অ্যাটেনডেন্টদের যে দুটো ঘর আছে তার একটায় ।
এছাড়াও পুরনো একজন কাজের লোক আছে ,জানকী মউসী ।সে রান্নাঘরের পাশে একটা ঘরে থাকে,ইমলীরও সেখানেই স্থান হলো।
এই হলো অভিলাষের বাড়ির সদস্য সংখ্যা ।
যেদিন সৃজনী অভিলাষের সাথে এখানে আসে তার পরেরদিন ছিলো রিসেপশন ।খুব বেশি কাউকে ডাকা হ্য়নি ।অভিলাষের কয়েকজন বন্ধু, তাদের স্ত্রী ও বাচ্চারা ।হই-হুল্লোড় করে ,খাওয়া দাওয়া সেরে তারা রাত দশটা নাগাদ চলে যায় সৃজনীকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ।অভিলাষ গেস্টদের বাইরে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যায় ।
নিচের সেই বিশাল হলঘরে সৃজনী তখন একা।ঝলমলে শাড়ি ,গয়নায় ঝকঝক করছে তার রূপ।একমুহুর্তে বাড়িটা যেন খালি হয়ে গেলো।সৃজনীর মনে হচ্ছিল এই বিশাল হলঘরে সে যেন হারিয়ে যাবে।ওইটুকু সময়েই নিজেকে কেমন যেন ভীষন একা মনে হলো তার ।ক্লান্ত লাগছিল ।সামনের একটা গদীমোড়া সোফায় নিজের শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল সে।হঠাৎই একটা বাচ্চা মেয়ের মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলো ।চমকে পাশে তাকিয়ে দেখে একটা মোবাইল সোফার ওপরে।সেটার আলো জ্বলছে আর কি একটা যেন গেম চলছে।অদ্ভুত লাগে তার , বসার সময়ে এটা তো তার নজরে আসেনি।তাহলে এটা কি করে এলো এখানে ! মনে মনে ভাবে সারাদিনের ক্লান্তিতে ,অবসন্ন মনে সে হয়তো খেয়াল করতে পারেনি।পরক্ষণেই মনে হয়, এটা তো ওর কিংবা অভিলাষের মোবাইল নয় ।তাদের দুজনেরই আইফোন।ভালো করে তাকিয়ে দেখে সেটা অন্য কোন কোম্পানির মোবাইল ।ভাবে , যাঃ, গেস্টদের কেউ ফেলে গেলো না তো !সঙ্গে সঙ্গে সে উদ্যত হয় বাইরে যাওয়ার জন্য কিন্তু দেখে অভিলাষ ঢুকছে ঘরে।সে বলে--অভি, দেখো তোমার গেস্টদের কেউ বোধহয় ভুলে মোবাইলটা ফেলে গেছে।
অভিলাষ বলে--কই দেখি।কিন্তু সবাই তো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে।ঠিক আছে, ফোন করে জেনে যার মোবাইল কাল তাকে দিয়ে দেবো।দাও ফোনটা।
সৃজনী পাশে ঘুরে মোবাইলটা নিতে গিয়ে দেখে ,কোথায় মোবাইল! কিচ্ছু নেই।
অবাক হয়ে বলে--এখানেই তো ছিলো ।এখন নেই ।কোথায় গেলো ? ঘরে তো আর কেউ আসেনি।
অভিলাষ হেসে বলে--যাবে কোথায় ? তাহলে ভুল দেখেছো।চলো অনেক রাত হয়েছে ।ফ্রেশ হয়ে ঘুমোতে হবে।ভীষন টায়ার্ড লাগছে।
বিস্মিত সৃজনী ওপরে যেতে যেতে বারবার ফিরে তাকায় সেই জায়গাটায় যেখানে ফোনটা ছিলো।
দুদিন পর অভিলাষ ব্যবসার কাজে মুম্বই যায় ।কাজ সারতে পাঁচ -ছয় দিন লাগবে।যাওয়ার আগে ইমলী ও জানকী মউসীকে বারবার বলে যায় সৃজনীর খেয়াল রাখতে।
অভিলাষ চলে গেলে সৃজনী কিচেনে জানকী মউসীর কাছে যায় ।মউসী তখন রান্নায় ব্যস্ত ।
এই জানকী মউসীকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে সৃজনীর।ভীষন চুপচাপ ।জিজ্ঞেস করলে দুএকটা কথা বলে।গলার স্বরটা মোটা ,খসখসে ।সাজপোশাকও অদ্ভুত ।কাঁচাপাকা একমাথা চুল ,ওপরে চূড়ো করে বাঁধা , চোখে গাঢ়, মোটা করে কাজল , নাকে বিশাল এক ঢাউস রূপোর নাকছাবি , কানে ইয়া বড় বড় রূপোর কানপাশা,গলায় মোটা একটা কালো সুতোর মধ্যে বাঁধা একটা হনুমানজীর লকেট, হাতে মোটা মোটা রূপোর কড়া আর ক্যাটক্যাটে রঙের শাড়ি অদ্ভুত ভাবে পরা।বিধবা না সদবা বোঝা যায় না।সে গিয়ে জিজ্ঞেস করে-- মউসী তুমি অনেকদিন এই বাড়িতে আছো ,তাই না।
কোন কথা না বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ।
-- এই বাড়িতে আগে অনেক লোকজন ছিলো ,তাই না।
আবারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ।
--মউসী ,একটা কথা বলবে ?
এবার সন্দেহজনক ,কৌতূহলী চোখ নিয়ে সে সৃজনীর দিকে তাকায়।
সৃজনী একটু ইতস্তত করে বলে --আচ্ছা, এই বাড়িতে এসে থেকে দেখছি অদ্ভুত সব ঘটে ।তুমি কিছু জানো ?
অবাক হওয়ার ভান করে সে দুদিকে মাথা নেড়ে না জানায়।
কথা আর এগোয় না।সৃজনী বুঝতে পারে, এর কাছ থেকে কিছুই জানা যাবে না।
সেইসময়ে ইমলী একটা পেয়ারা চিবোতে চিবোতে লাফিয়ে লাফিয়ে রান্নাঘরে আসে আর বলে --ভাবী চলো তোমার চুলে তেল মালিশ করে দি , ফির নাহা - ধো লো।
অগত্যা সৃজনী রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যায় ইমলীর সাথে ওপরে।
যেতে গিয়ে অভিলাষের দাদা বৌদির ঘরের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে যায় সে।
ইমলীকে বলে -- যা তো ,আমার ঘর থেকে চাবির গোছাটা নিয়ে আয় তো।
ইমলী চলে যায় চাবির গোছা আনতে ।চাবি নিয়ে এলে সেই ঘর খুলে ভেতরে ঢোকে সৃজনী ।বিশাল বড় ঘর।দামী আসবাবপত্রে পরিপাটি সাজানো গোছানো।ক্যাবিনেটের ওপরের দেওয়ালে একটা মিষ্টি বাচ্চা মেয়ের ছবি।মনমাতানো হাসিমুখ ।আনুমানিক চার -পাঁচ বছর বয়েস হবে।ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সে ছবিটার দিকে।
ইমলী এগিয়ে এসে বলে--ইঠো অভিলাষ দাদাবাবুর বড়ে ভাইয়াকা লড়কী আছে।মিঠি।কিতনা মিঠা নাম আউর দেখনে ভী কিতনা মাসুম ।
-- ও, তুই জানলি কি করে?
--হামাকে জানকী বুয়া বলেছে।কি সুন্দর ছবিঠো না ভাবী ?
--হ্যাঁ রে,ফুলের মত সুন্দর ।কোথায় থাকে রে ?
--এ বচ্চিঠো তো বেঁচে নেই ভাবী।
---তাই নাকি ! আহারে !
মনটা খারাপ হয়ে যায় সৃজনীর ।
দরজাটা সবসময়ই তালাবন্ধ থাকে।রোজ ইমলী ঝাড়পোঁছ করে বন্ধ করে দেয়।
অভিলাষ বাড়িতে নেই তাই সৃজনীর আর সময় কাটেনা।অন্যদিন অভিলাষ সাতটার মধ্যে এসে যায়।গল্প করে সময় কেটে যায় ।আজ তাই টিভি অন করে বসলো নিজের বেডরুমে।কিন্তু টিভি দেখতেও ভালো লাগছে না।ইমলী সেই ঘরে বসেই টিভি দেখছিল হা করে।
সৃজনী বলে--ইমলী তুই রাতের খাবারটা এখানেই দিয়ে যা।একটু শীত শীত করছে ,খেয়ে শুয়ে পড়বো।তোরাও খেয়ে শুয়ে পড় ।
ইমলী বলে---ভাবী এই সিরিয়ালঠো আর একটু আছে।দেখে খানা দেই।
--ঠিক আছে ।দেখে নে।
রাতে বিছানায় শুয়ে সৃজনীর ঘুম আসেনা।এপাশ ওপাশ করতে করতে উঠে পড়ে ।কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ।বারবার মিঠির ওই সরল ,নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।কি হয়েছিলো মেয়েটার ! এতটুকু বয়সে চলে যেতে হলো।
হঠাৎ তার মনে হলো এই নিস্তব্ধ বাড়িটার বারান্দা দিয়ে কে যেন ছুটে চলে গেলো।তারপরই বাচ্চা মেয়ের খিলখিল করে হাসি তবে খুব মৃদু।
মনে মনে ভাবে ,এ আমার মনের ভুল ।মিঠির ছবিটা দেখেছি বলেই হয়তো এমন মনে হচ্ছে ।কিন্তু এই কদিনে অনেকবার তার এমন ভুল হবে! তখন তো মিঠি বলে কেউ আছে এটাই জানতো না।তালাবন্ধ ঘরটার কথা মনে পড়ে ।কেমন যেন টানছে ওই ঘরটা তাকে।নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করেও পারলো না ।এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললো বেডরুমের ।দরজার বাইরে বারান্দায় হাল্কা আলো জ্বলছে।চারিদিক নিস্তব্ধ ।পুরো হাভেলী ঘুমিয়ে পড়েছে।ছায়া ছায়া আলো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সে এগিয়ে যায় ওই তালাবন্ধ ঘরটার দিকে।তালা খুলে একটু চাপ দিতেই ক্যাচ করে শব্দ হয়ে দরজাটা খুলে যায় ।ঘরের ভেতরটা অন্ধকার শুধু বিছানার ওপর আলোর রশ্মি ।ঘরের ভেতর থেকে একটা হিমশীতল ঠান্ডা স্রোত বেরিয়ে এসে যেন তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে।অন্ধকার ঘরে শুধু বিছানার ওপর থেকে সূক্ষ্ম আলোর রশ্মি বেরিয়ে আসছে।ভালো করে দেখে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে উপুর হয়ে মন দিয়ে মোবাইলে কি যেন দেখছে।সেটারই আলো পড়েছে তার মুখে।বাচ্চাটার শুধু বুক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ,বাকিটা নরম লেপের ভেতরে ,লেপটা মাথার অর্দ্ধেক পর্যন্ত তোলা।
মিষ্টি হাসি হাসি মুখে ডুবে আছে মোবাইলে ।চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায় সে।বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডটা এত জোরে শব্দ করছে যেন কানে তালা লেগে যাবে ।হাত ,পা অবশ হয়ে যাচ্ছে ।চোখ বিস্ফারিত, মুখটা তার নিজের অজান্তেই হা হয়ে গেছে।কিন্তু বাচ্চা মেয়েটার মুখটা যেন অবিকল মিঠির মত ! মিঠি কি করে এলো এখানে ! ও কি বেঁচে আছে ?বেঁচে থাকলেও তালাবন্ধ ঘরে ঢুকলো কিভাবে ? কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একরাশ প্রশ্ন তার মাথার ভেতর পোকার মত কিলবিল করছে।এসব ভাবনার মাঝেই সে দেখে বাচ্চা মেয়েটার লেপে মোড়া মাথার পেছন দিক থেকে কয়েকটা ভয়ানক ,বীভৎস, অমানুষিক মুখ আবছা আবছা করে ফুটে উঠছে অন্ধকারের ভেতর থেকে ।যেন সাক্ষাত মৃত্যু ।তাদের চোখগুলো পাশবিকতা ও হিংস্রতায় জ্বলছে।তাদের ধারালো সরু ছুরির ফলার মত নোখসমেত হাতগুলো এগিয়ে আসছে বাচ্চাটার দিকে ।সহ্য করতে পারেনা সৃজনী এই দৃশ্য, ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় কিন্তু পাদুটো যেন মেঝেতে পুঁতে দিয়েছে কেউ।এরা কারা ? কোন অন্ধকারের ভয়াল ভীষন প্রাণী !
পরক্ষণেই দেখে ,সেই অন্ধকারের জীবেরা বাচ্চা মেয়েটাকে ঢেসে লেপসমেত চেপে দিয়েছে।মুখ থুবড়ে পরে আছে মেয়েটা ,ছটফট করছে।আরেকটা হাত উঠে আসে বালিশ নিয়ে, সেটা দিয়ে চেপে ধরে ।কিছুক্ষণ সমস্ত লেপটা আলো আঁধারিতে কাঁপতে থাকে তারপর সব থেমে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায়।কেবল ঝিঁঝিপোকার ডাক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।ভয়ে, আতঙ্কে দিশেহারা সৃজনী একটা চীৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে।তার চীৎকার শুনে ছুটে আসে ইমলী,জানকী মউসী ।
ভোররাতে জ্ঞান ফেরে সৃজনীর ।সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে,এদিকে ওদিক তাকায় ।আগের রাতের স্মৃতি সে ভোলেনি।ইমলী তাকে ধরে শুইয়ে দেয় ।
ইমলী তাকে বলে--কাল বড়দাদাবাবুর ঘরের দরওয়াজার সামনে কেন গিয়েছিলে ভাবী ,আর তালাঠো ভি কিস লিয়ে খুলেছিলে?
জানকী ইশারায় চুপ করতে বলে ইমলীকে ।
রাতের দেখা দৃশ্যগুলো পরপর ভাসতে থাকে সৃজনীর চোখের সামনে, গলাটা তার এখনো শুকিয়ে আছে।ক্ষীণকন্ঠে ইমলীকে বলে--একটু জল দে ইমলী।জল খেয়ে বলে--জানকী মউসী ,তুমি জান মিঠি কিভাবে মারা গিয়েছিল? যদি জেনে থাকো আমাকে বলো।
জানকী বলে--শরীর বহুত খারাপ হয়ে মারা গিয়েছিল ছোটিবিবি।
আনোয়ার চাচাও ছিলো ,সে বলে --জানকী তুমি যদি সবটা বলো ভালো হয় ।ভাবী জী নিশ্চয়ই কোনও কারণে জানতে চাইছে।
সৃজনী বলে--আনোয়ার চাচা ,আমার মনে হয় মিঠি শরীর খারাপ হয়ে মারা যায়নি, ওকে মেরে ফেলা হয়েছিলো ।
চমকে ওঠে জানকী।ওর চমকানো লক্ষ্য করে আনোয়ার চাচা ওকে চেপে ধরে সব বলতে বাধ্য করে।
জানকী জানায় যে,মিঠির মেয়ে জন্ম ওরা মানে দাদাবাবুর মা ,বাবা ,এমনকি মিঠির বাবা মেনে নিতে পারেনি।তারা আশা করেছিলো ছেলে হবে।তাই মিঠির মাকেও অনেক গালমন্দ সহ্য করতে হয়েছে।
মিঠিকে অনেকবার মেরে ফেলার চেষ্টাও করেছে কিন্তু পারেনি।মিঠির মাও ভাবতে পারত না যে মিঠি শুধুমাত্র মেয়ে বলে তার পরিবারের লোকেরা গোপনে এতবড় ষড়যন্ত্র করতে পারে।জানকী এটাও বলে যে,ওর প্রথম থেকেই সন্দেহ হতো কারণ ওদের হাবভাব সেরকমই ছিলো।
মিঠির যখন ছয় বছর বয়েস তখন মিঠির মায়ের ভীষন শরীর খারাপ হয় ।সেইসময়ে তার শাশুড়ি মা বলেন,কিছুদিন বাপেরবাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নিতে ।মিঠি এখানেই থাকবে।
মিঠির মা অনিচ্ছাসত্বেও বাপেরবাড়ি চলে যায় ।সে চলে যাওয়ার পরেরদিন সেই সুযোগ এসে যায় ।মিঠি ভীষন মোবাইল দেখতে ভালোবাসতো ।মিঠির বাবা সেই রাতে নিজের ফোনটা দেয় মিঠিকে গেম খেলার জন্য ।খুব খুশি হয়ে মিঠি ছুটে গিয়ে ফোনটা নিয়ে লেপের তলায় ঢুকে পড়ে ।সে যখন মন দিয়ে মোবাইল ঘাঁটছে তখন সন্তর্পণে ঘরে ঢোকে মিঠির বাবা,দাদু ,ঠাকুমা।এরপর শ্বাসরোধ করে তাকে মেরে ফেলে।বলেই কাঁদতে থাকে জানকী।মনে পড়ে যায় তার আবার সেই দৃশ্য ।
সৃজনী বলে --কেন মিঠিকে মেরে ফেললো?সে শুধু মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে !
--ওরা মিঠিকে অপয়া ভাবত।ওর জন্মের পর ব্যবসা নাকি খারাপ চলছিল।অনেক কেসও হেরে গিয়েছিল ।
---সত্যিই! কি পৃথিবীতে বাস করছি আমরা।আচ্ছা তুমি কি করে এতসব জানলে ?
---মিঠির মা চলে যাওয়ার পর আমিই ওর দেখভাল করতাম।তাই রাত্রে দেখতে এসেছিলাম ওর কিছু লাগবে নাকি।আর বাড়ির সবাই ভেবেছিল আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।
---আর একটা কথা বলো ।তোমার ছোটদাদাবাবু কিছু জানেনা ?
--না ,দাদাবাবু তখন এখানে থাকত না ।কি একটা পঢ়াই করতে বিদেশ গিয়েছিল ।তবে এরপর ওরাও বেশিদিন বাঁচেনি।ভগওয়ান ওদের সহি সাজা দিয়েছে।
---আর মিঠির মা.....তার কি হলো ?তাকে বাপেরবাড়ি পাঠিয়ে দিলো ।
----বড়িভাবীর মাথার গন্ডগোল হলো ,মাইকে মে পাঠিয়ে দিলো।
কি মারাত্নক ঘটনা !মনে মনে ভাবে সৃজনী ।
আনোয়ার চাচা ইমলীকে বলে--বেটি ভাবী জি কে দেখবি।চোখে চোখে রাখবি।
সেইদিন সন্ধ্যেবেলা হাত ,পা ধুয়ে আনোয়ার দোয়ায় বসে সৃজনীর মঙ্গল চেয়ে ।আল্লার কাছে দোয়া করে---লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হাজিমুল হালিম ,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহা রাজুল আরশিল আজম ,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাবুস আরশিল আজিম , লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি -ওয়া রাব্বুল আরশিল করিম.....
আনোয়ার দোয়া শেষ করে জানকী মউসীর কাছে যায়।জিজ্ঞেস করে --মাই ,সত্যি করে বলতো, মিঠি বেটি মারা যাওয়ার পর তাকে কি করেছিলো ?
--ওরা বলাবলি করছিলো ,ছুপকে সে মিঠি বিটিয়াকে বাগিচার পিছে যে কলাবাগিচা আছে ওখানে পুঁতে দেবে।কোই জানতে পারবে না।
পরেরদিন ভোরবেলা আনোয়ার কোদাল নিয়ে কলাবাগিচা তে আসে ।এরপর খুঁড়তে শুরু করে ।অনেক সময় পেরিয়ে যায়।এই শীতেও মানুষটা ঘেমেনেয়ে একসা।অতঃপর মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে একটা বাচ্চাদের চুড়ি পায়।বুঝতে অসুবিধে হয়না এটা মিঠির চুড়ি।বুকের ভেতরটা মুঁচড়ে ওঠে তার।আরেকটু খুঁড়ে পায় একটা মোবাইল ।পুরোদমে এবার খুঁড়তে শুরু করে,বেরিয়ে আসে ছোট্ট মেয়েটার কঙ্কাল,হাড়গোর।একটা লাল কাপড়ে সেগুলো যত্ন করে ওঠায় তারপর ফুলের বাগানের একপাশে মাটি খুঁড়ে শুইয়ে দেয় পরম যত্নে লাল পুঁটলিটা।মোবাইলটাও রেখে দেয়।
মাটি চাপা দিয়ে ওপরে ছড়িয়ে দেয় গোলাপের পাপড়ি আর তার সাথে ঝরে পড়ে তার দুফোঁটা চোখের জল।
*****************************************
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments