Header Ads Widget

দ্বীপান্তরের_আর্তনাদ

দ্বীপান্তরের_আর্তনাদ Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)







#দ্বীপান্তরের_আর্তনাদ


কলকাতা বিমানবন্দর থেকে মুক্ত আকাশের বুকে গা ভাসালো সুবিশাল এক বিমান। গন্তব্য সাগরের বুকের ছোট্ট শান্ত আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ। অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে সেই বিমান বহন করে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতা লালবাজার গোয়েন্দা দপ্তরের দুই দক্ষ গোয়েন্দাকে....মৃণাল কান্তি সান্যাল এবং ত্রিনাথ দত্ত। যদিও মৃণাল আর ত্রিনাথের মধ্যে এক অন্য সম্পর্ক আছে, তা হলো তারা দুজন বাল্যবন্ধু। ছোটবেলা থেকেই দুই বন্ধু স্কুলের প্রথম সারির ছাত্র ছিল কর্মজীবনেও সেই প্রথম সারির স্থান তারা অধিকার করে রেখেছে। দুই বন্ধু মিলে বহু জটিল সমস্যার সমাধান করেছে। তবে আজ তারা কি জন্য যাচ্ছে সেই শান্ত মনোরম দ্বীপপুঞ্জে?
-" এই মৃণাল আমরা হঠাৎ আন্দামান যাচ্ছে কেন রে কেসটা কি বলতো"?
মৃণালের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ। বইয়ের পাতা থেকে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে পুনরায় বইয়ের মধ্যে মনোনিবেশ করল মৃণাল। এইবার একপ্রকার প্রায় জোরে ধাক্কা দিয়ে একটু গম্ভীর গলায় ত্রিনাথ জিজ্ঞেস কর।
- " কি রে বল না"?
বন্ধুকে উত্তপ্ত হতে দেখে বইয়ের পাতা থেকে মুখ সরিয়ে একইভাবে মৃদু হেসে মৃণাল বলল
- " আরে কেস আবার কি হবে বস ছুটি দিয়েছেন তাই ঘুরতে যাচ্ছি"।
এই কথাটা বলে পুনরায় বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে যাচ্ছিল মৃনাল কিন্তু তার আগেই ভুরু কুঁচকে আবার ত্রিনাথ জিজ্ঞাসা করলো,
- " এই দাঁড়া দাঁড়া দাঁড়া....কি হয়েছে বস ছুটি দিয়েছে....আমরা ঘুরতে যাচ্ছি...না মানে লালবাজারের বড় অফিসার মৃণাল কান্তি সান্যাল কিনা ঘুরতে যাচ্ছে!!! এইটা আমায় বিশ্বাস করতে হবে...." কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠলো ত্রিনাথ।
ত্রিনাথের কান্ড দেখে এইবার একপ্রকার বিরক্ত হয়ে মৃণাল বলল
-"আহঃ কি হচ্ছেটা কি ফ্লাইটে লোক আছে তো নাকি কিভাবে সবাই"?
মৃণালের কথায় ত্রিনাথ বলল,
- "সরি রে ভাই একদম খেয়াল নেই!!!"
ত্রিনাথের কান্ড দেখে আবারও একবার মুচকি হেসে মৃণাল বলল ,
-"তুই আর পাল্টালি না রে ত্রিনাথ....শোন তবে।"
মনোযোগ সহকারে মৃণালের দিকে তাকালো ত্রিনাথ মৃণাল নিজের বই টা বন্ধ করে বলতে শুরু করল,
- " আমার আন্দামান যাচ্ছি তার কারণ আগের দিন স্যার আমায় কথায় কথায় বললেন ওখানের সেলুলার জেলের একটা সেলের কথা,যেটা একটা টুরিস্ট স্পট। ওখানেই নাকি আচমকা নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে! মাঝরাতে নির্দিষ্ট একটি সেল থেকে গোঙানির শব্দ আসছে বা অস্ফুট আর্তনাদের.... "।
মৃণাল কে থামিয়ে হঠাৎ ত্রিনাথ বলে উঠলো,
-"আরে এটাতো সিম্পল.....এটা নিশ্চয়ই কোনো চোরাচালানকারী দল বা কোন টেরোরিস্ট আরে তোর মনে নেই এরকম একটা দলকে আমরা ধরেছিলেন আগেরবার চায়না টাউন থেকে???"
-" এই সন্দেহটা তো আমিও করেছিলে ত্রিনাথ কিন্তু এইটা অতটা সহজ নয় ওখানকার পুলিশ রা আশেপাশে সমস্ত জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে কিন্তু কোন এভিডেন্স পায়নি এমনকি ওখানকার নাইটগার্ডের থেকেও বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি কেউ কিছু দেখেনি শুধুমাত্র শুনেছে ।বহু নাইটগার্ড এও বলছে এটা নাকি ভূতের উপদ্রব"।
এতক্ষণ সব ঠিক ঠাকই চলছিলো ত্রিনাথের কিন্তু অকস্মাত্ মৃণালের মুখ থেকে ভুতের কথা শুনে সব বেঠিক হয়ে গেল গোয়েন্দা দপ্তরের আরেক বাঘা গোয়েন্দর ত্রিনাথের।
-" কি বলছিস রে....ভূত...না মানে এখানে ভূত কোত্থেকে এলো?" কাঁপা গলায় কোনমতে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
-"কেন তুই কি ভয় পাচ্ছিস নাকি..... আরে ভয় পাস না এ তোর চিরাচরিত পুরনো ভূত নয় যে মানুষ দেখলেই দমদম ঘাড় মটকে দেয় ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেয়....এ ভূত খালি আওয়াজ শোনায়....গোঙানির আওয়াজ আর অস্ফুট আর্তনাদ...." এই বলে একটু হেসে ত্রিনাথের দিকে তাকাল মৃণাল।
- " এই মৃণাল দেখ এসব ভূত-প্রেত নিয়ে একদম মজা করবি না" একই রকম কাঁপা গলায় উত্তর দিল ত্রিনাথ।
দুই বন্ধুর কথোপকথন এর মাঝে ফ্লাইট ল্যান্ড করল পোর্ট ব্লেয়ার বিমান বন্দরে। বিমানবন্দরে তাদের জন্য সরকারি কর্মচারী অপেক্ষা করছিল সেখান থেকে তাদের নিয়ে ‌গেল সোজা সরকারি গেস্ট হাউসে‌‌।
-"যাক বাবা অবশেষে পৌছালাম এবার কি করবি মৃণাল?"
সরকারি গেস্ট হাউসের খাটে বসে পা দোলাতে দোলাতে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।কি একটা যেন ভাব ছিলো মৃণাল তাই ত্রিনাথের প্রশ্ন তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি।
-"আরে ওই শুনলে কি বললাম"? প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
-"হ্যাঁ....কি বলছিস বল...খেয়াল করি নি!" বলল মৃণাল।
- "খেয়াল যে করিস না সে আমি বুঝতেই পেরেছি....সারাদিন কি যে এত চিন্তা করিস ভগবান জানে...বলছিলাম যে এরপর আমরা কি করব?" পুনরায় প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
-"ফ্রেশ হয়ে নিয়েই আমরা বেরোবো" উত্তর দিলো মৃণাল।
- "কোথায় যাব?" জিজ্ঞাসা করল ত্রিনাথ।
টাওয়াল আর জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে মৃণাল বলল,
- "আপাতত সেলুলার জেল।"
এরপর সরকারি গাড়ি দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে এসে থামল সেলুলার জেলের মেইন গেটে। গাড়ির হর্ন শুনে সুবিশাল গেট খুলে দিল সরকারি গার্ড। মৃণাল আর ত্রিনাথ চলল জেলের সেন্ট্রাল হলে চিফ সিকিউরিটি ইনচার্জের সঙ্গে কথা বলতে।
- "গুড আফটারনুন স্যার...আসুন আসুন বসুন" মৃণাল আর ত্রিনাথ কে অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন মাঝবয়সী অবাঙালি চিফ সিকিউরিটি ইনচার্জ। এরপর সেই জেলে ঘটে যাওয়া উপদ্রব এর বর্ণনা করতে থাকেন সেই সিকিউরিটি ইনচার্জ।
- "আচ্ছা আপনারা আশপাশ টা ভালো করে দেখেছেন" প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
- "হাঁ স‍্যার...সব দেখেছি" ভাঙাচোরা বাংলায় উত্তর দিলেন সিকিউরিটি ইনচার্জ।
-"আমায় নিয়ে চলুন তো আমি নিজে একবার আশপাশটা ঘুরে দেখব" আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল ত্রিনাথ।
"সাবধানে যাস কিন্তু ভুত-প্রেত থাকতেই পারে" ত্রিনাথের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলল মৃণাল। -"ভাল হচ্ছেনা কিন্তু মৃণাল" করুন গলায় বলে উঠল ত্রিনাথ।
মনে মনে একটু হেসে নিয়ে মৃণাল বলল,
- "চল আমিও যাব"।
- "তুই কোথায় যাবি" প্রশ্ন করলে ত্রিনাথ।
-"দেখি ওই সেলের আশেপাশে যারা সিকিউরিটি ছিল তারা একটু জিজ্ঞাসাবাদ করব..."বলল মৃনাল।
এই বলে দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়লো তাদের নির্দিষ্ট কাজে। কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল কিন্তু কোন নির্দিষ্ট তথ্য হাতে এলো না দুই বন্ধুর। সারা দিনের ক্লান্তিতে রাত্রে ত্রিনাথ ঘুমিয়ে পড়লেও মৃণালের চোখে ঘুম নেই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অগণিত প্রশ্ন।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বিছানায় আরি মুড়ি দিতে দিতে ত্রিনাথ দেখলো মৃণাল ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে।
-" কিরে তুই ঘুমাস নি সারারাত" হাই তুলতে তুলতে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
- "ওই আর কি" বলল মৃণাল।
-"আরে ভাই...এখানে পায়চারি করলে কি তুই তো সব উত্তর পেয়ে যাবি সমস্যাতো জেলের মধ্যে...... ছাড় এসব চ চা খাই একটু" একরকম ঝিমোতে ঝিমোতে বলল ত্রিনাথ
-"রাইট....একদম ঠিক বলেছিস ত্রিনাথ" প্রসন্ন মনে বলে উঠল মৃণাল।
"আরে কি রাইট রং করছিস" মৃণালের কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে বললো ত্রিনাথ"
ফোন নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে যেতে মৃণাল বলল ,
-"পরে বলছি সব"।
এরপর সারাদিন এদিক-সেদিক ঘুরে আন্দামানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলো দুই বন্ধু। খাওয়া-দাওয়া হই হুল্লোর করে দিন শেষে যখন দুজনে বাড়ি ফিরল তখন মৃণাল বলল ,
-"আচ্ছা ত্রিনাথ আজকে রাতে একটা অ্যাডভেঞ্চারাস কিছু করলে কেমন হয়"।
- "মানে!!...এই তুই কি বলতে চাইছিস বলতো মৃনাল" হতবাক দৃষ্টিতে মৃণালের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
- "চ রেডি হয়ে নে একটা জায়গায় যাব" বলল মৃণাল।
-"কিন্তু যাব টা কোথায়?" জিজ্ঞাসা করল ত্রিনাথ।
মৃনালের থেকে কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় অগত্যা রেডি হয়ে নিয়ে ত্রিনাথ বেরিয়ে পড়ল মৃনালের সঙ্গে। কিন্তু যেই গন্তব্যে মৃণাল ত্রিনাথ কে নিয়ে যাচ্ছিল তার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলনা ত্রিনাথ। সরকারি গাড়ি গিয়ে থামল সেলুলার জেলের মেন গেটে।
-"এই আমরা এখানে কি করছি" বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল ত্রিনাথ।
গাড়ি থেকে নেমে জেলের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল ,
-"ওই যে বললাম অ্যাডভেঞ্চারাস কিছু.... আজকে রাতে আমরা এই সেলুলার জেল এই থাকবো"।
অকস্মাত্ অ্যাডভেঞ্চারের এই সিদ্ধান্তে ত্রিনাথ খুব একটা খুশি ছিল না তাই মৃণাল কে আর প্রশ্ন না করে চুপচাপ তার সাথে সেন্ট্রাল হল এ গিয়ে প্রবেশ করল ত্রিনাথ। দুজন সিকিউরিটি অফিসারের সঙ্গে রাত্রি জাগরন এর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মৃণাল, যদিও রাত একটু গভীর হতেই সিকিউরিটি অফিসার এবং ত্রিনাথ একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। রাত্রি যখন ঘন কালো তখন মৃণাল স্পষ্ট শুনতে পেল সেই আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ কানে যেতেই সকলের তন্দ্রা কেটে গেল ।মৃণাল সেই আর্তনাদ লক্ষ্য করে ছুট লাগালো। ত্রিনাথ অবশ্য "ভূত ভূত" বলে কাঁপতে লাগলো। সেন্টার
হলকে কেন্দ্র করে রয়েছে চারটি উইং তার সব থেকে ছোট উইং টার দ্বিতল থেকে আওয়াজটা আসছিল বলে সন্দেহ মৃণালের। সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হলো যখন সে উইং টার কাছে যেতেই আওয়াজটা আরো দৃঢ় শোনাতে লাগলো। দুই তলায় উঠতে উঠতেই আবার যেন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল কিন্তু সেই মিলিয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে মৃণালের কানে যা গেল তা মৃণালের পূর্ব পরিকল্পিত সমস্ত হিসাব একেবারে লন্ডভন্ড করে দিল, সে শুনতে পেলো কে যেনো অস্ফুট স্বরে বলছে.......
- "বন্দেমাতরম"।

পরদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মৃণাল ওই নির্দিষ্ট সেলটিকে ভালো করে দেখতে লাগল।প্রথমে এমনিভাবে ও পরে মেটাল ডিটেক্টর এনে পুরো সেলটাকে চেক করে কোন উপায় হলো না। এরপর গোটা একদিন সে নিজেকে সরকারি গেস্ট হাউসে বন্দী করে রাখল কোন কিছু ভেবে কূলকিনারা করতে পারছে না সে তার মাথায় খালি একটা কথাই ঘুরছে,
- " বন্দেমাতরম"।
তারপর দিন সকাল হতে না হতেই মৃণাল কোথায় যেন একটা বেরিয়ে গেল। ফিরল একরাশ ধুলো জমা পুরনো ফাইল পত্র নিয়ে। ত্রিনাথ জিজ্ঞাসা করল,
- "এসব কি এনেছিস....কি করবি এগুলো দিয়ে!!!"
- "না তেমন বিশেষ কিছু নয় শুনেছি এই আন্দামানের মেয়েরা নাকি খুব ভালো হয় তাই একটা ভালো মেয়ে দেখে ভাবছি তোর বিয়েটা এখানেই দিয়ে দেব ।তাহলে অন্তত তোকে নিয়ে তোর শ্বশুর বাড়ি ঘুরতে আসার ছুতোয় দু-একবার এরকম সুন্দর জায়গায় বছরান্তে আসতে পারবো" হাসতে হাসতে বলতে লাগল মৃণাল।
বিয়ের কথায় ত্রিনাথ লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল,সঙ্গে সে এও বুঝল তার বন্ধু এই মুহূর্তে তাকে কিছু বলবেনা। এরপর মৃণাল আতিপাতি করে সেই ফাইলগুলো ঘাঁটতে আরম্ভ করলো আর ত্রিনাথ আন্দামান সম্পর্কিত একটা বই খুলে বসলো। এরপর বেশ কিছু ঘন্টা যাওয়ার পর মৃণাল হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল,
- "ইয়েস.... আই গট ইট!!!!!"
-"আরেহহ শান্ত হ......কি পেয়েছিস তুই?"বলে উঠলো ত্রিনাথ।
- "ত্রিনাথ আমি যা বুঝলাম তা যদি সঠিক হয় তাহলে এই কেস সলভড"।
মৃণালের কথার একাংশও ত্রিনাথ বোঝার আগে মৃনাল তাঁর ফোন নিয়ে হন্ত-দন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। প্রায় ঘন্টা খানেক পর হাসিমুখে ঘরে ফিরল মৃণাল।
-"আমি যা যা বলবো তোকে কিন্তু শুনতে হবে আর এখন কোন প্রশ্ন করবিনা" ত্রিনাথের উদ্দেশ্যে বলল মৃনাল।
-" আচ্ছা ঠিক আছে বল" মৃনাল কে আশ্বস্ত করে বলল ত্রিনাথ।
-"আজকে রাতে আমরা আবার সেলুলার জেলে থাকবো কিন্তু এইবার আমি থাকবো ছোট উইংটার দোতলার কোণার সেলটাতে আর তুই আর গার্ডরা সেন্ট্রাল হলের বাইরে অপেক্ষা করবি.... আমার কাছে হুইসেল থাকবে যদি কোন সমস্যা হয় আমি হুইসল দেবো কিন্তু হুইসেল না দেওয়া অব্দি তোরা কেউ উইং এর ধারে কাছে আসবি না" এক নিঃশ্বাসে ত্রিনাথ কে কথাগুলো বলে গেল মৃণাল।
ত্রিনাথ জানতো বন্ধুকে বাধা দেওয়া বৃথা তাই শুধুমাত্র নিস্পলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল।মৃণালের কথা মতোই কাজ হল। ত্রিনাথ মৃনাল কে দোতলার সেলে পৌঁছে দিয়ে এলো। সেলের দরজা ভেজিয়ে ফেরার আগে ত্রিনাথ মৃণাল কে বলল,
-"জানি তোকে বললেও তুই আমাকে এখানে থাকতে দিবি না কিন্তু আমায় কথা দে তুই সাবধানে থাকবি!!!"
একটু হেসে ঘাড় নেড়ে ত্রিনাথের কথার উত্তর দিলো মৃণাল। এরপর ত্রিনাথ চলে গেল মৃণালের বলা জায়গায় যেখানে সে আর বাকি গার্ডরা অপেক্ষা করবে।
রাতের অন্ধকার ক্রমে কালো থেকে আরো ঘন কালো হতে থাকলো। মৃণাল সেলের দু ফুট বাই চার ফুট ছোট্ট খোপ দিয়ে বাইরে ত্রিনাথ এবং বাকি গার্ডরা কি করছে দেখার জন্য তাকালো। এমন সময় হঠাৎ করেই গলায় তীব্র চাপ অনুভব করল সে। মৃণাল অনুভব করলো কে যেন পেছন থেকে তার তার গলাটা শক্ত হাতে চেপে ধরেছে।

-".....কি ভেবেছিলে সাহেব আমি দুর্বল.....আমায় চালাকি করে হত্যা করবে?" বজ্রসম এক কন্ঠে কে যেন বলে উঠলো।
-" আমায় ছাড়ো....আমি বাঙালি" কোনমতে উত্তর দিলো মৃণাল।
হঠাৎ করেই মৃণালের গলার চাপটা যেন কমে গেল, সেই বজ্রকণ্ঠের লোকটা খানিক চমকে বলে উঠলো,
- "কি....বাঙালি?"
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে খানিক কাশতে কাশতে মৃণাল বলল ,
-"হ্যাঁ....ঠিকই শুনেছেন সুবোধ বাবু" এবং সেই লোকটির দিকে ঘুরে তাকালো।
অন্ধকারের মধ্যেও তার চোখে উল্টোদিকের ব্যাক্তির একটা অস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়লো।অন্ধকারে চোখ প্রায় সয়ে যাওয়াতে মৃণাল দেখলো বড় বড় জটা যুক্ত চুল দাড়ি সমৃদ্ধ লোকটির ভগ্ন চেহারা,জরাজীর্ণ শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বললেন ,
-" তুমি আমার নাম কি করে জানলে.... না না না নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে.....তুমি নিশ্চয়ই ঐ সাদা চামড়ার লোকদের কোন চ্যালা চামুন্ডা" কথাটা বলতে বলতেই সেই লোকটি ফিরে আসতে লাগল মৃনালের দিকে।
-"শান্ত হও...বিশ্বাস করো আমায়....আমি একজন বাঙালি আমার নাম মৃণাল কান্তি সান্যাল আর আমি কারো চ‍্যালা চামুণ্ডা নই" মৃনাল বলল।

-" না না...তুমি মিথ্যে বলছো তুমি নিশ্চয়ই আমায় দুর্বল ভেবে মারতে এসেছ কিন্তু তা আমি হতে দেব না....আমায় এখান থেকে বের হতেই হবে ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের কাছে যেতেই হবে.... তোমরা এইরকম ভাবে ষড়যন্ত্র করে আমার কত কত ভাইদের মেরেছ" এক নিঃশ্বাসে বলে গেল সেই লোকটা।
হা হা করে হেসে উঠল মৃণাল। মৃনালের এই আচরণে খেপে উঠলো সেই লোকটি। নিজের পুরনো বজ্রকন্ঠে লোকটা আবার বলে উঠলো -"হাসছো কেন তুমি?"
-"কোথায় যাবে তুমি কাদের কাছে ফিরবে কারা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে?" লোকটিকে প্রশ্ন করল মৃনাল।
-"কারা অপেক্ষা করছে তুমি জানো না? আমার মত ভারত মায়ের বীর সন্তান যাদেরকে তোমার চক্রান্ত করে মারছো ।আমার বিপ্লবী ভাইরা অপেক্ষায় আছে আমার।কিন্তু জেনে রাখ তোমাদের মতো শয়তানের হাত থেকে আমাদের মাকে আমরা মুক্ত করবই" উদ্দীপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো সেই লোকটা।
মৃদু হেসে মিনাল বলল,
- "কিন্তু সুবোধ বাবু এ দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে....তাও বহু বছর আগে"।
-"স্বাধীন হয়ে গেছে কি বলছ কি তুমি?....না না না....এ কিছুতেই হতে পারে না তুমি মিথ্যে বলছো....আমার মা....আমার দেশ স্বাধীন হয়ে গেল আর আমি জানতেও পারলাম না..... না নিশ্চয়ই কোন চক্রান্ত" বজ্রকন্ঠে যেনো একটু আবেগের ছোঁয়া পেল মৃণাল।
-"আমি সত্যি কথা বলছি বিশ্বাস করো আমায়....এতে কোন চক্রান্ত নেই...বিশ্বাস না হলে আমার সঙ্গে চলো"
সেলের দরজার দিকে এগোলো মৃণাল। লোকটা নিশ্চুপ হয়ে মৃণাল কে অনুসরণ করল।
সেলের বাইরে বেরিয়ে এসে সেন্ট্রাল হলের দিকে আঙ্গুল তাক করে মৃণাল সেই লোকটির উদ্দেশ্যে বলল,
- "ভালো করে তাকিয়ে দেখো ওই দিকে তোমার প্রিয় তেরঙ্গা স্বগর্বে উড়ছে। দেশ আজ স্বাধীন চারিদিকে তাকিয়ে দেখো সময় কতটা এগিয়ে গেছে চারিদিকে কত উন্নতি হয়েছে"।
সেই অন্ধকারের ক্ষীণ চাঁদের আলোয় মৃনাল লক্ষ্য করলো সেই লোকটির চোখের জলোচ্ছ্বাস।

-"এতকিছু কবে হলো কখন হলো আমি যে কিছু জানতে পারলাম না আমার মা স্বাধীন হলো তার বিজয় উৎসবে আমি সামিল হতে পারলাম না" কথাগুলো বলতে বলতে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা লোকটির গাল বেয়ে পড়তে লাগলো।
-"কাঁদছো কেন সুবোধ বাবু আজকে তো তোমার উল্লাসের দিন তোমার আনন্দের দিন ।তোমাদের কষ্ট তোমাদের পরিশ্রম তোমাদের ত‍্যাগের জন্যই তো এত কিছু সম্ভব হয়েছে" হাসিমুখে সেই লোকটির উদ্দেশ্যে মৃনাল বলল।
-"হ্যাঁ...হ্যাঁ ঠিক বলেছ তুমি,সত্যি তো আমি কাঁদছি কেনো আজকে তো আমার আনন্দের দিন,এই দিনটার প্রহর ই তো আমি এতদিন ধরে গুনেছি" চোখের জল মুছতে মুছতে বলল সেই লোকটি। এরপর লোকটি তার বজ্রসম কণ্ঠে আবেগে চিৎকার করে স্বগর্বে বলতে লাগল ,
-"বন্দেমাতরম_বন্দেমাতরম.."।
সেই শব্দে সারা সেলুলার জেল কেঁপে উঠলো, ত্রিনাথ আর অন্যান্য গার্ডরা আর অপেক্ষা করতে পারলো না তারা ছুটে আসতে লাগল সেলের দিকে। অন্যদিকে মৃণাল এক অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী থেকে গেলো, সে দেখলো লোকটি আনন্দ উল্লাসে মাততে মাততে চাঁদের আলোতে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। বন্দেমাতরম ধ্বনি ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়ে অবশেষে মিলিয়ে গেলো।
অবশেষে কেস শেষ করে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো দুই গোয়েন্দা। ফেরার পথে ত্রিনাথ মৃণাল কে কেস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে সে বলে ,
-" সুবোধচরণ বিশ্বাস একজন খুবই দাপুটে বিপ্লবী ছিলেন। এই সেলুলার জেলে তিনি এসেছিলেন কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে.....কাজে অগ্রসর ও হয়েছিল,কিন্তু ফিরে যাওয়া হয়নি তার....ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অবশেষে।পরবর্তীকালে তাকে বন্দি করে অকথ্য অত্যাচার করা হয়। একদিন তিনি জেল ভেঙে পালানোর চেষ্টা করছিলেন আর ধরা পড়াতে ব্রিটিশ অফিসাররা তাকে পাশবিকভাবে চাবুক ও লাঠিপেটা করে শেষে বন্দুক দিয়ে তার মাথা থেঁতলে দেয়। ওই অবস্থাতেই বিনা চিকিৎসায় তাকে তার সেলে ফেলে রাখা হয়, যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে তিনদিনের মাথায় মারা যায় সুবোধচরণ বিশ্বাস কিন্তু সুবোধ বাবুর শরীর আত্মসমর্পণ করলেও তার আত্মা হয়তো তা করেনি,দেশমাতা কে স্বাধীন করার যে মন্ত্র সে গ্রহণ করেছিল, তা পূর্ণ না করা পর্যন্ত তার আত্মা শান্তি পায়নি,আর তার ই পরিণাম ছিল হয়ত এটা....."
এরপর দুই বন্ধু সমস্ত রাস্তা তে আর একটা কথাও বলেনি। এক অন্যরকম বিষাদ গ্রাস করেছিল তাদের মনে।মৃণাল ভাবছিল কর্মজীবনে এত কঠিন কঠিন রহস্য ভেদ করে সত্য উন্মোচন করেছেন তারা, কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে প্রথম। মনে মনে হতভাগ্য বীর বিপ্লবী সুবোধ চরণ বিশ্বাস কে প্রণাম জানায় সে।
সে ভাবতে লাগলো এইরকম কত শত সুবোধ চরণ বিশ্বাস আছে যাদের নাম হয়তো আমরা জানি না , ইতিহাসের পাতায় তাদের কোনো উল্লেখ নেই,যাদের রক্তে রাঙ্গা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস। দেশ মায়ের প্রতি তাদের বলিদান এর ফলস্বরূপ আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাদের উদ্দেশ্যে স্বগর্বে "বন্দেমাতরম" জানালো সে।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় ত্রিনাথ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল,
-" আচ্ছা মৃণাল হঠাৎ এত বছর পর এই আর্তনাদ শোনা গেল কেন ?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃণাল মৃদু গলায় বলল ,
-"সব প্রশ্নের কি উত্তর পাওয়া যায়,থাক না কিছু প্রশ্নের উত্তর রহস্যের কুয়াশা মোড়া ।"

#সমাপ্ত











website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments