Header Ads Widget

পুতুলের ঘরবাড়ি

পুতুলের ঘরবাড়ি Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)






পুতুলের ঘরবাড়ি



  এদিকে খুব একটা আসা হয় না । বড় স্টেশনারি দোকানটার কিছু কেনাকাটা সেরে গাড়িতে প্যাকেটগুলো রেখে নিরঞ্জনদাকে বললাম এখানেই পার্ক করে রাখতে, আমি ওপাশের দোকানগুলো একটু ঘুরে আসছি । এধারে ওধারে গলি, অচেনা সব ছোট ছোট দোকান নানারকম জিনিসের । অ্যান্টিকের দোকানটা এখানেই কোথায় যেন । ননদের বিবাহ বার্ষিকীর জন্য একটা ভালো উপহার কিনতে হবে, ওর পুরোনো জিনিষ মূর্তি ছবি পুতুল এসবের খুব শখ । আমার কলেজের সহকর্মিণী ও বান্ধবী জয়তীর বাড়িতে সুন্দর একটা পুরোনো ট্যাপেষ্ট্রি দেখেছিলাম, ও বলেছিলো ওটা এখানকার ওই দোকানটা থেকে কেনা, দারুণ সব জিনিস ছিলো নাকি । ঠিক কোথায় মনে নেই ওর, তবে একটা শাল গরম কাপড় ড্রাইক্লীনিং রিপু করার দোকানের পাশে ।
   আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানটায় বসে থাকা মনমরা গোছের একটি বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, “পুরোনো জিনিস ? অ । আছে, বাঁ দিকের মোড়টা ঘুরেই দুটো দোকান ছেড়ে । চাট্টি ধূলোপড়া জিনিস কিনে কি যে লাভ হয়...।” ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে একটা খলনুড়িতে শেকড়মতো কি যেন বাটতে লাগলেন । 
   মা কালী ড্রাইক্লীনিংএর পাশেই অ্যান্টিকের দোকানটা পেয়ে গেলাম । ঘষা কাঁচের ওপর সোনালী অক্ষরে লেখা “চৌধুরী অ্যান্টিকস”, পাশের কাঁচের জানলায় একটা কালো পাথরের মূর্তি, একটা কাঠের হাতি, আর একটা তাঙ্কা টাঙানো । ভিতরে দেখলাম প্রচুর জিনিস, শেলফে ও টেবিলে, সামান্য অগোছালো । দুতিনজন ব্যস্ত কর্মচারি । একটি যুবক এগিয়ে এসে এটাসেটা দেখাতে লাগলো । সবকিছু গুছিয়ে রাখা নেই বলে ক্ষমা চেয়ে জানালো যে এই দোকান তার জ্যাঠামশায়ের ছিলো, তিনি সম্প্রতি মারা গেছেন বলে সে ভার নিয়েছে, সবকিছু দেখেশুনে নিতে হচ্ছে, তাই...বললো, “দিদি, এইদিকে দেখুন, পিছনের গুদোমঘর থেকে অনেক খুব পুরোনো মাল বের করিয়ে রাখা হয়েছে, যদি কিছু পছন্দ হয়...।”
   খানিক দেখে আমি একটা দেওয়ালে লাগানোর বড় ওভাল আয়না পছন্দ করলাম, চমৎকার গিল্টির কারুকার্যকরা ফ্রেম, সেটার সঙ্গে দুপাশে মোমবাতি রাখার শৌখিন হোল্ডার লাগানো । জলি মানে আমার ননদের নিশ্চয়ই ভালো লাগবে । পালিশ করে প্যাক করে দিতে বললাম । তারপর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম । কতোরকম জিনিস । পাথরের কাঠের কাঁচের পেতলের । পুঁতি-ঝোলানো প্রাচীন রেশমি শেড দেওয়া আলো, ঝাড়লণ্ঠন, চীনে ট্যাপেষ্ট্রি, জাপানী পোর্সিলেনের পুতুল, হাতির দাঁতের কাজকরা বাক্স, বাসনপত্র, ছবি...দোকানটার ভেতরে অনেকটা জায়গা...
  একেবারে পিছনের দেওয়ালটার কাছে কোণের দিকে তাকিয়ে কি রকম চমকে গেলাম । একটা টেবিলের ওপর রাখা একটা নীল রঙের পুতুলবাড়ি, যাকে বলে ডলস হাউস । পায়ে পায়ে কাছে এগিয়ে গেলাম । দোতলা পুতুলবাড়ি, কাঠের তৈরি, একেবারে নিখুঁত করে বানানো, ছোট ছোট ঘর, জানলা, দরজাগুলোয় হাতল, সিঁড়ি, বাড়িটার দুটো তলা ঘিরে থামওলা বারান্দা । দরজা জানলাগুলো খোলা বন্ধ করা যায় ...পুরোনো জিনিস, খুব যত্নে বানানো বোঝাই যায়, আজকাল এরকম নিপুণ কারিগরি দেখাই যায় না । কিন্তু আমি সে জন্যে চমকে উঠি নি ।
   পুতুলবাড়িটা আমার খুব চেনা । যদিও আগে রঙটা বেশি উজ্জ্বল ছিলো । কবে যেন আমি এটা নিয়ে খেলতাম । ঠিক মনে পড়ছে না । কিন্তু আমি জানি বাড়িটার ঘরগুলোয় ভেতরের দেওয়ালে ওয়ালপেপার লাগানো, ডিজাইনটাও কী ভাবে যেন জানি, খুদে খুদে গোলাপি ফুল ফুল । সন্তর্পণে একটা দরজা টেনে একটু খুলেই দেখতে পেলাম সেটা, রঙটা একটু ফিকে এখন । সদর দরজার ওপরে নীল লাল সবুজ সত্যিকারের কাঁচ বসানো, বাঁদিকের লাল কাঁচটায় একটা সূক্ষ্ম চিড় ছিলো...হ্যাঁ এই তো । কাঠের সিঁড়িটার একটা ধাপ একটু ভেঙে গিয়েছিলো...কিভাবে যেন ? এখনো সেরকমই আছে । আর আমি জানি যে ছাদটা এমন কৌশলে তৈরি যে কয়েকটা হুক থেকে ছাড়িয়ে নিলে সেটা বাড়ির উপরে আলাদা করে তুলে নেওয়া যায়, যদি সেটা করা আমাদের বারণ ছিলো, আর...
...মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিলাম । কাদের বারণ ? কোথায় ? এতো চেনা লাগছে কেন ! ছোটবেলায় কোথায় যেন...
“...দিদি, আর কিছু পছন্দ হলো ?”
একটু চমকে দেখি দোকানের মালিক যুবকটি এসে দাঁড়িয়েছে । বললাম, “দেখছিলাম ...আচ্ছা, এই ডলস হউসটা কোথা থেকে পেয়েছেন আপনারা, মানে, আগে কোথায় ছিলো ?”
“তা তো বলতে পারবো না দিদি । এটা খুব পুরোনো জিনিসের সঙ্গে গুদোমে ছিলো, জ্যাঠামশাই এসব লটে কিনতেন জানি, তখন তো আমি এই দোকান ব্যবসায় ছিলাম না । অনেক সময় পুরোনো এস্টেটের জিনিসপত্র নীলাম হতো । জ্যাঠামশাই কাগজপত্রে কোথায় কি লিখে রাখতেন তা-ও জানি না, খুব একটা, ইয়ে, অরগ্যানাইজড ছিলেন না, বয়স হচ্ছিলো তো...।” ওকে একটু বিব্রত দেখালো । 
  কর্মচারিরাও বিশেষ কিছু বলতে পারলো না । জিনিসপত্র নাকি নতুন করে মূল্যায়ণ করানো হচ্ছে অ্যাপ্রেজারকে দিয়ে, এই পুতুলবাড়িটি এখনো করানো হয় নি, পুরোনো দামই আছে, আমার যদি পছন্দ হয় তো ওই দামেই দিয়ে দেবে...অনেক মাল জমে গেছে...
  একটু হাসলাম । আমার কি আর পুতুলখেলার বয়স আছে ! আমার ছেলে তপু কলেজ হষ্টেলে তথ্যপ্রযুক্তি পড়ছে । পুতুলবাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরলে ছেলের বাবা মানে সুপ্রিয় কি বলবে কে জানে । আর পুরোনো জিনিস সংগ্রহ করার নেশাও আমার অতো নেই । কিন্তু এই জিনিসটা...
...শেষ অবধি কিনেই ফেললাম । ওটা দেখে অবধি অদ্ভুত আকর্ষণ বোধ করছিলাম । জিনিসটা খুব ছোটো নয়, একটা চাকফুট চৌকো মতো আকৃতি, তিনফুট মতো উঁচু । গাড়িতে তোলা গেলো কোনোরকমে - আর আয়নাটাও ছিলো । নিরঞ্জনদা বেশ অবাক হয়েছিলো সম্ভবত । 
  সুপ্রিয় এবং ফোনে তপু প্রত্যাশিতভাবেই আমার পেছনে লাগলো । পুতুলবাড়ি কেনা হয়েছে, এখন পুতুল রান্নাবাটির জিনিস ইত্যাদি কবে কিনবো, আমাকে জন্মদিনে বার্বি ডল উপহার দেওয়া যাবে কিনা, পুতুলের টি-পার্টিতে কাকে কাকে নেমন্তন্ন করবো, ইত্যাদি ইত্যাদি - আমি যথারীতি ওসব মোটেই গ্রাহ্য করলাম না, এবং শেষ অবধি ওরাও অবশ্য মেনে নিলো যে জিনিসটা সত্যি সুন্দর । আমার পড়াশোনার ঘরে একটা টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখলাম । 
   পরের দিন আমার ছুটি ছিলো । কলেজে তিন দিন পড়াই আমি, বাকি সময়টা লেখাপড়ার কাজ থাকে । সেদিন পুতুলবাড়িকে যত্ন করে সাবধানে মুছলাম, খুব ভালো করে পরীক্ষা করলাম । কি যেন একটা আছে এই বাড়িটাতে....কি একটা থাকার কথা ... । আমার সাত আট বছর বয়স অবধি কুচবিহারে থাকতাম আমরা, তারপর কলকাতায় চলে আসি । কুচবিহারেই কোথাও ছিলো এটা । আমার নিজের ছিলো না নিশ্চয়ই । তাহলে সঙ্গে থাকতো দামি জিনিসটা । জিজ্ঞেস করার মতো তেমন কেউ নেই । দাদা আমার থেকে অনেকটাই বড়ো, ও কলকাতায় মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতো, কুচবিহারে আসতো না বেশি, আমরাই যেতাম কলকাতায় । ওর কিছু মনে থাকার কথা নয় । বাবা মারা গেছেন অনেকদিন, আর মা’র স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ । তবু জিজ্ঞেস করেছিলাম । মা থাকেন দাদাদের কাছে, দিল্লিতে ।
“...আচ্ছা মা, তোমার মনে আছে, কুচবিহারে আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম ?”
“কুচবিহারে, হ্যাঁ, আমরা থাকতাম তো, বেশ ভালো জায়গা ছিলো...অনেক বন্ধু ছিলো তোর, পাড়ায় স্কুলে, তখন খুব ছোটো ছিলি তো...।”
“হ্যাঁ মা, শোনো না, তোমার মনে পড়ে, আমার কোনো বন্ধুর পুতুল খেলার বাড়ি ছিলো কিনা ?”
“খেলনা পুতুল তো তোদের কতো ছিলো, তোর বড়োমামা পাঠাতেন মনে নেই, সেই একবার কি হলো...।”
আমি হাল ছেড়ে দিলাম ।
   
  পুতুলবাড়িটাকে নিয়ে রোজই কিছুক্ষণ সময় কাটাতাম আমি, ছুঁয়ে দেখতাম । কেমন একটা ছেলেমানুষী আনন্দ হতো । কি সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট ঘরগুলো । কেমন যেন মনে হতো এগুলোতে মানানসই এইটুকু টুকু আসবাব ছিলো, ছোট ছোট পুতুল, তারা ঘুরে বেড়াতো, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতো, আর আমি, আমরা...
...এইখানে চিন্তায় বাধা পড়তো । কবে খেলতাম, কার সঙ্গে ! দূর, কি যে সব ভাবছি । উঠে পড়ে অন্য কাজে যেতাম ।
   একদিন ভাবলাম, আচ্ছা ছোট্ট ছোট্ট খেলনার আসবাব দিয়ে এটাকে সাজিয়ে রাখতেই পারি তো । আজকাল তো পুরোনো জিনিসপত্তর সাজিয়ে রাখার ফ্যাশান খুব চালু । ভালো করে দেখতে হবে কোথায় কি মানায় । বাড়িটার একতলার একটা দরজা সন্তর্পণে একটু টেনে খুলে দেখি, ওমা, ভেতরে আর একটা ঘর, তাতেও একটা দরজা । ও হ্যাঁ এটা তো থাকারই কথা, ভুলেই গিয়েছিলাম । কিন্তু হাতল ধরে টানলেও ও দরজাটা খুললো না কিছুতেই । কিন্তু আগে খোলা যেতো, তাই না । কি আছে ভেতরে, কি যেন একটা, হ্যাঁ...ওপরের ছাদটা খুলে নিলেও দেখা যাবে না কারণ এটা তো একতলায়, আর এর ওপরের ঘরে শুধু টেবিল চেয়ার আর আলমারি আছে, সেখানে...
“....বৌদিমণি, ও বৌদিমণি, কখন থেকে ডাকচি যে ! দ্যাখো কে এয়েচে ।” কাজের মেয়ে লীলা এসে দাঁড়িয়েছে ।
আশ্চর্য, কতোটা সময় কেটে গেছে । কি ভাবছিলাম এতোক্ষণ ! অপ্রতিভ হয়ে উঠে দাঁড়ালাম । দেখি আমার ননদ জলি, মানে উজ্জ্বলা, ঘরে ঢুকলো ।
“বাব্বা বৌদি কি অন্যমনস্ক ছিলে গো ।”
“আয় ওঘরে গিয়ে বসি - লীলা, রান্নাঘরে গিয়ে সরোদিকে চা করতে বল একটু, আর বলিস জলিদিদি দুপুরে খেয়ে যাবে ।” জলি এঘরেই কাছের একটা চেয়ারে বসে পড়ে পুতুলবাড়িটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো । 
“তোর অফিস নেই আজ ?”
“বস ট্রিপে গেছে, আমিও কেটে পড়েছি...ভাবলাম তোমার কাছে এসে আড্ডা দিই । আচ্ছা এটা সেই দোকানটা থেকেই কেনা, না , যেখান থেকে আমার আয়নাটা পেয়েছিলে ? দাদা বলছিলো...আয়নাটা দারুণ গো...সবাই মুগ্ধ, এই ডলস হাউসটা খুব সুন্দর, কি ডিটেল দ্যাখো, ওমা দেওয়ালে দেওয়ালে কি সুন্দর আয়না, ছবি, মিনিয়েচার কাঁচের আলো লাগানো...।”
  চমকে গেলাম । আয়না, ছবি, আলো - কই দেখি নি তো এতোদিন, রোজই তো দেখি বাড়িটাকে, তবে ?? ঝুঁকে পড়ে লক্ষ্য করলাম, সত্যিই তো রয়েছে, ঠিক যে রকম থাকার কথা, সিঁড়ির মুখে একটা ছোট্ট নদীর ছবি, বড় ঘরটার দেয়ালে সূর্যমুখীর ছবি, আরেকটা ঘরে একটা ওভাল আয়না, আর ... আমি জলিকে শুধু বললাম, “হ্যাঁ রে বেশ জিনিষটা না ? চল ওঘরে সোফায় আরাম করে বসি । তোর বাড়িতে সেদিন যে কাবাবটা খেলাম তার রেসিপি দিলি না ?” জলির সঙ্গে গল্প করতে করতে আবছাভাবে মনে হলো, “ঠিক যে রকম থাকার কথা” এই কথাটা আমার মনে এসেছিলো কেন ! 
   সেদিন রাত্রে কমপিউটারে একটা নোট তৈরি করছিলাম, পরের দিনের ক্লাসের জন্য । সুপ্রিয় ওঘরে টিভিতে ক্রিকেট দেখছে । কাজ করতে করতে মুখ তুলে হঠাৎ মনে হলো, পুতুলবাড়িটার নীল রঙটা কেমন বেশি উজ্জ্বল লাগছে, আগের ফিকে ভাবটা আর নেই । চোখের ভুল । কাজ শেষ করে প্রিন্টআউট বের করলাম । রাত হয়ে গেছে। উঠে পড়ে কমপিউটার প্রিণ্টার অফ করে কাগজপত্র গুছিয়ে নিলাম । ঘর থেকে বেরোবার দরজার পাশে আলোর সুইচটা নিভিয়ে দিলাম, আর...
...পুতুলবাড়ির সব আলোগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠলো ।
কতক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে স্হাণুর মতো দাঁড়িয়েছিলাম জানি না ।অসম্ভব, অসম্ভব । আমি প্রায় ছুটে গিয়ে সুপ্রিয়র হাত চেপে ধরলাম । ভীষণ চমকে গিয়ে বললো, “কি হলো, বৃন্দা ?”
“আলো...আলো জ্বলছে, পুতুলবাড়িতে...।”
“সে আবার কি ? আলো লাগিয়েছিলে নাকি ?”
“না না...শুধু তো খেলনার নকল আলো ছিলো...।”
“চলো তো দেখি ।” সুপ্রিয় আমার সঙ্গে এলো, কমপিউটারের ঘরটা অন্ধকার, কোথাও আলো-টালো জ্বলছে না ।
“কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম...।”
“ভুল দেখেছো । অনেকক্ষণ কমপিউটারে কাজ করছিলে তো । হয় ওরকম । ঘরের বাইরের কোনো আলো-টালো খেলাবাড়িটার কাঁচে পড়েছিলো নিশ্চয়ই ।” আর কিছু বললাম না । বাড়িটায় হঠাৎ ছবি আয়না আলোগুলোকে দেখতে পাওয়া নিয়েও কিছু বলি নি ওকে । নিজেই ভাবছিলাম ওটা আমারই ভুল, প্রথম থেকেই ছিলো নিশ্চয়ই ।
শুয়ে পড়লাম আমরা । প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম । আর এক অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে জেগে উঠলাম ।
   যেন ফিরে গেছি আমার দু-বিনুনি বাঁধা ফ্রকপরা শৈশবে । একটা বাড়িতে খেলা করছি একজনের সঙ্গে, তার ছোট করে কাটা চুল, ফরসা রঙ, রোগা রোগা হাত পা, বড়ো বড়ো চোখ । কি সুন্দর এই বাড়িটা, সিঁড়ি, বারান্দা, ঘর - সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি । দেওয়ালে আয়না, কতো ছবি - নদীর, ফুলের । আর গোলাপি ফুল ফুল পেপার লাগানো দেওয়াল । রঙীন কাঁচ বসানো দরজার ওপরে । 
“বিন্দি, আমার এই খেলার বাড়িটা কি ভালো না রে !”
“ভীষণ ভালো । কিন্তু ওই একটা ঘর কেন খোলে না ?”
“ওটা খুলতে নেই, জানিস না ?”
“কি হয় রে খুললে ?”
“ওটা খুললেই...খুললেই এই বাড়িটা আমাদের...নিয়ে নেবে, আমরা আর বেরোতে পারবো না ।”
”এ বাড়িতে আর কারা থাকে রে ?”
সে খিলখিল করে হাসে, হাসতেই থাকে, চারপাশটা কেঁপে কেঁপে ওঠে ।
“কেউ না, কেউ না, শুধু আমি আর তুই খেলি এখানে, তুই আর আমি...। আর একটা বেড়াল ।”
আমি বলি, “এবার আমি যাই রে, পুতুল...।”
”না, যাবি না...” হঠাৎ রাগ করে হাতের বলটা ও ছুঁড়ে দেয়, সামনের দরজার কাঁচে লেগে ঝনঝন করে শব্দ হয়, আর আমার ঘুম ভেঙে যায় চমকে । আমি বিছানায় উঠে বসি । জানলার বাইরে সকাল । সুপ্রিয় তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছিলো, একটু অবাক হয়ে আমায় বললো, “কি হলো ?”
“পুতুলের বাড়ি । ওটা...পুতুলের বাড়ি, আমার মনে পড়ছিলো না, কি আশ্চর্য...।”
”কি বকছো, পুতুলবাড়িই তো ওটা, ডলস হাউস, তোমার কি হয়েছে বলো তো ?”
“না, না...আমার এক বন্ধু ছিলো, পুতুল, তার খেলনা ছিলো ওটা । স্বপ্ন দেখলাম, জানো...।”
সুপ্রিয় মাথা নেড়ে বললো, “স্বপ্ন ! নাঃ, ওটা তোমার একটা অবসেশান হয়ে যাচ্ছে বুঝলে । যাক গে, আজ আমায় একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে, মিটিং আছে একটা ।”
   সারাদিন কাজের মধ্যে পুতুলের কথাটা আমার মনের মধ্যে ধোঁয়ার মতো পাক খেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো । কলেজে ক্লাস নিলাম, ছাত্রীদের সঙ্গে কথাটথা বললাম, সহকর্মিণীদের সঙ্গে গল্পও করলাম অবসর সময়ে । দুএকজন বললো, “আজ এতো অন্যমনস্ক কেন রে বৃন্দা, কী ভাবছিস তখন থেকে ?”
   আসলে অনেক কিছু মনে পড়ছিলো, কিন্তু কেমন যেন আবছা আবছা । কুচবিহারে আমাদের দুতিনটে বাড়ির পরই পুতুলরা থাকতো । ওর মা’কে কি যেন ডাকতাম, ও হ্যাঁ, মীরাকাকিমা । বেশ বড়ো বাড়ি ছিলো ওদের মনে আছে । পুতুল একটাই সন্তান ছিলো নিশ্চয়ই, আর কোনো ভাইবোন দেখি নি । আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার, হাসপাতালের, বাড়িতে চেম্বারও ছিলো । খুব ভুগতো পুতুল, প্রায়ই স্কুলে যেতে পারতো না, বাবা ওকে দেখতে যেতেন ওদের বাড়ি । পুতুল আমার সমবয়সী ছিলো, মীরাকাকিমা আমার মা’কে বলতেন, বিন্দিকে একটু পাঠাবেন দিদি পুতুলের সঙ্গে খেলতে, ওকে তো বেশি বেরোতে দিতে পারি না, বড্ড অসুখ করে ওর বেরোলেই । অনেক খেলনা ছিলো পুতুলের, কতো দামি জিনিসপত্র, মীরাকাকিমা আমায় যত্ন করতেন খুব গেলেই ।
   আমার মন্দ লাগতো না ওদের বাড়িতে যেতে । পাড়ায় আমারও আর কোনো তেমন সমবয়সী বন্ধু ছিলো না । ছুটির দিনে ওর খেলার ঘরে বসে আমরা কতোরকম খেলতাম । 
    ডলস হাউসটা ছিলো সে ঘরেই । কে নাকি বানিয়ে দিয়েছিলো ওকে । পুতুল বলতো আমার নাম পুতুল আর ওটা আমার পুতুলবাড়ি, হিহি । বাড়িটার ওপরের ছাদটা নাকি তোলা যেতো, কিন্তু সেরকম করতে আমাদের বারণ ছিলো, অসাবধানে করলে নাকি ক্ষতি হতো বাড়িটার । একবার ওরকম করতে গিয়ে আমাদের হাত ফসকে ছাদটার ধাক্কা লেগে সিঁড়িটার ওপরের ধাপটার কোণটা একটু ভেঙে গিয়েছিলো । এমনিতে বেশ মেয়ে ছিলো পুতুল, মানে ঝগড়াটে নয়, কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন রেগে উঠতো, জেদ করতো । এখন মনে হলো, বোধহয় ওটা ওর ক্রনিক রুগ্ন স্বাস্হ্যের জন্যই । 
   আমি শেষ দুপুরে বাড়ি ফিরে এলাম । সরোদিকে বললাম একটু কফি করতে । পুতুলবাড়িটার কাছে এসে দাঁড়ালাম একটু । আশ্চর্য, এটা আমার এখন, কি রকম সমাপতন । ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম ।
...আচ্ছা, কি হয়েছিলো যেন পুতুলের ? কি যেন একটা...। আর ওই পুতুলবাড়ি...। পুতুল মাঝে মাঝে কি রকম যেন অদ্ভুত সব কথা বলতো । একটু অন্যরকম ছিলো ও, বোধহয় খুব একা একা থাকতো বলে । ওর বাবাকে খুব কম দেখেছি, বাড়িতে বেশি থাকতেন না মনে হয় । 
একবার পুতুল বলেছিলো, “আমার মা খুব কাঁদে জানিস বিন্দি ।”  
“কেন রে ?”
”আমি থাকবো না তো, তাই ।” মন দিয়ে একটা জিগ’স পাজল করতে লাগলো, আর কিছু না বলে ।
একদিন বললো, “জানিস বিন্দি, আমার মন খারাপ হলেই আমি এই পুতুলবাড়িটাতে ঢুকে যাই । ওখানে খুব ভালো থাকি আমি । অসুখ সেরে যায়, বুকে ব্যথা করে না আর ।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “দূর, তাই কখনো হয় না কি ।”
“কেন হবে না ! ওটা আমার বাড়ি ।”
“আচ্ছা ঢুকে দেখা তো ।” 
“সব সময় ঢোকা যায় না । বেড়ালটা এলে তবেই ।”
“কোন বেড়াল আবার ! তোদের বেড়াল আছে না কি ।”
...পুতুল আমার পাশে বিছানায় বসলো । সবুজ রঙের ড্রেস, বুকে রেশমি লাল গোলাপ । সেই রোগা ফ্যাকাশে মুখ ।বড়ো বড়ো চোখ মেলে বললো, “বেড়ালটা আসলে ওই বাড়িটাতেই থাকে । সবসময় ওকে দেখা যায় না তো । তুই জানিস না, আমার যখন জ্বর হয়, বুকে মাথায় ব্যথা করে, তখন বেড়ালটা আমায় পুতুলবাড়িটার ভেতরে ডাকে, আমি চলে যাই....।”
“বৌদিমণি ! ওমা দ্যাখো অসময়ে ঘুমুচ্চো, এই যে কফি এনিচি, নাও বিস্কুট দিয়ে খাও ।” আমার চটকা ভেঙে গেলো । কেমন একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো । 
   কি যে সব পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । কেমন মনে হচ্ছে একটা অপ্রীতিকর কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ সমস্তের সঙ্গে । সবকিছু স্পষ্ট নয় যেন । আমি জোর করে অন্য দিকে মন দিলাম । 
   তপু বাড়ি এলো কয়েকদিনের ছুটিতে । বেশ একটু হইচই হলো, খাওয়াদাওয়া বেড়ানো । জলি, ওর বর সুজয়দা আর মেয়ে কুমুর সঙ্গে আমরা সবাই শান্তিনিকেতন ঘুরে এলাম দুতিনদিনের জন্য । তপু আমার পুতুলবাড়িটা খুঁটিয়ে দেখে বললো, “জিনিষটা কিন্তু বেশ মামণি । অ্যান্টিক, এসবের এখন খুব চাহিদা । বাবা বললো এটা নাকি তোমার কোন ছোটবেলার বন্ধুর ছিলো ?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ রে ।”
“ইন্টারেস্টিং...আচ্ছা এটা ওই অ্যান্টিকের দোকানে গেলো কি করে ? মানে তোমার সেই বন্ধুর কি হয়েছিলো ?”
আমি অস্পষ্ট কণ্ঠে বললাম, “...ঠিক মনে নেই রে, কতোদিনের কথা...আয়, খাবি আয় । সরোদি তোর জন্যে মাছের চপ করেছে ।”
   সেরাত্রে আবার স্বপ্ন দেখলাম, ডলস হাউসটার কাছে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার পড়াশোনার ঘরে । সেইরকম দুই বিনুনি আর আমার নীল ফুটকি ফ্রকটা পরা । আমার পাশে পুতুল আমার হাতটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে । কি ঠাণ্ডা ওর আঙুলগুলো । ডলস হাউসটার ভিতরের আলোগুলো সব জ্বলছে । সিঁড়িটার ওপরে একটা বেড়াল বসে আছে । স্বপ্নে এটা আমার খুব স্বাভাবিক মনে হয় । পুতুল বলে, “ওই দ্যাখ বেড়ালটা বসে আছে । এবার আমি যাবো বাড়িটায় । এখানে আমার খুব কষ্ট হয় রে । তাই চলে গিয়েছিলাম জানিস ।”
আমি বলি, ‘ও হ্যাঁ । তবে আবার এলি যে ?”
“তুই আমার বাড়িটা নিজের কাছে আনলি তো । তাই তো এসেছি তোকে ডাকতে, আসবি আমার সঙ্গে ? চল না । বাড়িটায় কতো মজা করে থাকবো ।”
“না রে, আমি কি করে যাবো ।”
“খুব সোজা, আয় না তুই, ওই ভেতরের ঘরটা আমি খুলে দেবো, তাহলেই তুই থাকতে পারবি এখানে...”
“না, না...।” ডলস হাউসটা ক্রমশ কী বড়ো হয়ে উঠছে । দরজার লাল নীল কাঁচগুলো ঝকঝক করছে । একটা কাঁচে চিড় ধরেছে দেখা যাচ্ছে । আলোগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে চোখের সামনে । বেড়ালটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ওর দুটো চোখ দুরকম রঙের, পুতুল আমার হাতটা ধরে টানছে, দূর থেকে কে আমায় ডাকছে...তপু ? সুপ্রিয় ? উঃ আলোগুলো চোখে লাগছে, আমি....।
  “মামণি, ও মামণি, ওঠো না ! কতো ঘুমোচ্ছো ! আজ আমাদের বাইরে ব্রেকফাস্ট করার প্ল্যান না ? কাকিমাদের সঙ্গে ?” তপু আমার কাঁধ ধরে নাড়া দিচ্ছে । জানলার পর্দাটা সরানো, চোখের ওপর রোদ পড়েছে । আমি আস্তে আস্তে উঠে বসি । “তুই যা, আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি এক্ষুণি ।”
   তপু কলেজ ফিরে যাওয়ার ক’দিন পরে মা’কে ফোন করলাম, যেমন করি খবর নিতে । এটা ওটা কথার পর বললাম, “মা, কুচবিহারে আমার পুতুল বলে একজন বন্ধু ছিলো তোমার মনে আছে ?”
ভেবেছিলাম মা’র যথারীতি কিছু মনে থাকবে না । কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মা বলেন, “হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন । সে তো মারা গিয়েছিলো, আহা ।”
বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগে যেন । হ্যাঁ, পুতুল তো...মারা গিয়েছিলো । মনে পড়ছে ।
মা বলে চলেন, “...তোর বাবা বলতেন, ওর কি সব জন্মগত অসুখ ছিলো, হার্টের না কি যেন, খুব ভুগতো, এরকম আর কার যেন ছিলো, ও হ্যাঁ তোর সেজোপিসির এক ননদের, সে...।”
“মা, ওই পুতুলের কথা কি বলছিলে যেন...।”
“অ্যাঁ, কি বলছিলাম ?”
“পুতুলের অসুখ ছিলো বলছিলে তো । মারা গিয়েছিলো ।”
“ও হ্যাঁ....। পুতুল । তোর বন্ধু । একদিন নাকি তোরা খেলছিলি, তখনই নাকি অজ্ঞান হয়ে যায়, তারপর তো তোর বাবা বোধহয় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারপর, তারপর..। জানিস তো কুচবিহারের হাসপাতালটার বেশ ভালো ব্যবস্হা ছিলো, আমার সেই হাঁটু এক্সরে করতে একবার গেছিলাম না, নার্সরা কী ভালো, আজকালকার মতো নয় বুঝলি বিন্দি...। ” মা’র আবার খেই হারিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু আমার নিজের সবটা মনে পড়ে যায় । কোনোরকমে কথা শেষ করে বিছানায় বসে পড়ি । মাথাটা ঝিমঝিম করছে ।   
    সেদিন আমরা ডলহাউস নিয়ে খেলছিলাম । সবুজ একটা ড্রেস পরেছিলো, খুব সুন্দর দামি দামি পোশাক ছিলো ওর । একটা বাক্সে করে নতুন খেলনা এসেছিলো পুতুলের । ছোট্ট ছোট্ট আসবাব, টেবিল চেয়ার খাট আলমারি । নাকি ওর বাবা অর্ডার দিয়ে আনিয়েছেন । তাছাড়া রান্নাঘরের জিনিসটিনিস । ও খুব মন দিয়ে সব সাজাচ্ছিলো । কিন্তু ওকে খুব ফ্যাকাশে লাগছিলো । যেন কষ্ট হচ্ছিলো ওর । মীরাকাকিমা মাঝে মাঝে উদ্বিগ্নভাবে এসে আমাদের দেখে যাচ্ছিলেন । একবার বললেন, “হ্যাঁ রে পুতুল, তোর শরীর বেশি খারাপ লাগছে না তো ? একটু শুয়ে থাক বরং ।”
আমারও কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিলো, উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমি তবে আজ যাই রে পুতুল !”
   ও রেগে গিয়ে আমার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলো, “না না তুই যাবি না ।” হাতে একটা খেলনার কড়া না কি যেন ছিলো, ডলস হাউসের দরজাটার দিকে ছুঁড়ে দিলো, কাঁচটায় গিয়ে লাগলো । মীরাকাকিমা বললেন, “ইস কি যে করিস, দেখ তো কাঁচটায় চিড় লাগলো বোধহয়।” পুতুল বললো, “তুমি যাও, মা !” কাকিমা চলে গেলেন । উনি কখনো পুতুলকে বকতেন না । আমার মা‘র কাছ থেকে আমার চড়চাপড়টা বকুনিটা প্রায়ই জুটতো, সেরকম নয় মোটেই । আমার এটা একটু অদ্ভুত লাগতো ।
  ও বললো, “বাড়িটা কি সুন্দর সাজিয়েছি বল । আমার কষ্ট হয় যখন, বেড়ালটা আসে, আমি বাড়িটায় চলে যাই, তোকে বলি নি ? এবার এক্কেবারে চলে যাবো ।”
“কোত্থেকে আসে রে বেড়ালটা ?”
“ভেতরে একটা ঘর আছে দেখিস নি । এই দ্যাখ । একতলার এই ঘরটার দরজা খুললেই ভেতরের আর একটা ঘরের দরজা । ওই দরজাটা বাইরে থেকে খোলা যায় না । কিন্তু বেড়ালটা ওটা খুলে ভেতর থেকে আসে ।”
“কি সব আবোল-তাবোল বকছিস বল তো । ওর মধ্যে একটা বেড়াল থাকে ? ‘ আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছিলো । ইচ্ছে হচ্ছিলো বাড়ি ফিরে যেতে । 
“বেড়ালটা ওখানে থাকে বলি নি তো । কি বোকা তুই বিন্দি । বলেছি, ওখান দিয়ে আসে ।” পুতুল কেমন যেন রেগে যাচ্ছিলো । “তোর বিশ্বাস হচ্ছে না আমায় কথা, না ।”
আমার বিরক্ত লাগছিলো, বললাম, “কি করে হবে, তোর কি সব অদ্ভুত কথা ।”
দেখলাম ওর ঠোঁট কাঁপছে । কাকিমা ঘরে ঢুকলেন, প্লেটে করে কেক বিস্কুট আর গ্লাসে করে দুধ নিয়ে । পুতুলকে বললেন, “এই গরম দুধটা একটু খেয়ে নে সোনা, সকাল থেকে তো তেমন কিছু খাস নি...।” পুতুল ওর মা’র গ্লাসশুদ্ধু হাতটা ঠেলে দিলো, দুধ চলকে পড়লো । তারপর ও মেঝেতে কেমন এলিয়ে পড়লো । 
কাকিমা আকুল হয়ে বলতে লাগলেন, “পুতুল, পুতুল কি হলো তোর ?”
পুতুল কিরকম বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, “উঃ, ব্যথা...আমি বাড়িটায় চলে যাবো, ওই যে বেড়াল, ডাকছে...।”
কাকিমা চেঁচিয়ে বাড়ির লোকজনদের ডাকতে লাগলেন । আমার খুব ভয় করছিলো । হঠাৎ চোখ তুলে দেখি পুতুলবাড়িটা কেমন বড়ো হয়ে উঠছে, আর...আর একটা বেড়াল সিঁড়িটার মাথায় বসে আছে...পাটকিলে রঙের ওপর কালো ডোরা, দুরঙা চোখ মেলে পুতুলের দিকে তাকিয়ে আছে । তারপর খুব মসৃণভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো...
পুতুল জড়ানো গলায় বললো, “...বিন্দি...আয়, আয় ।”
আমি ধড়মড় করে উঠে পড়ে ছুটে বেরিয়ে গেলাম । পুতুলের বাবা দৌড়ে উঠে আসছিলেন, আমার সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লাগলো । কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম । 
তারপর...আমার খুব জ্বর এসেছিলো । আবছা মনে আছে । একটু ভালো হতেই মা আমায় নিয়ে কলকাতায় মামাবাড়ি চলে আসেন । পুতুল হাসপাতালে মারা গিয়েছিলো, শুনেছিলাম কিন্তু ও নিয়ে কোনো কথা হয় নি আমার সঙ্গে কারো, আর আমি বোধহয় মন থেকে মুছেই ফেলেছিলাম, মানুষের মস্তিষ্ক কি অদ্ভুতভাবে কাজ করে ...এরপরেই আমরা কলকাতায় স্হায়ীভাবে চলে আসি, বাবার নতুন পোষ্টিং হয়েছিলো । 
    কতোটা সময় কেটেছে কে জানে । কে যেন ডাকছে আমায় । ভারী চোখের পাতা তুলে দেখি সুপ্রিয়র উদ্বিগ্ন মুখ ।তার পিছনে লীলা, সরোদি । 
“সেই তখন থে’ ঘুমোচ্চে, দুপুরে খায় নি কিচু, ডেকেছিলাম, ওটে নি...।”
“বৃন্দা, বৃন্দা...কি হয়েছে তোমার, এ কি গা তো পুড়ে যাচ্ছে...।”
আমি জড়িয়ে জড়িয়ে বলি, “জ্বর, ঠিক আগের মতো, বেড়ালটা...।”
“কি ?”
“পুতুল বাড়ি । পুতুলের ঘরবাড়ি ।”
“আমি ডঃ মুখার্জিকে ফোন করছি ।”
  আবছাভাবে শুনলাম, লীলা সরোদিকে বলছে, “ওই পুরোনো পুতুলবাড়িটাই অলুক্ষুণে গো, যাবে থে’ বৌদি ওটাকে এনে অবদি কেমন যেন হয়ে থাকে, আর সত্যি বলচি ওটাকে দেকলে আমার কেমন গা ছমছম করে...।” 
  জ্বরের ঘোরে উলটোপালটা কি সব দেখতাম । সেই ডলস হাউসটা, তার ভিতরে ঘুরে বেড়াচ্ছি পুতুলের সঙ্গে, সেই বন্ধ ঘরের দরজাটা খুলে গেছে, বেড়ালটা বেরিয়ে এসেছে...কি ঠাণ্ডা...আমি চেষ্টা করছি বাড়িটা থেকে বেরোতে কিন্তু সদর দরজাটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না, বাড়িটার যেন আদি অন্ত নেই...আমি হারিয়ে গেছি...
   ডাক্তার বলেছিলো ভাইরাল ফিভার । সুস্হ হয়ে উঠেও খুব দুর্বল লাগতো । ডলস হাউসটার দিকে তাকাতে ভয় করতো আমার । 
   একটা বই হাতে বসেছিলাম আনমনে বাইরের দিকে চেয়ে । সুপ্রিয় এসে বললো, “বৃন্দা, লাইব্রেরির সুমন্ত্র এসেছে । এসো একটু কথা টথা বলো - এমন করে বসে থেকো না, চলো ।” সুপ্রিয় বেশ চিন্তিত আমায় নিয়ে আমি জানি ।
সুমন্ত্র রায় আমাদের পুরোনো বন্ধু, একটা নামকরা বড়ো লাইব্রেরির অধ্যক্ষ । ওদের লাইব্রেরির একটা আলাদা শিশুবিভাগ খোলা হবে, সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে, সে সব কথা বলছিলো ।
   “...বুঝলে বৌদি, আমরা ভাবছি ভালো দামি আনইউজুয়াল খেলনা-টেলনা দিয়ে সাজাবো, বাচ্চারা অবশ্য হাত দেবে না, শুধু দেখবে, মিউজিয়মের মতো আর কি, মানে ইন্টারেস্ট পাবে ।”
   আমি হঠাৎ বললাম, “আমার একটা অ্যান্টিক ডলস হাউস আছে, নেবে ?” আমি ওকে নিয়ে গিয়ে দেখালাম । সুমন্ত্র অবাক হয়ে বললো, “এ তো দারুণ জিনিস...নিশ্চয়ই খুব শখের, এটা দিয়ে দেবে ?” অনিশ্চিতভাবে সুপ্রিয়র দিকে তাকাতে ও একটু হাসলো শুধু, কিছু বললো না ।
আমি দৃঢ় ভাবে বললাম, “হ্যাঁ ।”
   লাইব্রেরির শিশুবিভাগ ওপেনিংএর অনুষ্ঠানে আমি আর সুপ্রিয় গিয়েছিলাম । দেখলাম ডলস হাউসটাকে আলাদা করে একটা জায়গায় সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে, ছোটদের নাগালের বাইরে । সুপ্রিয় আলতো করে আমার হাতটা ছুঁয়ে বললো, “এটাই ভালো হলো, বৃন্দা ।” আমি বললাম, “হ্যাঁ গো । অনেক স্মৃতি মনে না আনাই উচিত ।”

সমাপ্ত 













website : BhutGolpo


Keywords

Horror Story

Bangla Horror Story

Bengali Horror Story

Horror Story in Bangla

Horror Story in Bengali

Bhut Golpo

Bangla Bhut Golpo

Bengali Bhut Golpo

Bhut Golpo in Bangla

Bhut Golpo in Bengali

Bhuter Golpo

Bangla Bhuter Golpo

Bengali Bhuter Golpo

Bhuter Golpo in Bangla

Bhuter Golpo in Bengali

Bhoot Golpo

Bangla Bhoot Golpo

Bengali Bhoot Golpo

Bhoot Golpo in Bangla

Bhoot Golpo in Bengali

Bhooter Golpo

Bangla Bhooter Golpo

Bengali Bhooter Golpo

Bhooter Golpo in Bangla

Bhooter Golpo in Bengali

Vut Kahini

Bangla Vut Kahini

Bengali Vut Kahini

Vut Kahini in Bangla

Vut Kahini in Bengali

ভূত গল্প

ভুতের গল্প

ভুতের কাহিনী

ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা

পিশাচের গল্প

শাকচুন্নির গল্প

রাক্ষসের গল্প

ডাইনির গল্প

Post a Comment

0 Comments