রাক্ষস Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
অনিল নিজের সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে, অনামিকাকে গল্প শোনাচ্ছে। অনামিকা আজ কিছুটা ভাল আছে। জ্বরটা আজ একটু কমেছে। নাহলে, গত চার দিন ধরে প্রবল জ্বরে পুড়ে পুড়ে মেয়েটা একদম শুকিয়ে গেছে। রোজ রাতে শোবার আগে ওকে গল্প শোনাতে হয়। নাহলে ওর ঘুম আসে না। বড্ড ভয় করে। এই চার দিন, রোজ একটা করে নতুন গল্প বানিয়ে শোনাতে হয়েছে ওকে। আর, প্রত্যেকটা গল্পে রাজা, রানী, রাজকুমার আর একটা রাক্ষস থাকতেই হবে, নাহলে, সেটা গল্প হবে না। অন্য কোন গল্প বললেই, ও বলে উঠবে, “বাবা! রাজা কই?” নয়তো, “রাক্ষস কই?” গল্প শুনতে শুনতে অনামিকা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন অনিলের একটু স্বস্তি হয়। শহরের মধ্যে, ছোট্ট দু কামরার ঘরে থাকে ওরা। একটা ছোট্ট রান্না ঘর আর স্নান ঘর পেছন দিকে। গত বছরই কংক্রিটের ছাদ ফেলেছে অনিল। নাহলে, এত দিন পর্যন্ত পৈতৃক বাড়িটা বিচালির ছাদন দিয়েই চলছিল। সামনের ঘরটা একদম রাস্তার পাশে। একটা ছোট্ট জানলা খুললেই রাস্তার গাড়ি ঘোড়া দেখা যায়। আর দেখা যায় বেল গাছটা, যেটা ওদের জানলার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। বেল গাছটাকে অনিল দেখে আসছে ওর ছেলেবেলার সময় থেকে।
অনামিকার কপালে হাত দিয়ে দেখল অনিল। মনে হচ্ছে এখনও একটু তাপ আছে, তবে সেটা গতকালের চাইতে কিছুটা কম নিশ্চয়। মেয়ে খাটের উপরে পাতা বিছানায় শুয়ে আছে আর অনিল ওর কাছেই একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ওর মাথার চুল গুলোয় এক একবার বিলি কেটে দিচ্ছে, আর ওর বালিশের কাছে কনুই গেড়ে গল্প শোনাচ্ছে। অনামিকা এক একবার বাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কখনও কখনও বাবার পেছনের খোলা জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাচ্ছে। একটা দুটা জোনাকি পোকা ঢুকে আসছে খোলা জানলা দিয়ে। ও জোনাকিগুলোর দিকে বিষময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে মাঝে মাঝে।
অনিল বলে চলে, “বহুদিন আগে এক রাজা ছিলেন। তাঁর নাম ছিল অশ্বপতি। তিনি মদ্র দেশের রাজা ছিলেন। তাঁর অনেক জন রানী ছিলেন, কিন্তু, কোন সন্তান না থাকায়, তিনি খুবই দুঃখী ছিলেন। একদিন তাঁকে একজন বলল সাবিত্র ঠাকুরের পূজা করতে। সাবিত্র ঠাকুরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে নিশ্চয় ভগবান তাঁকে একটা সন্তান দিবেন। রাজা তাই করলেন। সাবিত্র ঠাকুরের পূজা করলেন মন্দিরে গিয়ে। সাবিত্র ঠাকুর খুশি হয়ে রাজাকে বর দিলেন। কয়েক মাসের মধ্যে রাণীর কোলে একটা খুব সুন্দর ফুটফুটে কন্যা সন্তান এল। সবাই খুব খুশি হলেন। রাজা রাজ্যের সব প্রজাদেরকে উপহার দিলেন। যেহেতু সাবিত্র ঠাকুরের কৃপায় মেয়ের জন্ম হয়, তাই তার নাম রাখলেন, সাবিত্রী”।
অনামিকা বলে উঠল, “কিন্তু বাবা, রাজকুমার কই? এ তো রাজকুমারী”।
অনিল বলল, “একটু অপেক্ষা কর, রাজকুমারও আসবে!”
“ও! তারপর?”
“সাবিত্রী বড় হতে থাকল। এক দিন রাজা অশ্বপতি সাবিত্রীর জন্য উপযুক্ত বর খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু, সাবিত্রীর মতন সুশিক্ষিত, জ্ঞানী রাজকন্যাকে বিয়ে করতে আসতে অনেকেই ভয় পেল। তাই রাজার কাছে সাবিত্রীর বিয়ের জন্য কোন প্রস্তাব এল না। রাজা শেষে ঠিক করলেন, যে সাবিত্রী আর্যাবর্তের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে নিজের বর নিজেই পছন্দ করবে। তাই ঠিক হল। একটা বড়সড় সৈন্যদল নিয়ে রাজকুমারী সাবিত্রী বেরিয়ে পড়লেন। এক দিন জঙ্গলের মধ্যে এক সন্ন্যাসীকে দেখে সাবিত্রী বেশ মুগ্ধ হল। তাকেই বিয়ে করতে নিষ্পত্তি নিল। রাজা অশ্বপতি সেই সন্ন্যাসীকে খুঁজে পেয়ে জানতে পারলেন, যে, সন্ন্যাসী সত্যবান আসলে একজন রাজকুমার, যার বাবার রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে কিছু শত্রু। রাজাও অন্ধ হয়ে গেছেন।
অনামিকা এইখানে বলে উঠল, “এই তাহলে রাজকুমার?”
“হ্যাঁ গো,মামনি আমার! সত্যবানই হচ্ছে রাজকুমার”, বলে অনিল মেয়ের চুলে বিলি কেটে দিল কয়েকবার।
অনামিকা বলল, “হুঁ, তারপর কি হল, বাবা?”
অনিল গল্প চালু রাখল, “তারপর, সত্যবানের দুর্দশার কথা শুনেও অশ্বপতি রাজি হয়ে গেলেন সাবিত্রীর সাথে তার বিয়ে দিতে। এমন সময় একদিন নারদ মুনি এসে তাঁর রাজ সভায় উপস্থিত হলেন। অশ্বপতি নারদ মুনিকে কন্যা সাবিত্রীর বিয়ের কথা জানালেন আর এও বললেন, যে, সাবিত্রী সত্যবানকে স্বামী রূপে চয়ন করেছে। সত্যবানকে সাবিত্রী বর হিসেবে মেনে নিয়েছে শুনে, নারদ মুনি একটু শঙ্কিত হলেন”।
অনামিকা বলে উঠল, ‘নারদ মুনি কে বাবা? রাক্ষস?”
অনিল জিভ কেটে বলল, “না, মা! ওরকম বলতে নেই। নারদ মুনি তো মুনি, ঋষি। তিনি সমগ্র দুনিয়া ঘুরে বেড়ান আর সকল প্রাণীর খবরাখবর নিয়ে ভগবানকে দেন”।
“কিন্তু, রাক্ষস কোথায় গেল? ও কেন আসছে না? এই দুষ্টু নারদ মুনিটা কোত্থেকে চলে এল!” অনামিকা বাবার গল্পে খুঁত ধরতে লাগল। প্রথম থেকেই ওর বায়না ধরা আছে, গল্পে রাজা, রাণী, রাজকুমার আর রাক্ষস থাকতেই হবে। একবার অনিল মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিল, “সব থাকবে, কিন্তু, রাজকুমারী কেন থাকবে না?” দুষ্টুমির হাঁসি হেঁসে সেদিন বলেছিল, “আমিই তো তোমার রাজকুমারী, তাই না, বাবা?”
“হ্যাঁ! তা তো ঠিক!” বলে অনিল।
“তাহলে, গল্পে আরেকটা রাজকুমারী কি করতে আসবে?”
“হ্যাঁ মা! একদম ঠিক বলেছ”, বলে, অনিল সেদিন ওকে কোলে তুলে নিয়েছিল।
অনিল ওর গল্প জারি রাখল, “নারদ মুনিকে মুখ শুকোতে দেখে রাজা অশ্বপতি কিছু একটা আন্দাজ করলেন। তিনি নারদ মুনিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হল মহাত্মন? আপনি কিছু বলতে চান?’”
“নারদ মুনি বললেন, ‘সত্যবান আজ থেকে এক বছরের মধ্যে মারা যাবে”’।
“অশ্বপতির মাথায় যেন বাজ পড়ল। তিনি কি করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। নিজের মেয়েকে ডেকে নারদ মুনির কথা শোনালেন। কিন্তু, সাবিত্রী তাতেও নিষ্পত্তি বদলাল না। সাবিত্রীর সাথে সত্যবানের বিয়ে হয়ে গেল। সাবিত্রী রোজ দিন গুনতে থাকল। শেষে এক বছর পূর্ণ হতে চলল। সেদিন সাবিত্রী সত্যবানের সঙ্গে জঙ্গলে গেল। সত্যবানের বাবা-মা কুটিরেই থাকলেন”।
“জঙ্গলে এক জায়গায় সত্যবান হটাত করে অসুস্থ বোধ করল আর মাটিতে পড়ে গেল। সাবিত্রী বুঝতে পারল, তার স্বামীর সময় শেষ হয়ে গেছে। যমরাজ তাকে নেওয়ার জন্য এসেছেন। সে সঙ্গে সঙ্গে যমরাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। অনেক দূর যাওয়ার পর যমরাজ বুঝতে পারলেন, যে, সাবিত্রী তাঁর পেছন পেছন আসছে। থেমে, তিনি সাবিত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমার পেছনে কেন আসছ? তোমার স্বামী তো জঙ্গলের মধ্যে একা পড়ে আছে।তুমি তার কাছে থাকো’। সাবিত্রী বলল, ‘আপনি তো আমার স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তার শবের কাছে থেকে কি করব?’ যমরাজ বুঝলেন, সাবিত্রী অত্যন্ত জ্ঞানী। তাকে কথায় ভোলানো সম্ভব নয়। তাই তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি যে কোন বর চাও বাছা। আমি তাই দিব’”।
অনামিকা কোন কথা বলছেনা দেখে অনিল ভাবল ও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কপালে হাত দিয়ে দেখল, মেয়ের শরীর তাপে পূড়ে যাচ্ছে। হে ভগবান! মেয়েকে আমার ঠিক করে দাও, ভগবান। রাতে ওকে একটাই ওষুধ খাওয়ানোর কথা। সেটা তো খাওয়ানো হয়ে গেছে! এখন আবার জ্বরটা কেন এল ! সঙ্গে সঙ্গে জল পটি করে মেয়ের কপালে দিতে লাগল। কপালে জল পটি দিচ্ছে আর ভগবানকে ডাকছে। অনেক ক্ষণ ধরে জল পটি দেওয়ায়, মেয়ের জ্বর একটু কমল। অনিল মেয়ের বিছানার উপর মাথা ঠেকিয়ে ভগবানকে ধন্যবাদ জানাল। ও মাথা নুইয়েই ছিল। ওর মাথায় কেউ একজন হাত রাখল ভেবে উঠে দেখল, অনামিকা ওর দিকে তাকিয়ে।
“ঘুমিয়ে পড়েছিলে, বাবা?”
“না মা! তোমাকে গল্প শোনাচ্ছিলাম”
“রাক্ষস এল?”
অনিল কি বলবে? এ গল্পে তো কোন রাক্ষসের ভূমিকা নেই। তাহলে? মেয়ে তো রেগে যাবে! কি করা যায়?
বলল,”হ্যাঁ মা। রাক্ষস এসেছে”।
“কেমন দেখতে?”
“হাতে একটা বিরাট বড় গদা, আরেক হাতে একটা লম্বা দড়ি, কালো কুচকুচে চেহারা, মাথায় মুকুট আছে”। অনিল বাধ্য হয়ে যমরাজের আকৃতির বিবরণ দিতে থাকল। হটাত, অনামিকা বলে উঠল, ‘ঐ তো, বাবা! রাক্ষস জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে”।
অনিল মনে করল, মেয়ে বোধহয় জ্বরের প্রভাবে ভুল বকছে। কিন্তু, যখন দেখল, মেয়ে পরিষ্কার ঘরের খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে আছে, তখন বাধ্য হয়ে পেছন ফিরে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যেই ওর মনে হল ঠিক যেন একটা ছায়া জানলার সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। মেয়ে তখন খিল খিল করে হাঁসতে লাগল। আশ্চর্য হয়ে অনিলের দিকে তাকাল। মেয়ে বলল, “দেখলে বাবা! মা এসে রাক্ষসটাকে তাড়িয়ে দিল! হি:!হি:!হি:!” অনিলের মাথা তখন আর কাজ করছে না। কি বলছে কী ওই এতটুকু মেয়েটা? ও ওর মাকে কি করে দেখতে পাচ্ছে এখন? ওর মা তো এক বছর আগেই মারা গেছে জ্বরে ভুগে। তখন এই ঘরের ছাদ ফেলার কাজ চলছিল। বারে বারে জলে ভিজে ওর এমন জ্বর হল, যে ডাক্তার হাত তুলে দিল। প্রভাকে আর বাঁচানো সম্ভব হল না। সেই থেকে ও একাই অনামিকার মা আরা বাবা, দুটোই। প্রভা তবে এখানে কি করে আসবে? এ তো অসম্ভব! তবে কি মেয়ের জ্বর আবার বাড়ল? তাই ও এত ভুল বকছে! ভয়ে ভয়ে ও মেয়ের কপালে হাত দিয়ে দেখল। কই? জ্বরের কোন চিহ্ন নেই! মেয়ের শরীর একদম ঠিক আছে।
অনামিকা অনিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা! তুমি মা’কে দেখতে পাচ্ছ না?”
অনিল ঘরের জানলার বাইরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, ও হাসছে। অনামিকা আবার বলল, “এই যে বাবা! এই দেখ, মা আমার বিছানায় বসে আছে। তুমি এখনও দেখতে পেলে না? দেখো, মা আমাকে টাটা করে চলে যাচ্ছে। বাবা! মা’কে যেতে দিও না। মা না থাকলে রাক্ষসটা আবার আসবে, যে!”
অনিল এবার বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে দেখল, একটা আবছা ধোঁয়াটে অবয়ব দরজার মধ্যে দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। অস্পষ্ট ভাবে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “তোমার মেয়েকে ছেড়ে কোথাও যেও না, প্রভা! ওর জন্য তোমাকে থাকতে হবে”।
এমন সময় অনামিকা ককিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, “থাক বাবা! মা’কে আর ডেক না। মায়ের অনেক কষ্ট হচ্ছে। মা রাক্ষসটাকে বলে দিয়েছে এখানে আর কক্ষনও যেন না আসে”।
অনিল মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। বলল, “হ্যাঁ মা! এখানে আসতে তোমার মায়ের সত্যিই কষ্ট হয়। ঠিকই বলেছে”।
জানলার বাইরে তখন এক ফালি চাঁদ আকাশে উঠেছে। মাঝে মাঝে, পাতলা পাতলা মেঘ চাঁদটাকে ঢেকে ফেলছে। তখন বাইরেটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। আবার মেঘের ভেতর থেকে চাঁদ উঁকি মেরে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। এই খেলা সারা রাত চলবে। অনামিকা ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মুখমণ্ডলে এক স্বর্গীয় হাঁসি খেলা করছে। অনিল মেয়ের বিছানার উপরেই মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো জানলার মধ্যে দিয়ে এসে বাবা আর মেয়েকে আদর করে যাচ্ছে।
সমাপ্ত।
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments