পুতুলবাড়ী Bangla Bhuter Golpo (bhutgolpo.blogspot.com)
#গল্প:পুতুলবাড়ী
দুপুর থেকেই একনাগারে বৃষ্টি পরে যাচ্ছে। কখনো মুষলধারে পড়ছে কখনো বা একটু আস্তে।কিন্তু একবারের জন্যও বৃষ্টিটা কমেনি আজ সারাদিনে। একে বৃষ্টি তাও আবার শনিবার, কোথায় মধুসূদন ভেবেছিল দুপরে জমিয়ে খিচুড়ি আর মাছভাজা খাবে, তা নয় সেই বেরোতেই হলো তাকে। সরকার থেকে কিছু লোক আসছে স্কুলবিল্ডিং পরিদর্শনে, তাই হেডমাস্টারের হুকুম হয়েছে মধুসূদনকে তাদের সাথে থাকতে হবে। মনে মনে হেডমাস্টারকে অনেক শাপশাপান্ত করলো মধুসূদন। অঙ্কের মাস্টার মধুসূদন দত্ত এক বছর হয়েছে এই গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে বদলি হয়ে এসেছে। প্রথম প্রথম সব ঠিকই ছিল কিন্তু আজকাল তার মনে হয় হেডমাস্টার যেন তার ঘাড়ে অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। তার একটা কারণও অবশ্য সে মনে মনে বের করেছে। সে অবিবাহিত, আর তার জন্যেই হয়তো স্কুল কর্তৃপক্ষ তার প্রতি একটু অবিচার করে ফেলছে বলে তার মনে হয়।না! বিয়েটা এবার সেরে ফেলতে হবে মনে হচ্ছে।আর কোনো উপায় নেই।মনে মনে ভেবে নিয়ে স্কুলের দিকে রওনা হলো মধুসূদন।
**********
কাজ শেষ হতে হতে প্রায় বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। এমনিতে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে মধুসূদনের লাগে ওই বড়জোর আধঘন্টা কিন্তু আজ এই ঝড়জলে সাইকেল কিছুতেই যেন এগোতে চাইছে না। তার মধ্যে বৃষ্টির তেজটাও অনেকখানি বেড়ে গেছে। বেগতিক দেখে মধুসূদন মাঠের পাশে, এক গাছের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। হঠাৎ তার চোখে পড়লো মাঠের কোনে দোতলা বাড়িটা। মাঠের পাশ দিয়ে সে প্রায় রোজই যাতায়াত করে।কিন্তু এতবড় দোতলা বাড়িটা কখনো তো চোখে পড়েনি!একটু ভেবে সাইকেল নিয়ে বাড়িটার দিকে অগ্রসর হলো মধুসূদন।
************
না, ভাঙ্গাচোরা হলেও বৃষ্টি না থামা অব্দি এই বাড়িতেই মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে হবে যা মনে হচ্ছে। সাইকেলটা বাইরের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে বাড়িটা একটু ঘুরে দেখে নিলো মধুসূদন। নিচের একটা ঘর বাদে বাকি সব ঘরগুলোই বন্ধ। বাড়িটা দেখে প্রায় প্রাচীনপ্রস্তর যুগের বলে মনে হচ্ছে। এইরকম ঝড়জলের সন্ধ্যায়, ফাঁকা মাঠের পাশে এরকম একটা জরাজীর্ণ বাড়িতে থাকতে যে কোনো সাহসী লোকেরও বুক কাঁপবে কিন্তু মধুসূদন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে চিরকালই অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক জিনিসকে মনে মনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসেছে। তাই ভয়ের তো কোনো প্রশ্নই নেই তার।
ভেজা ছাতাটা একপাশে রেখে খোলা ঘরটার মধ্যে এদিক ওদিক হাঁটতে থাকলো মধুসুদন। ভাঙা জানলাটার সামনে এসে পেছনের বারান্দা দিয়ে বাইরে বৃষ্টি দেখতে লাগলো আর মনে মনে ভাবল এবার সে হেডমাস্টার মশাই কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবে যে তার পক্ষে পড়ানো ছাড়া আর কোনো অতিরিক্ত কাজ করা সম্ভব হবেনা।দরকার পড়লে এবার সে কাজে ইস্তফা দিতেও পিছপা হবেনা।
'খট খট খট'! একটা শব্দ অনেক্ষন থেকেই তার কানে আসছে।প্রথমে মধুসুদনের মনে হয়েছিল ঘরে কোনো ইঁদুর বা বেজি ঢুকেছে যেটা এই ভাঙ্গাবাড়িতে খুব একটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার নয়। কিন্তু কিছুক্ষন পরেই তার ভুল ভাঙলো। শব্দটা আসছে দোতালার কোনো ঘর থেকে।একটানা কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে কোনো কাজ করে চলেছে।
ওপরের সিঁড়ির নীচে এসে দাঁড়ালো মধুসুদন।ওপরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।কিন্তু কোণের ঘরটা থেকে টিমটিমে আলো জ্বলছে।মনে আশার আলো জাগলো মধুসুদনের।তবে কি ওই ঘরে কেউ আছে যে একমনে কোনো কাজ করে চলেছে?
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ঘরটার কাছে এসে দাঁড়ালো মধুসুদন।না, ঘরে কেউ নেই। আর আওয়াজ টাও যেন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল।ঘরটায় পা বাড়ানোর আগে মধুসুদনের গা টা কেন জানিনা কিছুটা হলেও একটু ছমছম করে উঠলো।কিন্তু ঘরটায় ঢুকে একটা জিনিষ চোখে পড়ায় মনটা আনন্দে ভরে গেল তার।ঘরভর্তি বিভিন্ন সাইজের কাঠের পুতুল।কিন্তু পুতুলগুলো সবই বাঙালি সাজের বর-বউ।কি অপূর্ব হাতের কারিগরি...যেন মুর্তিগুলোয় শিল্পী তার শৈল্পসত্ত্বা দিয়ে প্রাণ ঢেলে দিয়েছে। প্রাণ!তাই তো...পুতুলগুলো দেখে কেমন যেন জীবন্ত বলে মনে হলো মধুসুদনের।চোখগুলো যেন তার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে।কাঠের পুতুল সে ছোট থেকে পছন্দ করলেও আজ এই পুতুলগুলোকে দেখে তার যেন কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো।কেমন যেন মনে হতে লাগলো তার আসার ঠিক আগেই এই পুতুলগুলো এবং তাদের মালিক যেন এই ঘরেই উপস্থিত ছিল...তারা যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছিল....কিন্তু তাকে দেখেই যেন নিজেদের জাগায়....না আর ভাবতে পারলোনা মধুসুদন... মাথাটা যেন কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো তার।
কতক্ষন যে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল,মধুসূদনের খেয়াল নেই...এখনো মাথাটা কেমন যেন ঝিম ধরে আছে তার।কোথাও যেন খুব জোরে শঙ্খ বাজছে, মুহুর্মুহু উলুধ্বনি পড়ছে, অনেক লোকের চলাফেরা শোনা যাচ্ছে।খুব সুন্দর ফুলের গন্ধও আসছে নাকে...মধুসূদনের সব যেন কেমন গুলিয়ে আসছে।সে মাথায় একটু জোর দিয়ে ভাবার চেষ্টা করলো এই বাড়িতে ঢোকার পর ঠিক কি কি হয়েছিল তার সাথে। হঠাৎ তার খেয়াল হলো 'আরে ঘরের পুতুলগুলো কোথায় গেল?এখানেই তো ছিল!' তবে কি সত্যি এখানে বসে কেউ কাজ করছিল! আর তার জ্ঞান হারানোর পরে এসে পুতুলগুলো নিয়ে গেছে?'.....'কিন্তু সেটাই বা হবে কি করে?' তার স্পষ্ট মনে আছে এঘরে সে আর কাউকে দেখেনি। আবার সেই শঙ্খধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তবে কি কারুর কি বিয়ে হচ্ছে?কিন্তু সেটাই বা কি করে সম্ভব?এই ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যায় এরকম একটা পোড়োবাড়িতে কেই বা বিয়ে করবে! নীচে যাওয়ার আগে একবার ভাবলো মধুসুদন।জানলার কাছে গিয়ে দেখল সেটা বন্ধ। জানলাগুলোতে ধূলো জমেছে,দেখেই বোঝা যায় কত যুগ ধরে সেগুলো খোলা হয়নি।জানলাটায় জোরে টান দিতেই ক্যাঁচ করে শব্দ হয়ে সেটা খুলে গেল।জানলা দিয়ে মধুসুদন দেখল পেছনের বারান্দায় বিয়ের আসর বসেছে।অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে বিয়ে দেখার জন্যে। মধুসূদন এবার একটু সাহসে ভর করে নীচে নামলো। এ কি!বিকেলেও, তার স্পষ্ট আছে বাড়িটার কি দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা ছিল.. কিন্তু এখন সেটি সম্পূর্ণ চেহারা বদল করে একটা বিয়েবাড়িতে পরিবর্তিত হয়েছে।....কিন্তু কোনো লোক সেখানে নেই!..সবাই যেন জড়ো হয়েছে পেছনের বারান্দায়। পা টিপে টিপে বারান্দায় এলো মধুসূদন।ছাদনাতলায় বিয়ে বসেছে। চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই বিয়ে দেখছে অনেক পুরুষ-মহিলা। হঠাৎ একজন কেউ বলে উঠলো 'মালাটা নিয়ে আয়'...আর সেইসঙ্গে একজন পেছনে ফিরল আর তখনই যেটা দেখলো মধুসূদন তা দেখে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল!পেছনে ঘুরে যে মালা আনতে গেল সে কোনো মানুষ নয়...ওই ঘরে রাখা পুতুলগুলোর মধ্যে একটা। ভয়ে মধুসূদনের হাত লাগলো দরজার করাটায়...আর করাটার শব্দ হতেই যেন সতর্ক হয়ে গেল সবাই, হঠাৎ করেই যেন বন্ধ হয়ে গেল সমস্তরকম কোলাহল... ওরা যেন ওর উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে সব আয়োজন বন্ধ করে সবাই একসাথে ঘুরে তাকালো মধুসূদনের দিকে।
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে পুতুলগুলো।যেন ওর উপস্থিতি ওদের কাছে অনভিপ্রেত। হঠাৎ করেই মধুসূদনের চোখ গেল বিয়ের পিঁড়িতে বসে থাকা বর-কনের দিকে। কোণেটির মুখ ঢাকা....কিন্তু এ কি! অস্ফুটে একটা চিৎকার বেড়িয়ে এল মধুসূদনের মুখ দিয়ে.....বরের পিঁড়িতে বসে আছে স্বয়ং মধুসূদন।সে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকলো মধুসূদন। বাইরের বারান্দা দিয়ে বেরোনোর সময় চোখে পড়লো বাড়িটার গায়ের লেখাটা - 'পুতুলবাড়ী'-
যাকে পুতুলের মনে ধরে
পুতুল তাকে সঙ্গে রাখে,
শিল্পী মনের শিল্প হয়ে
পুতুল সেজে গল্পো করে
*********
মাঠটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ হাঁফাতে থাকলো মধুসূদন। বৃষ্টি এখন পুরোদমে থেমে গেছে। হঠাৎ তার চোখ গেল মাঠের পাশের গাছটার দিকে। গাছটা ঝড়ে পরে গেছে। কিছু লোক সেখানে জড়ো হয়ে সেটা তোলার চেষ্টা করছে। কিছুটা এগিয়ে গেলো মধুসূদন। গাছটার ডালপালা একটু সরাতেই মধুসূদন স্পষ্ট দেখতে পেল গাছটার নীচে কেউ একজন চাপা পড়েছে।মৃতদেহের গায়ের পাঞ্জাবিটা চিনতে মধুসূদনের একেবারেই ভুল হওয়ার কথা নয়,কারণ এখনো সে এইটা পরেই দাঁড়িয়ে আছে।একজন বলে উঠলো 'ইস শরীরটা একদম চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছে রে'!, কেউ আবার বললো 'এত বড় গাছটা চাপা পড়লই বা কখন,কই বাজের আওয়াজ তো কানে আসেনি'....
মধুসূদন তখন দেখছিল অদূরে চাপা পরা সাইকেলটার নীচে পরে থাকা বউ পুতুলটাকে যার মুখটা তখনো লাল ওড়নায় ঢাকা।
সমাপ্ত।
website : BhutGolpo
website link : https://bhutgolpo.blogspot.com
Keywords
Horror Story
Bangla Horror Story
Bengali Horror Story
Horror Story in Bangla
Horror Story in Bengali
Bhut Golpo
Bangla Bhut Golpo
Bengali Bhut Golpo
Bhut Golpo in Bangla
Bhut Golpo in Bengali
Bhuter Golpo
Bangla Bhuter Golpo
Bengali Bhuter Golpo
Bhuter Golpo in Bangla
Bhuter Golpo in Bengali
Bhoot Golpo
Bangla Bhoot Golpo
Bengali Bhoot Golpo
Bhoot Golpo in Bangla
Bhoot Golpo in Bengali
Bhooter Golpo
Bangla Bhooter Golpo
Bengali Bhooter Golpo
Bhooter Golpo in Bangla
Bhooter Golpo in Bengali
Vut Kahini
Bangla Vut Kahini
Bengali Vut Kahini
Vut Kahini in Bangla
Vut Kahini in Bengali
ভূত গল্প
ভুতের গল্প
ভুতের কাহিনী
ভয়ানক অলৌকিক ঘটনা
পিশাচের গল্প
শাকচুন্নির গল্প
রাক্ষসের গল্প
ডাইনির গল্প

0 Comments